মাহবুবুল হক

গত সোমবার ৩১ আগস্ট ২০২৬-এ রাজধানী ঢাকায় ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)-এর প্রথম সাধারণসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন যায়যায় দিন সম্পাদক শফিক রেহমান এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। এছাড়া ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম কোষাধ্যক্ষ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এই বিশেষ গুণীজনদের আমরা আন্তরিক অভিনন্দন, শ্রদ্ধা, শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও অফুরন্ত দোয়া জানাচ্ছি।

সভাপতি সাহেবের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে, টুকটাক কথাবার্তাও হয়েছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতি নেই। এছাড়া কোষাধক্ষ্য সাহেবের সঙ্গেও আমার ব্যক্তিগত কোনো স্মৃতি নেই। যৎসামান্য স্মৃতি আছে মজলুম সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ভাইয়ের সাথে। তাঁকে স্মরণ করেই আজ এই কলামে কিছু লেখার নিয়ত করেছি। আশা করছি মহান আল্লাহ আমাকে সাহায্য করবেন (ডিমেনশিয়ায় ভুগছি)। যে দ’ুজনের ওপর লিখতে পারছি না তাঁদের কাছে আমি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

দৈনিক আমার দেশ প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর। তখন পত্রিকার প্রকাশক ছিলেন বিএনপির মিডিয়া মোগল মোসাদ্দেক হোসেন ফালু এবং সম্পাদক ছিলেন আমানুল্লাহ কবীর । সে সময় বিএনপি’র নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ক্ষমতায়। চারদলীয় জোটে ছিলো বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট। এই সরকারের আমলে মাহমুদুর রহমান ভাই সিরামিক শিল্প-ব্যবসা (আর্টিসান) স্থগিত রেখে ২০০১ সালে প্রথমে সরকারি চাকরিতে অংশ গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সিরামিক পণ্য সে সময় বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছিলো। সিরামিকের ওপর তিনি জাপানে পূর্বাহ্নে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। তাছাড়া তাঁর ফাদার-ইন-ল এর সিরামিক এর ওপর বিশাল শিল্প ও বাণিজ্য ছিলো, এখনও আছে। জাপানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে ঢাকায় যে শিল্প ও বাণিজ্য গ্রুপে তিনি যোগদান করেছিলেন তাঁদেরও সিরামিকের ব্যবসা ছিলো। এখানে দেখা যায় মাটির সাথে তাঁর নিগুঢ় সম্পর্ক ছিলো এবং রয়েছে। সে কারণেই ‘আর্টিসান’ হয়ে ওঠেছিলো নিখুঁত ও ক্লাসিক শিল্প-কারখানা এবং তাঁরা বাংলাদেশে সর্বোত্তম শৈল্পিক মানের সিরামিক পণ্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সরকারি চাকরিসহ সরকারের ভেতর বাইরের অবস্থা ও ব্যবস্থা দেখে তিনি হয়তো হতাশ হয়েছিলেন। তাই মনে হয় স্বনামধন্য মন্ত্রিত্ব ছেড়ে তিনি বিএনপি ঘরানার সংবাদপত্র আমার দেশে প্রবেশ করেছিলেন। ২০০৬ সালের কোনো এক সময় আমরা একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। উপহার হিসেবে আমরা রাজনীতি ও সংবাদপত্রের সিলেকটেড কিছু বই নিয়েছিলাম। বই দেখে তিনি শুধু খুশী নয়, আপ্লুত ও অভিভূত হয়েছিলেন। সেটাই ছিলো আমার, তাঁর সাথে প্রথম সাক্ষাৎ। এরপরে দ্বিতীয়বার তাঁর সাথে যখন আরো বইপত্র নিয়ে দেখা করতে গেলাম, তখন তিনি বলেছিলেন, এই পত্রিকাটি আমানুল্লাহ কবির ভাই ও মোসাদ্দেক হোসেন সাহেবেরা চালাতে চাচ্ছেন না বা পারছেন না (সঠিক শব্দটি নির্ণয় করতে পারছি না)। এর মালিকানা আমাদেরকেই গ্রহণ করতে হবে। সে নিয়েই অনেক ব্যস্ত রয়েছি। তিনি আমাদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলেন (সংবাদপত্র বিষয়ে)। এরপর বিচ্ছিন্নভাবে আমরা টুকটাক সহযোগিতা করতে থাকি। আমাদের ভালোলাগার বিষয় ছিলো পত্রিকাটি ছিল প্রতিবাদী ও হিম্মতে আগুয়ান।

এরপর ২০০৭ সালের শেষ দিকে তাঁর সাথে আমার শেষ দেখা, যখন তিনি ‘আমার দেশ’ পত্রিকা ক্রয়ের বিষয়ে যারপরনাই পেরেশান ছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন কবি ও রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মাজহার।

