চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। দেশের অর্থনীতি, আমদানি-রপ্তানি ও শিল্প-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এই নগর। অথচ সামান্য ভারী বৃষ্টি হলেই নগরীর বহু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়কে পানি ঢুকে পড়ে। যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি হয়, রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়ে। এই পানিবদ্ধতা নিরসনে গত এক দশকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

দৈনিক সংগ্রামসহ পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে। এক খবরে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের পানিবদ্ধতা নিরসনে একের পর এক বড় প্রকল্প নেয়া হয়েছে। খাল পুনঃখনন, খাল সম্প্রসারণ, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, স্লুইসগেট ও টাইডাল রেগুলেটর স্থাপন, ড্রেন নির্মাণ, খালের পাশে সড়ক নির্মাণ-- সব মিলিয়ে গত প্রায় এক দশকে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত চারটি প্রকল্পে খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। অথচ ভারী বৃষ্টি হলেই চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো আবারও পানির নিচে চলে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে-এত টাকা খরচের পরও কেন পানিবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না?

এত টাকা খরচের পরও কেন এই ব্যর্থতা? প্রথম কারণ, প্রকল্প গ্রহণের সময়ই পরিকল্পনায় বড় ধরনের দুর্বলতা ছিল। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যথাযথভাবে না করেই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। কোথায় কত পানি জমে, কোন খালের ধারণক্ষমতা কত, বৃষ্টির পানির প্রবাহ কোন পথে যায়, জোয়ারের সঙ্গে বৃষ্টির পানির সম্পর্ক কী এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা না করেই অনেক কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, খাল ও নালার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা যায়নি। চট্টগ্রামের পানিবদ্ধতা শুধু খনন বা দেয়াল নির্মাণের সমস্যা নয়; এটি একটি সামগ্রিক নগর ব্যবস্থাপনার বিষয়। তৃতীয়ত, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকট। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ একাধিক সংস্থা নগরের পানি নিষ্কাশন নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু নগরের সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কার্যকর ও শক্তিশালী সমন্বিত কর্তৃপক্ষের অভাব রয়েছে। চতুর্থত, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। বছরের পর বছর প্রকল্প চলতে থাকলে ব্যয় বাড়ে, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং কাক্সিক্ষত সুফল পেতে দেরি হয়। একটি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ার নজিরও রয়েছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রক্ষণাবেক্ষণ। অবকাঠামো নির্মাণ করাই শেষ কথা নয়। খাল নিয়মিত খনন করতে হবে, সিল্ট ও বর্জ্য অপসারণ করতে হবে, নালা পরিষ্কার রাখতে হবে এবং রেগুলেটর ও পাম্পিং ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।

চট্টগ্রামের পানিবদ্ধতার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়ছে। ফলে অতীতের হিসাব দিয়ে ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা করলে চলবে না। নতুন করে বৃষ্টিপাতের ধরন, জোয়ারের উচ্চতা, নদী-খালের পানি ধারণক্ষমতা এবং নগরের দ্রুত সম্প্রসারণ বিবেচনায় নিয়ে পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। খাল দখলমুক্ত করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, নালা-খাল নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, পানি প্রবাহের পথ উন্মুক্ত রাখা এবং জোয়ার-বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি বৃষ্টির পানি নগরবাসীর ঘরে ঢুকে পড়ে, তাহলে শুধু প্রকল্পের অগ্রগতি দিয়ে সাফল্য মাপা যাবে না। আমরা মনে করি চট্টগ্রামবাসী আর প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফল দেখতে চায়। নতুন প্রকল্পের নামে নতুন বরাদ্দ নয় আগের ব্যয়ের জবাবদিহি, ভুল পরিকল্পনার সংশোধন এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাই এখন সবচেয়ে জরুরি।