যুদ্ধ মানুষের কাক্সিক্ষত বিষয় নয়, তবে যুদ্ধ কখনো কখনো অনিবার্য হয়ে ওঠে। আর আত্মরক্ষার যুদ্ধ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার যুদ্ধ তো কর্তব্য হয়ে পড়ে। মানুষ এমন কর্তব্য থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। তবে আগ্রাসনের যুদ্ধ, দম্ভের যুদ্ধ ভিন্ন বিষয়- এমন যুদ্ধে সৈনিকদের সাহস কমে যায়, বরং হতাশা বাড়ে। তৈরি হয় আত্মহত্যার পরিবেশও। এমন এক বাস্তবতার শিরোনাম ‘আত্মহত্যার ঝুঁকিতে মার্কিন রণতরীর ৫০০০ সেনা’। একটি জাতীয় দৈনিকে ১৬ আগস্ট সংখ্যায় মুুদ্রিত প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন প্রায় আট মাস সাগরে মোতায়েন রয়েছে। ইরান যুদ্ধ শেষ না হওয়ায় এখনো জাহাজটির ফেরার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি। দীর্ঘ মোতায়েনের ফলে প্রচণ্ড মানসিক চাপে রয়েছেন জাহাজটির ৫০০০ নাবিক ও সেনা। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ স্বজনদের। সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস ও এনবিসি নিউজের বরাতে জানানো হয়, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়াগোতে এক সভায় মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে রণতরীর কর্মীদের মানসিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানান তাদের স্বজনরা। সভায় অংশ নেওয়া এক নাবিকের স্ত্রী জানান, তিনি স্বামীর কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছেন। এতে ওই নাবিক লিখেছেন, তিনি আশা করেন তার যেন আগামীকাল আর ঘুম না ভাঙে। এনবিসি নিউজকে ওই নারী জানান, উপস্থিত কর্মকর্তারা তার বক্তব্যের সরাসরি কোনো জবাব দেননি। তবে জাহাজে থাকা নাবিকদের সেবায় যথেষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক রয়েছেন বলে তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন তারা।
গত বছরের ২১ নবেম্বর সানডিয়াগো বন্দর ছাড়ে আব্রাহম লিঙ্কন। বিমানবাহী এ যুদ্ধজাহাজটিকে প্রশান্ত মাহসাগরে মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু ইরানে আগ্রাসনের অল্প কিছুদিন আগে একে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে আসা হয়। আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে রণতরীটির মিশন শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরানে যুদ্ধ শেষ না হওয়ায় আব্রাহম লিঙ্কনেরও মিশনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। জাহাজটির নাবিক ও সেনাদের বাড়ি ফেরার সুনির্দিষ্ট তারিখও প্রকাশ করা হয়নি। মার্কিন রণতরীগুলোকে সাধারণত সাত মাসের বেশি মোতায়েন করা হয় না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ওপর রণতরী মোতায়েনের মেয়াদ আরো বাড়ানোর বিষয়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের প্রবণতা নৌযানগুলোর কর্মীদের মধ্যে অবসাদ তৈরি করবে। এমন কি এর জন্য অনেকেই চাকরি ছাড়তে উদ্বুদ্ধ হবে। সিএনএনকে আব্রাহম লিঙ্কনের এক কর্মী জানান, জাহাজের নাবিক ও সেনাদের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়েছে। সহকর্মীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। এছাড়া পানি সরবরাহ ও টয়লেটের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধায়ও চাপ পড়েছে। গরম পানির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া জাহাজে অনিয়মিতভাবে খাদ্য সংকটও পরিচ্ছন্নতা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে বলে জানান কর্মীরা।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ কেট কুজমিনস্কি সিএনএনকে বলেন, মার্কিন নৌবাহিনীর উচিত তার মোতায়েনের মডেলকে বাস্তবতার আলোকে যথাযথভাবে সাজানো। তিনি বলেন, পরিবার থেকে দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্নতা কর্মীদের নৌবাহিনী ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে তাড়িত করবে। মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী; রসদ সংগ্রহ, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্রুদের বিশ্রামের জন্য বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজাগুলো সাধারণত প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ দিন পরপর কোনো না কোনো বন্দরে নোঙর করে। কিন্তু পুরো সময় জুড়েই আব্রাহাম লিঙ্কনের কর্মীরা টানা কাজ করে গেছেন বলে ক্ষোভ জানান এক নাবিক। তবে জাহাজটি কোনো বন্দরে না ভিড়তে পারার অন্যতম কারণ, ইরানের হামলার ভয়। তবুও যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নাবিক, সেনা, স্বজন, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ-কারো বক্তব্য ও পরামর্শ তার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়। দম্ভের এ পথেই হয়তো পরাজয় ঘটবে তার।