২০০৮ সালে মাহমুদুর রহমান ভাই আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হন। মাত্র দু’বছর যুদ্ধ করে পত্রিকা তাঁর মতো করে প্রকাশ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। ২০১০ সালে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার ‘আমার দেশ’ বন্ধ করে দেয় এবং মাহমুদুর রহমান ভাইকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হন এবং পুনরায় পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন। ২০১৩ সালে আবারো ‘আমার দেশ’ বন্ধ করা হয় এবং আবারো তিনি গ্রেফতার হন। এই বন্ধ-খোলার নির্মম-নিষ্ঠুর জাহেলিয়াতের সময় ‘আমার দেশ’ ও মাহমুদুর রহমান ভাইয়ের পক্ষে আল্লাহর রহমতে দেশব্যাপী বহু লেখালেখি শুরু হয়। ‘আমার দেশে’ও তাঁর পক্ষে মোটামুটিভাবে একটা ক্যাম্পেইন চলতে থাকে। সে সময় এই অধমেরও একটা লেখা ‘আমার দেশে’ প্রকাশিত হয়। তখনকার ম্যানেজার আহমদ হোসেন মানিক কনফার্ম করেছেন আমার লেখাটি ছাপা হয় সম্পাদকের জেলে যাওয়ার প্রথম মুদ্দতে। সেখানে আমি একটু আগ বাড়িয়ে বলেছিলাম, ভবিষ্যতে বিএনপি আপনাকে ছাড়াই চলবে। আপনি ইতোমধ্যে যে সততা, সাহসিকতা, দেশপ্রেম, সত্যবাদিতা, কুরবানি ও একনিষ্ঠতা প্রমাণ করেছেন তা’ বিএনপি’র চরিত্রে নেই। আপনার গুনাবলি উন্নত জাতির, উন্নত মানের গুনাবলি। আপনি আপনার উজ্জ্বলতম ক্যারিয়ার সেক্রিফাইস করে নিজের সহায়-সম্পদ উজাড় করে যে পথে নেমেছেন সেটা এযুগে, এসময়ের দৃষ্টান্ত নয়, এটা স্বর্ণযুগের উদাহরণ। এটা একধরনের খালি হাতে মহাসমুদ্রে ঝাঁপ দেয়া। আপনার কপালে অনেক দুঃখ আছে, কষ্ট আছে, আপনি বন্ধুহীন হয়ে পড়বেন। ডান-বাম ও মধ্যপন্থী কোনো জায়গা থেকে কেউ আপনার বন্ধুত্ব গ্রহণ করবে না বা আপনাকে বন্ধু বানাবে না। আপনি হবেন নিঃসঙ্গ যাত্রী। সত্যের উপাসকরা কোনোকালে কোনোদিন বন্ধু পায় না। চেষ্টা করলেও ধরে রাখতে পারে না। কারণ দলবল, অর্থবিত্ত, স্টেটাস সবকিছু বিরাজমান রেখে সত্যের নিশান নিয়ে দৌড়ানো যায় না। একাই দৌড়াতে হয়। আর আপনি যদি বিএনপিতেই অবস্থান করতে চান, তাহলে আপনি যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা পাবেন না। আপনার যে আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ, তাতে মনে হয় না আপনি সেখানে অনেকদিন অবস্থান করতে পারবেন। আপনাকে আল্টিমেটলি বিএনপি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

কেন এসব লিখেছিলাম? কারণ আমার জানা ছিল দুজন দু’রকম, দুই মেরুর, একজন আকাশের আরেকজন পাতালের।(বিএনপিকে একজন মানুষ হিসেবে ধরে নিয়ে এই বিবেচনা)

এবার একটু ব্যাখ্যা না দিলে বিষয়টা হয়তো পরিষ্কার হবে না। সেজন্য সম্মানিত পাঠককে অযাচিতভাবে একটু কষ্ট দিচ্ছি।

বিএনপির জন্ম অলটারনেটিভ প্রেক্ষাপট থেকে। মূল জন্মটা সেনা ছাউনিতে। পজেটিভ জন্ম নয়। যে কারণেই হোক দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটা বড় ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিলো। মহান আল্লাহর প্রকৃতিতে কোনো শূন্যতা অপূর্ণ থাকে না। এটা অটোমেটিক পূর্ণ হয়ে যায়।

