কিছু মানুষকে স্মরণ করা মানে শুধু তাঁদের জীবনের ঘটনাগুলো মনে করা নয়; বরং তাঁদের জীবন, চিন্তা, আদর্শ, সাহস ও আত্মত্যাগের সঙ্গে নিজের স্মৃতিগুলোকে নতুন করে আবিষ্কার করা। সময় চলে যায়, মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু মানুষের কথা, কিছু দৃশ্য, কিছু বাক্য এবং কিছু মুহূর্ত হৃদয়ের ভেতর এমনভাবে গেঁথে থাকে— যা কোনোদিন মুছে যায় না। শহীদ মীর কাসেম আলী ভাই আমার জীবনে তেমনই একজন মানুষ।

তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। চাকরি জীবনে তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে, তাঁর কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়েছি, কখনো তাঁর রাগের মুখোমুখি হয়েছি, আবার কখনো তাঁর স্নেহ ও ভালোবাসায় আপ্লুত হয়েছি। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের যে স্মৃতিটি আজও আমার চোখের সামনে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে আছে, সেটি কারাগারের সে ঈদের দিন। মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন মানুষ, যিনি জানেন তাঁর সামনে জীবনের শেষ প্রহর অপেক্ষা করছে— তবু তাঁর কণ্ঠে ছিল প্রশান্তি, আচরণে ছিল দৃঢ়তা এবং আল্লাহর প্রতি ছিল গভীর আস্থা।

কারাগারের অন্ধকারে এক ঈদের সকাল : জেলখানায় শহীদ মীর কাসেম আলী মিন্টু ভাইয়ের ফাঁসির আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়, কারণ ছিল তিনি যে কাশিমপুর কারাগারে আছেন, সে সময় কাশিমপুর কারাগার পরিদর্শনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যাওয়ার কথা ছিল— এমন পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সেখান থেকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছিল।

কারাগারের জীবন এমনিতেই কঠিন। তার ওপর ডাণ্ডাবেড়ি পরা বন্দি, কনডেম সেলের বন্দি কিংবা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জীবন আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। কনডেম সেলের বন্দিদের সাধারণত সেলের বাইরে বের হওয়ার সুযোগও থাকে না। কিন্তু ঈদ এমন একটি দিন, যেদিন বন্দিদের হৃদয়েও স্বাভাবিকভাবেই পরিবার, সমাজ ও আপনজনদের কথা আরও বেশি করে মনে পড়ে।

সে সময় আমি কারাগারে বন্দি ছিলাম। ঈদের নামাযের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব আমাদের ওপর আসে। কারাগারের জেলারকে বিষয়টি জানিয়ে নামাযের আয়োজন করি। তখন কারাগারে জামায়াতশিবিরের প্রায় দেড় শতাধিক বন্দি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বর্তমান পটুয়াখালী-১ (বাউফল) এলাকার সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, বর্তমান শেরেবাংলা নগর উত্তর থানার আমীর আব্দুল আওয়াল আজমসহ আরও অনেকে। আমরা জানতাম না, সে ঈদের জামাত আমাদের জীবনের কত বড় একটি স্মৃতি হয়ে থাকবে।

শহীদ মীর কাসেম আলী ভাই যখন নামাযে এলেন, মুহূর্তটি যেন অন্যরকম হয়ে উঠল। মৃত্যুর প্রহর গুনছেন একজন মানুষ, অথচ তাঁর মুখে ছিল না আতঙ্কের কোনো ছাপ। বরং তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন তাঁর রবের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তুতিতে আছেন। আমি তখন ডেপুটি জেলারকে অনুরোধ করলাম, কারাগারে থাকা জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যেন অন্তত হাত মেলানোর অনুমতি দেওয়া হয়। অনেক কথাবার্তার পর অনুমতি পাওয়া গেল। প্রায় ১৫০ জন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী তখন কারাগারে ছিলেন। তাঁরা একে একে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। কেউ হাত মেলালেন, কেউ কুশল বিনিময় করলেন, কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। পুরো পরিবেশটা হয়ে উঠেছিল আবেগঘন।

আমি তাঁর পাশে দাঁড়ালাম। কথা বলতে বলতে একসময় কান্না চলে এলো। তিনি আমার কাঁধে হাত রাখলেন। তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা আজও আমার কানে বাজে— “তুমি তো অত্যন্ত সাহসী মানুষ, শক্ত মানুষ। কাঁদছ কেন? কিছুই হবে না। আর যদি হয়, তাতেও কোনো সমস্যা নেই।”

কতটা আত্মিক শক্তি থাকলে একজন মানুষ মৃত্যুর এত কাছে দাঁড়িয়েও অন্যকে সান্ত্বনা দিতে পারেন! সাধারণ মানুষ যখন নিজের জীবনের সামান্য বিপদেও ভেঙে পড়ে, তখন একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে সাহস দিচ্ছেন— এ দৃশ্যের গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আজ ভাবি, সেটিই ছিল আমার জীবনের অন্যতম শেষ দেখা। তখন হয়তো আমরা কেউই বুঝতে পারি নি, সেই সাক্ষাৎটি এতো অমূল্য হয়ে উঠবে।

মৃত্যুর প্রস্তুতি— কতটা কঠিন এক বাস্তবতা!

