কলকাতার নিউমার্কেট সংলগ্ন একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের প্রাণহানি একটি মর্মান্তিক ঘটনা। নিহতদের মধ্যে আটজন বাংলাদেশী নাগরিক রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র ও বাংলাদেশী সংবাদমাধ্যমে বুধবারে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়। তাঁদের অনেকেই চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন। রাতের বেলায় ঘুমন্ত অবস্থায় আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে আটকে পড়ে তাঁদের মৃত্যু শুধু কয়েকটি পরিবারের স্বপ্নই নিভিয়ে দেয়নি, প্রশ্নের মুখে ফেলেছে হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ও নগর ব্যবস্থাপনাকেও। আমরা এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করছি এবং নিহতদের স্বজনদের প্রতি জানাচ্ছি সমবেদনা।
ঘটনাটি ঘটেছে গত মঙ্গলবার গভীর রাতে কলকাতার ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটে। নিহতদের মধ্যে ৫ বাংলাদেশীর পরিচয় পাওয়া গেছে, বাকিদের পরিচয় মেলেনি। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ভবনটি ছিল কয়েকটি হোটেল নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সংকীর্ণ ও ঘিঞ্জি স্থাপনা। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি ধোঁয়া বের হওয়ার পথ ও নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগ সীমিত থাকায় অতিথিরা ভয়াবহ বিপদের মধ্যে পড়েন। প্রায় ৮০ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও নয়জনের প্রাণ রক্ষা করা যায় নি। আগুনের কারণ এবং ভবনটির নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে।
এ দুর্ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, নিহত বাংলাদেশীরা বিদেশে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ছিলেন না; তাঁদের অনেকেই চিকিৎসার প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশে গিয়েছিলেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশীদের বড় একটি অংশ কলকাতার তুলনামূলক কম খরচের হোটেল ও গেস্টহাউসে অবস্থান করেন। তাঁদের অনেকেরই স্থানীয় হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা থাকে না। ফলে সাশ্রয়ী আবাসনের সন্ধানে তাঁরা এমন ভবনেও উঠতে পারেন, যেখানে জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ধোঁয়া শনাক্তকরণ যন্ত্র বা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কর্মী নেই। এখানেই কলকাতা প্রশাসনের দায় সবচেয়ে বেশি। কোনো হোটেলকে ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার আগে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মৌলিক দায়িত্ব। বিশেষ করে পুরোনো কলকাতার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত ভবন, অতিরিক্ত কক্ষ নির্মাণ এবং জরুরি নির্গমন পথের ঘাটতি নতুন কোনো বিষয় নয়।
কলকাতা প্রশাসন ইতিমধ্যে হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এটি অবশ্যই স্বাগতযোগ্য। কিন্তু শুধু পরিদর্শন নয়, প্রয়োজন নিয়মিত ও কঠোর নজরদারি। যেসব হোটেল অগ্নিনিরাপত্তার শর্ত পূরণ করে না, সেগুলোকে জরিমানা করে দায় শেষ করা যাবে না; প্রয়োজন হলে বন্ধ করে দিতে হবে। ভবনের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি অতিথি রাখা, জরুরি সিঁড়ি বা বহির্গমনপথ বন্ধ রাখা, বৈদ্যুতিক তারের ত্রুটি এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম না থাকার মতো বিষয়কে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া উচিত নয়।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো নিহতদের লাশ দেশে আনা, দাফন ও সৎকার এবং নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, একটি শিশু কিংবা চিকিৎসার জন্য যাওয়া কোনো স্বজন একটি অগ্নিকাণ্ডের মুহূর্তে তাঁদের জীবন থেমে গেছে। এ ক্ষতি অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ সরকারের উচিত নিহতদের পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্তের অগ্রগতি ও দায় নির্ধারণ সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য চাওয়া।
আগুনকে দুর্যোগ বলা যায়, কিন্তু অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা ও নিয়ম না মানার কারণে যদি মানুষ মারা যায়, সেটিকে নিছক দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কলকাতার এ ঘটনা তাই শুধু শোক প্রকাশের বিষয় নয়; এটি প্রশাসনিক জবাবদিহিরও পরীক্ষা। একটি হোটেলে আগুনে নয়জনের মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না যায়। তদন্তে যদি অবহেলা, বিধি লঙ্ঘন বা দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।