বিএনপি মহৎ কোনো লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচী নিয়ে এবং ব্যাকগ্রাউন্ডের কোনো প্রেক্ষাপট নিয়ে, প্রতিশ্রুতিশীল কোনো রাজনৈতিকদল ছিলো না। এটি হলো একটি ভাগ্যক্রমে শূন্যতা পূরণের রাজনৈতিক দল। এই দলে কারা প্রথম যোগ দিয়েছিলো বা কারা প্রথম শহীদ জিয়াউর রহমানের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন বা অনুরোধ পেয়েছিলেন, আসুন সেদিকে একটু দৃষ্টিপাত করি। শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ একজন মুক্তিযোদ্ধা। যিনি স্বাধীনতার ঘোষক ছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সকল মুক্তিযোদ্ধা দলকে নিয়ে সরকার গঠন করেন নি। আওয়ামী লীগ একাই মুক্তিযুদ্ধ করে নি। কিন্তু শেখ মুজিব একটা বড় ভুল করে ফেললেন, এই একটি বড় জায়গায়। অন্যরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে, দলভিত্তিক হোক বা ব্যক্তি, তারা এই বিষয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছে, বিক্ষুব্ধ হয়েছে। শেখ মুজিব এখানে অনেক বড় জাতীয়ভিত্তিক অন্যায় করেছেন। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর উচ্চ ও মধ্যম মহলে এ নিয়ে দারুণ হতাশা ছিলো। সেনাবাহিনীকে মূল্যায়ন করা হয় নি। সেনাবাহিনীকে শুধু নয়, বাম-ঘরানার যেসব দল ও ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন তাদেরও সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় নি। শুধু মূল্যায়ন করা হয়েছে আওয়ামী লীগারদের। অথবা ভূয়া আওয়ামী লীগারদের। এ জায়গায় এসে শেখ মুজিব ঐতিহাসিক একটি বড় কাজ করেছেন। তাহলো যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা দেশ ফেলে রেখে ভারতে যান নি এবং-এর বাইরে যারা নিরপেক্ষ ছিলো তাদের সবাইকে সাধারণ ক্ষমার আওতায় এনেছেন। এর মৌলিক কারণ হলো, শেখ মুজিব মুসলিম লীগার হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনের মহান সৈনিক ছিলেন। এটা স্বাধীনতাপ্রাপ্ত সকল দেশের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃত কনভেনশন ও প্র্যাকটিস। প্রতিবেশী দেশ ভারতের স্বাধীনতার সময় দ্বি-জাতি তত্ত্বের কারণে যারা সচেতনভাবে বিরোধিতা করেছিলো, তাদেরকে নেহেরু সরকার সাধারণ ক্ষমা প্রদান করেছিলো। তার ফলে রাষ্ট্র গঠনে তাদের মধ্যকার বিদগ্ধজন, বিজ্ঞজন দেশকে সাহায্য করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। এটা ঐতিহাসিক হলেও চিরাচরিত রাজনীতির সাধারণ প্রথা। এই বিষয়টিকে আওয়ামী লীগসহ দলমত নির্বিশেষে তাবত মুক্তিযোদ্ধারা অন্তর থেকে মেনে নিতে পারেন নি।

একদিকে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য সকল মুক্তিযোদ্ধা কমবেশী অপমানবোধের স্বীকার হয়েছিলেন । অপরদিকে মোটাদাগে স্বাধীনতা বিরোধীরা শেখ মুজিরের নিকট থেকে বড় ধরনের আইনি সুবিধা পাওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবেই সেকুলার মুক্তিযোদ্বারা কখনও শেখ মুজিবের ওপর তেমনভাবে সন্তুষ্ট হতে পারে নি। জাতি এই জায়গায় এসে প্রথম বিভক্ত হয়ে গেল।

মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জিয়াউর রহমান সুকৌশলে শেখ মুজিবের পন্থা অবলম্বন করলেন। তিনি অভিজ্ঞ-বিজ্ঞ, প্রবীণ মুসলিম লীগারদের ক্ষমতায় অংশগ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। তারা আসলেন। বিপুলভাবে বিএনপির রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করলেন। বিএনপির বেড়ে ওঠা এদের হাতেই (এটাই শহীদ জিয়ার সবচেয়ে বড় দোষ)।

সেনাবাহিনীর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ক্ষোভ ছিলো। সে কথা পূর্বে আলোচনা করেছি। কিন্তু তাদের মধ্যে আবার বিভক্তি ঘটেছিলো সেকথা বলতে সেই ক্ষণে স্মরণ ছিলো না। সেই বিভক্তির ফলে দেশ, জাতি, রাষ্ট্রের অনেক ক্ষতির কারণ হয়েছে।

দেশকে এ অবস্থায় রেখে জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করলেন। ক্ষমতায় এলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। বিচারপতিকে সরিয়ে এলেন আলহাজ হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি বিরোধী দলে। বিএনপির হাল তখন বিচারপতি আবদুস সাত্তারের হাতে। তিনি শহীদ জিয়ার আদলেই বিএনপি গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই উদ্যোগটা ছিলো একধরনের ডানপন্থার উদ্যোগ।

