ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মঙ্গলবার রাতে ইরানের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন হামলায় ১৮ জন নিহত এবং ১০৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী। নিহতদের মধ্যে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে থাকা চারজনও রয়েছেন। এ হামলা ও নিরপরাধ মানুষ হত্যার নিন্দার ভাষা নেই। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হামলার শিকার হয়েছেন সাধারণ মানুষ। দক্ষিণ ইরানের কুহেস্তাক এলাকায় একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। সেখানেই বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ মানুষ হতাহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। বিয়ে বাড়িতে হামলার ঘটনাটি কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আলোচনার বাতাবরণে যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন করে হামলা না চালানোর কথা বলেছিলেন, তা ভঙ্গ করে চালানো হলো এই হামলা।
এ ঘটনা শুধু একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা নয়; এটি যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতীক। একটি পরিবারের আনন্দের আয়োজন মুহূর্তে পরিণত হয়েছে মৃত্যু, কান্না ও ধ্বংসের ঘটনায়। এ বাস্তবতা সভ্য বিশ্বের বিবেককে নাড়া দেয়ার মতো।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে কোনো সামরিক অভিযানেই বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থার সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়— কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশে যদি সাধারণ মানুষের বসতি, বাড়িঘর কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠান থাকে, তাহলে সেই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কি পর্যাপ্ত সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল? যদি ভুল হয়ে থাকে, সে ভুলের দায় কে নেবে?
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন আর দু’দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। নতুন মার্কিন হামলার পর তেলের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ একটি যুদ্ধের আগুন শুধু যুদ্ধরত দেশের মানুষকেই পোড়ায় না; তার উত্তাপ পৌঁছে যায় বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়ে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ। এর চেয়েও বড় বিপদ হলো যুদ্ধের বিস্তার। পাল্টা হামলা, প্রতিশোধ এবং আবার নতুন হামলা—এভাবে চলতে থাকলে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, সামরিক শক্তি দিয়ে সব রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হয় না। বোমা দিয়ে কোনো দেশের রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূর করা যায় না, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, দীর্ঘমেয়াদি শান্তিও প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বরং সামরিক হামলা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ, প্রতিশোধস্পৃহা ও অনিশ্চয়তা বাড়ায়। এর ফলে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তা উদ্বেগ— যে বিষয়ই সামনে থাকুক না কেন, তার সমাধান হতে হবে আলোচনার টেবিলে। সামরিক অভিযানকে যদি কূটনীতির বিকল্প হিসেবে বেছে নেয়া হয়, তাহলে তার পরিণতি শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এ অবস্থায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে হবে। বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
ইরানের নতুন হামলার ঘটনায় আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। প্রতিশোধের বদলে সংলাপ, বোমার বদলে কূটনীতি এবং ধ্বংসের বদলে শান্তির পথই এখন একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ী-পরাজিত নির্ধারিত হতে পারে; কিন্তু বেসামরিক মানুষের মৃত্যু কোনো বিজয় নয়। শান্তিই হতে পারে সত্যিকারের বিজয়।