ভারসাম্যগুণে টিকে আছে মহাবিশ্ব। একই বাস্তবতা পৃথিবীর ক্ষেত্রেও। আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র-এর বাইরের বিষয় নয়। মানুষের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও এর ব্যতিক্রম হতে পারে না। কোনো কিছু ঠিকঠাকমত চলতে হলে সেখানে ভারসাম্য প্রয়োজন। এ বিয়টি রাজনীতিবিদদেরও ভালো করে বুঝা প্রয়োজন। কারণ, তাদের সিদ্ধান্তের ওপর দেশ ও জনতার ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। তবে দুঃখের বিষয় হলো, ভারসাম্য বিষয়টা সব রাজনীতিবিদ বোঝেন না। ফলে তারা একদেশদর্শী হয়ে ওঠেন। এদের কর্মকাণ্ডে ‘হিতে বিপরীত’ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যেমনটি এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এবার সেখানে কুরবানি নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গে পশু কুরবানিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞার ফলে রাজ্যজুড়ে গবাধিপশুর বাজারে তীব্র মন্দা দেখা দিয়েছে। নতুন বিধিনিষেধ ও কঠোর নজরদারির কারণে বিপাকে পড়েছেন গবাদিপশু ব্যবসায়ী, খামারি, পরিবহন শ্রমিক ও হাটসংশ্লিষ্ট হাজারো মানুষ। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হিন্দু ধর্মের পশুপালক ও ব্যবাসয়ীরা। পশ্চিমবঙ্গের এসব হিন্দু পশুপালক ও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম ক্রেতাদের ওপর নির্ভর করে ঈদের মৌসুমে ব্যবসা করে আসছিলেন। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, হিন্দু ব্যবসায়ী ও কৃষকরা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও হাতাশা প্রকাশ করছেন।
অভিযোগ উঠেছে, ঈদের ঠিক আগে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে মুসলিম ক্রেতারা হাটে আসতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে পশু বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন হিন্দু ব্যবসায়ী ও কৃষকরা। সমস্যার সূত্রপাত হয় পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৯৫০ সালের ‘পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রয়ণ আইন’ কঠোরভাবে কার্যকরের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। আইন অনুযায়ী, সরকারি প্রশংসাপত্র ছাড়া ষাঁড় বা মহিষ জবাই করা যাবে না। কেবল ১৪ বছরের বেশি বয়সি বা স্থায়ীভাবে পঙ্গু প্রাণীকেই কেবল জবাই দেয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। অথচ এমন আইন মুসলমানদের পশু কুরবানির বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ, ত্রুটিবিহীন সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান পশু কুরবানি দিতে মুসলমানদের উৎসাহিত করেছে ইসলাম। ফলে ঈদের আগে পশ্চিমবঙ্গে ঘোষিত আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ অর্থনীতি ও পশুব্যবসার সঙ্গে জড়িত মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে আবেগঘন কন্ঠে বলতে শোনা যায়, ঈদের বাজারে পশুবিক্রির আশায় তিনি পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। মুসলিম ক্রেতারা কখনো তাদের ক্ষতি করেনি, তাহলে কেন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে এই দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক নষ্ট করা হচ্ছে-এমন প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে গ্রামীণ অঞ্চলে হিন্দু বিক্রেতা ও মুসলিম ক্রেতাদের মধ্যে পশু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও প্রশাসনিক চাপের কারণে পশুরহাটে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মুর্শিদাবাদের এক ব্যবসায়ী বলেন, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে পশুরখাদ্য ও ওষুধ কিনেছেন তারা। এখন পশু বিক্রি না হলে সেই দেনা পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এসব কারণে পশ্চিমবঙ্গে পশু কুরবানি বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা একটি বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ বলেছেন, ভারসাম্যপূর্ণ বিবেচনার বদলে একদেশদর্শী সিদ্ধান্তের কারণ পশু নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি যেন ‘হিতে বিপরীত’ হয়ে গেল।