বিএনপির মধ্যে ইত্যবসরে আওয়ামী লীগ করে না, আওয়ামী লীগ করে নি এবং রাজনীতিতে প্রভাবশালী হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ যাদেরকে কখনো গ্রহণ করে নি এ ধরনের দোদুল্যমান ও ঘরছাড়া ব্যক্তিরা বিভিন্নভাবে এসে বিএনপিতে আশ্রয় গ্রহণ করে। ঠিক একই সময় রুশপন্থী রাজনীতিকগণ আওয়ামী লীগের দুর্বল অবস্থায় সেখানে যোগদান করার সুবিধা পেয়ে যান। পাশাপাশি চীনপন্থী তথা ভাসানীপন্থী বিভিন্ন ও বিচ্ছিন্ন রাজনীতিকগণ বিএনপিতে প্রবেশ করার রাজতোরণ পেয়ে যান। সে সময় বিএনপির সচিবদের তালিকা দেখলে বিষয়টি ক্লিন, ক্লিয়ার ও ক্রিস্টাল হয়ে যাবে। বিচারপতি আবদুস সাত্তারের ডানপন্থা এখানেই পরাজিত হয়।

বিএনপির মূল ক্ষমতা চলে আসে ভাসানীপন্থী রাজনীতিক নেতৃত্বের হাতে। বিচারপতি আবদুস সাত্তার বিএনপির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, তাঁকে সে সুযোগ দেয়া হয় নি। এই সুযোগে দলছুট, ডানপন্থী, বামপন্থী ইত্যাদি হেট্রোজেনাস ইলিমেন্টগণ বেশ খেলাধুলা শুরু করে দিলেন। তাঁরা খালেদা জিয়াকে বিএনপির রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট করেন। পরবর্তীতে কৌশলে বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে ১৯৮৪ সালের ১০মে পার্টির চেয়ারপারসন নির্বাচিত করেন।

খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেন, শহীদ জিয়ার জায়গা থেকে তিনি সরে যাচ্ছেন। খাল খননসহ শহীদ জিয়ার প্রায় সকল প্রজেক্ট নানা ছুতা-নাতায় বন্ধ হয়ে যায়। নতুন নতুন এমনসব প্রজেক্ট গ্রহণ করা হয়, যেখানে স্পষ্টভাবে দুর্নীতির সুযোগ ও সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। কারণও ছিল। তাঁর পূর্বে ক্ষমতায় ছিলেন এরশাদ, যিনি এদেশের সেনাবাহিনী, আমলা, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মিডিয়া, বিচার, আইন, সংসদ, আবাসন, বলতে গেলে সকল ইনস্টিটিউশনকে দুর্নীতিতে ভরে দিয়েছিলেন।

শেখ মুজিবের আমল থেকেই এ দেশে দুর্নীতির সূত্রপাত । মাঝে জিয়ার আমলে (১৯৭৯-৮১) দুর্নীতির প্রসার ঘটেনি। তিনি নিজে সৎ ছিলেন। সুনীতি পছন্দ করতেন। দুর্নীতি দমাতে, আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতেন। কিন্তু ‘আই উইল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট’ বলার পর বিভিন্ন দল ভাঙ্গা-গড়া করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতিতে যে একেবারে প্রবেশ করেন নি, এমন নয়।

কিন্তু এরশাদ কখনো সুনীতির ধারে কাছে ছিলেন না। দুর্নীতিই ছিল তাঁর ও তাঁর সরকারের প্রধান বাহন। দুর্নীতির ঘোড়ায় চড়ে তিনি (১৯৮২-১৯৯০) ৯ বছরের অধিককাল ধরে মহানন্দে দেশ পরিচালনা করেছেন। দেশ তখন দুর্নীতির নদীতে ভাসছিল।

বিএনপির দুর্নীতির কারণে দু’বারই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। এটা ভুলে গেলে চলবে না। এটাও গভীরভাবে মনে রাখতে হবে। তারা যদি পরম করুণাময় মহান আল্লাহতালার কাছে তওবা ইস্তেগফার করেন, সেটা ভিন্ন কথা। সেটা খুব পজিটিভ কথা। আশা ও ভরসার কথা।

মাহমুদুর রহমান ভাইয়ের চোখে এই অধমের লেখা পৌঁছবে কিনা জানি না। তবে একবার দূর থেকে তাঁকে জানানোর চেষ্টা করেছিলাম, অধিকাংশই তো শহীদ হয়েছেন আর আপনি হয়েছেন পরম সম্মানিত ও মর্যাদাবান গাজী। বর্তমান বাংলাদেশের এক নম্বর গাজী। মহান আল্লাহ এখন আপনাকে অনেক সম্মান ও মর্যাদার মধ্যে রেখেছেন, আশা করি সেটা বজায় রাখার জন্য আপনি জিহাদ করবেন।