বর্তমান সভ্যতায় আমরা বিভিন্ন জোটের কথা শুনছি। একসময় আমরা ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের’ কথাও শুনেছি। এ আন্দোলন বিভিন্ন জোট সম্পর্কে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছিল। তবে এই আন্দোলনে এখন আর প্রাণ নেই, বিষয়টি ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। ভূরাজনীতিতে এখন জোট বা বলয়ের রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে আস্থার সংকট কাটেনি। যখন থেকে মানুষ মহান স্রষ্টাকে ভুলে চাতুর্যকে অবলম্বন করেছে, তখন থেকে শুরু হয়েছে আস্থার সংকট, এই সংকট এখনো অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আস্থাহীনতার বাতাবরণে অনেক দেশের কাছেই জোটের বিষয়টি বেশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এখানে আমরা মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের কথা উল্লেখ করতে পারি। ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির’ মাধ্যমে এ অঞ্চলে নতুন একটি নিরাপত্তা ও সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় ওই চুক্তির আওতায় সোমবার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে প্রথম বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন বলে জানায় পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডন।
‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’ সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই গঠিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই জোট এ অঞ্চলে আরও বেশি স্থিতিশীলতা আনবে এবং অনিশ্চয়তা কমাতে ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, ‘এই চুক্তির মাধ্যমে আমাদের অঞ্চলে নতুন একটি নিরাপত্তা ও সহযোগিতা কাঠামো পরীক্ষার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’ নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর এখন জরুরিভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রসঙ্গে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আজ থেকে আমরা জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। রিয়াদে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং আমাদের পাকিস্তানি ভাইদের মধ্য থেকে প্রথম মহাসচিব নিযুক্ত করা হবে। বৈঠকে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ও সেনাপ্রধান অসীম মুনির। সৌদি আরবের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান এবং তুরস্কের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াশার গুলারসহ শীর্ষ সামরিক ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নেন। মূল বৈঠকের পাশপাশি অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে যৌথ প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়।
উল্লেখ্য, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সৃষ্টি করেছে বিশেষ উৎসাহ। এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, আরও ছয়-সাতটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এই জোটে যোগ দিতে আগ্রহী। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন দেশগুলোর অন্তর্ভুক্তি সহজ করতে জোটের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এই জোটে যুক্ত হতে আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশও। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মক্কা চুক্তির বিষয়ে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগিয়ে চলেছে এবং এতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি দেখছে না সরকার। গত ৭ আগস্ট মক্কায় জোটের মূল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির একটি অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, সদস্যদেশগুলোর যে কোনো একটির ওপর আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে তুর্কী পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, এই জোট কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এটি কাজ করবে। জোটটি নতুন সদস্য গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও নির্ধারিত কিছু শর্ত ও মানদণ্ড বজায় রাখা হবে। এ ধনের কথাবার্তা এখন খুবই স্বাভাবিক এবং সঙ্গতও বটে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাজ করলেও আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যদিও বড় দেশগুলো তার তোয়াক্কা খুব কমই করে। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করেই বলা প্রয়োজন যে, বর্তমান যে বিশ্বব্যবস্থা সেখানে মুসলিম দেশগুলো এবং তার জনগণ নানাভাবে শোষিত-বঞ্চিত এবং মজলুম। মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের মতো কোনো জোটের প্রতিষ্ঠা বহু আগেই সম্পন্ন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তেমন সক্ষমতার পরিচয় দিতে সমর্থ হয়নি মুসলিম বিশ্ব। এখানে দুর্বলতা স্পষ্ট। তবে বিলম্বে হলেও মক্কা চুক্তি একটি ভালো উদ্যোগ। যোগাদানের প্রশ্ন আসলে অনেক বাস্তব বিষয় সামনে আসবে। প্রথমে আসবে আমন্ত্রণের বিষয়। আমন্ত্রণ পেলে বাংলাদেশেরও বিবেচনা করে দেখার মত বিষয় থাকবে। শুধু ভূরাজনীতি নয়, বাংলাদেশের প্রয়োজন এবং সামর্থ ও বিবেচনায় আনতে হবে। কিভাবে কোন মাত্রায়-এটাও একটি বিবেচনার বিষয় হতে পারে। মক্কা জোট একটি জনপ্রিয় বিষয়, তবে এখানে আরো বহু বিষয় যুক্ত আছে।