স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশে শিক্ষার মানে অবনতি ঘটতে শুরু করে এবং বর্তমানে তা চরম পর্যায়ে রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে পরীক্ষায় পাসের হার এবং ভালো রেজাল্ট দেখানোর এক ধরনের প্রতিযোগিতা ছিলো। ফলে শিক্ষার গুণগত মান রক্ষার প্রতি চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করা হয়। গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা বলতে পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া বা সনদ অর্জনকে বুঝায় না। গুনগত মানসম্পন্ন শিক্ষা বলতে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা বা পদ্ধতি বুঝায়, যা একজন শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনে দক্ষ, চিন্তাশীল, নীতিবান ও সমস্যা সমাধানে সক্ষম করে গড়ে তোলে। এজন্য দক্ষ এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এমন সব ব্যক্তিকেও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে যাদের শিক্ষক হবার মতো যোগ্যতা নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একাধিকবার গুনগত মানসম্পন্ন আদর্শিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছেন। একই সঙ্গে তিনি কারিগরি শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে যে বাজেট বরাদ্দ দেয়া হচ্ছিল তা জিডিপি’র ২ শতাংশেরও কম। চলতি অর্থবছরের (২০২৬-২০২৭) বাজেট শিক্ষা খাতে যে বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তার পরিমাণ জিডিপির ২ শতাংশের কিছু বেশি। ইউনেস্কোর মতে, একটি দেশের শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ থাকা উচিত জিডিপির ৬ শতাংশ। এই অর্থের একটি বড় অংশই শিক্ষার মান্নোয়ন ও গবেষণা কাজে ব্যয় করতে হবে।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত বাংলাদেশি গবেষকদের ৩২৫টি প্রতিবেদন প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন গবেষকের ২৬টি প্রতিবেদন প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রকাশিত এসব প্রতিবেদন অন্যের গবেষণাপত্র থেকে চুরি করে লেখা হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ভূয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ অন্যের লেখা কিনে এনে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। এসব গবেষণা প্রতিবেদন প্রত্যাহার করার ফলে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ইমেজ সাংঘাতিকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। আগামীতে বাংলাদেশি কোন গবেষক আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য প্রদান করলে তা প্রকাশের ক্ষেত্রে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতদিন কোন কোন গবেষকের ব্যাপারে তথ্য চুরি বা অন্যের গবেষণা কর্ম নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশি গবেষকদের কাজের গ্রহণযোগ্যতা ছিল। এখন সে গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়েছে। বিগত সরকার আমলে দলীয় বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হতো। এ চৌর্যবৃত্তির ফলই এটা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক সর্বজন শ্রদ্ধেয় হবেন। তিনি নীতি-নৈতিকতার দিক থেকে আদর্শস্থানীয় হবেনÑ এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু তা না হয়ে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ শিক্ষকের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছে। এদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের এমন শাস্তি দিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন অন্যায় কর্ম করার সাহস না পায়। দেশের সম্মান নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া যায় না।