দেশের শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট আবারও সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বিলবোর্ডের আলো এবং বিভিন্ন মেলা, বাণিজ্যমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গভীর সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং অর্থনীতির সামগ্রিক চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা। ঈদুল আযহা উপলক্ষে ব্যবসায়িক সুবিধার কথা বিবেচনা করে সাময়িকভাবে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে সময়সীমা প্রত্যাহার করে আবার আগের নিয়মে ফিরে যাওয়া স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এখনো স্বস্তিদায়ক অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি। বরং সংকট মোকাবিলায় সরকারকে সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপে ফিরে যেতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন ধরেই আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি পূরণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), ডিজেল এবং ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য সবসময়ই উদ্বেগের বিষয়। তেলের দাম বাড়লে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচই বৃদ্ধি পায় না, পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন ব্যয় এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বর্তমানে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের চাপের মধ্যে জ্বালানি আমদানির অতিরিক্ত ব্যয় রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বাস্তবতায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগকে অপ্রয়োজনীয় বা প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি বড় শপিংমল, শত শত আলোকসজ্জা, অসংখ্য বিলবোর্ড এবং রাতব্যাপী অনুষ্ঠান সম্মিলিতভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। এসব খাতে নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জাতীয় পর্যায়ে একটি অর্থবহ সাশ্রয় নিশ্চিত করতে পারে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন সময়ে যখন বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটিও সত্য যে শুধুমাত্র দোকানপাট দ্রুত বন্ধ করে বা বিলবোর্ডের আলো নিভিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এটি মূলত একটি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনা কৌশল। প্রকৃত সমাধানের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
প্রথমত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নতুন গতি আনতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাবনাময় অনেক এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। তৃতীয়ত, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। চতুর্থত, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায় অপচয় এবং সিস্টেম লস আরও কমিয়ে আনতে হবে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ন্যায়সঙ্গত সাশ্রয়। সাধারণ ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের ওপর সাশ্রয়ের দায় চাপিয়ে দিয়ে বড় বড় প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের অপচয় চলতে থাকলে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হবে। তাই সরকারি-বেসরকারি সব স্তরে সমানভাবে সাশ্রয় নীতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি ভবন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক স্থাপনাতেও কঠোরভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সংকটের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিদ্যুৎ শুধু একটি সেবা নয়, এটি একটি মূল্যবান জাতীয় সম্পদ। অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতার এই সময়ে বিদ্যুতের প্রতিটি ইউনিট ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে তাই কেবল দোকান বন্ধের সময়সূচি পরিবর্তন হিসেবে দেখা উচিত নয়। সংকটের মুহূর্তে সাশ্রয় প্রয়োজন, কিন্তু সে সঙ্গে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। অন্যথায় প্রতি বছরই একই ধরনের সীমাবদ্ধতা ও সংকটের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।