বাংলাদেশ বর্তমানে চরম বিদ্যুৎ সমস্যার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুতের অভাবে আবাসিক এলাকায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছে শিল্প-কারখানার মালিকগণ। তারা কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যবস্থা ঠিক রাখতে পারছেন না। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সঙ্কটের কারণে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক উপকরণ হিসেবে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। কিন্তু দেশে গ্যাসের যে মজুত আছে তা দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে আগামীতে বাংলাদেশ জ¦ালানি শক্তি নিয়ে মারাত্মক জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় বেসরকারি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সুসংবাদ দিয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) তাদের এক গবেষণায় দেখিয়েছে, দেশের ৩ হাজার ৩২০টি তৈরি পোশাক কারখানার ছাদে যদি সোলার প্যানেল স্থাপন করা যায় তাহলে বছরে ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য ১৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাক কারখানার চাহিদার মাত্র ৩ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ¦ালানি থেকে আসছে। এটি ১৪ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। বর্তমানে ৫০০টি তৈরি পোশাক কারখানা তাৎক্ষণিকভাবে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি উৎপাদনে যেতে সক্ষম। আরো ১ হাজার ৩০০টি কারখানায় নবায়নযোগ্য জ¦ালানি উৎপাদন করা সম্ভব। পর্যায়ক্রমে দেশের সবগুলো তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় নবায়নযোগ্য জ¦ালানি উৎপাদনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শুধু তৈরি পোশাক শিল্পেই নয়, অন্যান্য কারখানায়ও নবায়নযোগ্য জ¦ালানি উৎপাদনের মাধ্যমে নিজস্ব চাহিদা পূরণের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ¦ালানি উৎপাদনের সবচেয়ে সুবিধা হচ্ছে, এ খাতে জ¦ালানির কাঁচামাল কখনোই নিঃশেষ হবে না। সূর্য যতদিন পৃথিবীকে আলোকিত করবে ততদিনই নবায়নযোগ্য জ¦ালানির কাঁচামালের যোগান পাওয়া যাবে। পৃথিবীর মোট জ¦ালানি শক্তির ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি থেকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হার ৩দশমিক ৩শতাংশ। বাংলাদেশ সরকারের জ¦ালানি নীতি অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ¦ালানি থেকে যোগান দেয়া হবে। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে উপযুক্ত জমির অভাব। এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৩ থেকে সাড়ে তিন একর জমির প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই জমি সংকুলান করা খুবই কঠিন কাজ। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের জন্য বিনিয়োগ আহরণ করা বেশ কঠিন কাজ। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের দুর্বলতা রয়েছে। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড এখনো পর্যাপ্ত আধুনিক নয়। ফলে দূরবর্তী এলাকায় উৎপাদিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালন করা অনেক সময়ই সম্ভব হয়না। একটি সূত্র মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৯ হাজার টি গার্মেন্ট ও ১ হাজার ১৬টি টেক্সটাইল কারখানায় সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। নন-গার্মেন্টস খাতের আরো ৫ হাজার ৮৮৩টি কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করা সম্ভব। এছাড়া ১ লাখের বেশি সরকারি অফিস ও দশ লক্ষাধিক আবাসিক ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করা যেতে পারে।

বিদ্যুৎ বিভাগ ও আদালতের নির্দেশ মোতাবেক নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সোলার প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ১০ কিলোওয়াট বা তার বেশি লোডপ্রাপ্ত গ্রাহকদের ক্ষেত্রে অনুমোদিত লোডের অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম সোলার প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশ আগামীতে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সঙ্কটে পতিত হতে যাচ্ছে। সে অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে হবে।