বর্ষা এলেই বাংলাদেশে ডেঙ্গু আতঙ্ক ফিরে আসে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিবছরই ডেঙ্গু নিয়ে একই ধরনের সতর্কবার্তা, সভা-সেমিনার ও নানা কর্মসূচির কথা শোনা যায়; অথচ মশার বিস্তার থামে না, আক্রান্তের সংখ্যা কমে না, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। ফলে প্রশ্ন উঠছে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি কোথায়? স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য আরও উদ্বেগজনক। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৯৩ জন। আগস্টের প্রথম দুই সপ্তাহেই ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব তথ্য পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া দুজনই ঢাকা বিভাগের। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সারাদেশে ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২৪৩ জনে। খবরে আভাস দেয়া হয়েছে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আরো বাড়তে পারে।

কার্যত ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকালের একটি মৌসুমি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি স্থায়ী ও ক্রমবর্ধমান সংকট। ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশা। এ প্রজাতির মশার প্রজননস্থল সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা নেই। পরিষ্কার জমে থাকা পানিই যে এডিসের বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে, তা বহু বছর ধরেই জানা। নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র, ফুলের টব, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের সামগ্রী, নালা কিংবা বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিসের লার্ভা জন্মায়।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক এলাকায় অভিযান পরিচালিত হয় খবরের কাগজে প্রকাশযোগ্য কিছু কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কয়েক দিন অভিযান চালানোর পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া হয়। অথচ এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে এককালীন অভিযান যথেষ্ট নয়। সারা বছর ধরে নিয়মিত নজরদারি, লার্ভা শনাক্তকরণ ও ধ্বংস এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এ বছর থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে, যা ডেঙ্গু বিস্তার লাভে সহায়ক। এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মনযোগী হওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মশক নিধনের ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ওষুধ ছিটানো প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো উৎসস্থল ধ্বংস করা। কোন এলাকায় কোথায় পানি জমছে, কোথায় এডিসের লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে তার নিয়মিত মানচিত্র তৈরি করে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্মাণাধীন ভবন ও পরিত্যক্ত স্থাপনার ক্ষেত্রেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে শৈথিল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে স্বা¯থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তাদের মতে ডেঙ্গু রোধে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাজ নয়। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষসবাইকে যুক্ত করতে হবে। জনসচেতনতার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা। ডেঙ্গুতে মৃত্যু অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে বাড়তে পারে। তাই সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ, পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। জ্বর হলেই অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।

আগস্টের মাত্র দু’সপ্তাহে ১১ জনের মৃত্যু এবং এক দিনে ৬৯৩ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। এই সংখ্যা আরও বাড়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে ঢাকাসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। আগামী মাসে পরিস্থিতির যাতে আরো অবনতি না হয় সে জন্যও প্রস্তুতি প্রয়োজন। আমরা মনে করি পরিস্থিতি আরো জটিল হওয়ার আগেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো তৎপর হতে হবে।