শহীদ মীর কাসেম আলী ভাইয়ের শাহাদাতের পরে আমাকে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কাশিমপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। কাশিমপুর কারাগারের একজন দর্জির কাছ থেকে পাওয়া আরেকটি ঘটনা তাঁর মানসিক দৃঢ়তার এক অনন্য চিত্র তুলে ধরে। ফাঁসির আগে তাঁকে কয়েদির পোশাক পরতে হবে। সে পোশাক তৈরির দায়িত্ব পড়ে কারাগারের দর্জির ওপর। দর্জি দুইটি পোশাক তৈরি করে দেন। কিন্তু কোনোটিই তাঁর পছন্দ হয়নি। অবশেষে তিনি দর্জিকে বললেন—তুমি কি জানো, এ পোশাক পরে আমি কোথায় যাব? দর্জি হয়তো তখনও বুঝতে পারছিলেন, কিন্তু উত্তর দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি নিজেই বললেন— এ পোশাক পরে আমি ফাঁসির মঞ্চে যাব। সুতরাং ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে কয়েদির পোশাকটাও যেন সুন্দর হয়। তুমি আমাকে সেভাবে একটি পোশাক বানিয়ে দাও।

একজন মানুষ জানেন— তিনি যে পোশাকটি পরছেন, সেটিই হয়তো তাঁর জীবনের শেষ পোশাক। কয়েক ঘণ্টা কিংবা কয়েক দিন পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে মৃত্যুর মঞ্চে। তবুও তিনি পোশাকের সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলছেন। কারণ তাঁর কাছে মৃত্যু ছিল কেবল পৃথিবীর জীবনের সমাপ্তি নয়; বরং মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে ফিরে যাওয়ার এক অনিবার্য যাত্রা। আল্লাহ তাআলা বলেন— “হে আদম সন্তান! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় তোমাদের সাজসজ্জা গ্রহণ করো।” — সূরা আল-আ‘রাফ: ৩১

তিনি এ আয়াতের শিক্ষা শুধু মুখে ধারণ করেন নি— নিজের জীবনেও তা আমল করতেন। আমি দীর্ঘ বছর নামযের সময় তাকে এ শিক্ষা অনুসরণ করতে দেখেছি। সবসময় কারাগারে একই পদ্ধতি অনুসরণ করেতেন, যা গোলাম মাওলা রনি তার কারাগারের বর্ণনায় বলেছেন। নামাযের সময় পরিপাটি ও সুন্দর পোশাক পরাকে তিনি ইবাদতের অংশ হিসেবে দেখতেন। মৃত্যুর অপেক্ষায় থেকেও পোশাকে সৌন্দর্য— এ যেন দুনিয়ার শেষ মুহূর্তেও রবের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তুতি। মৃত্যুর কথা জেনে-বুঝে মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়া কোনো সহজ বিষয় নয়। এটি মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির সম্পূর্ণ বিপরীত। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়। জীবনকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু শহীদ মীর কাসেম আলী ভাই যেন নিজের অন্তরকে অন্য এক বিশ্বাসে প্রস্তুত করেছিলেন। তাঁর কথাবার্তায় মনে হয়েছে, তিনি মৃত্যুকে ভয় হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার বাস্তবতা হিসেবে দেখতেন। এই জায়গাটিই তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলোর একটি।

একজন কর্মদক্ষ মানুষ, একজন স্বপ্নবান উদ্যোক্তা

শহীদ মীর কাসেম আলী ভাইকে শুধু একজন রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখলে তাঁর ব্যাপ্তিকে ছোট করে দেখা হবে। চাকরি জীবনে তিনি ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের মার্কেটিং ডিরেক্টর ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করার সময় দেখেছি, তাঁর চিন্তার পরিধি ছিল অনেক বিস্তৃত। কখনো কোনো বিষয়ে একটু রাগ করে কথা বলতেন। কিন্তু সেই রাগের মধ্যেও থাকত শিক্ষা, পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের নির্দেশনা। তিনি প্রায়ই বলতেন—“তোমরা দেশ চালাবে। এক কাজ নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। তোমাদেরকে একসঙ্গে পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন করতে হবে।” এ কথাটি শুধু একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশনা ছিল না। এর মধ্যে ছিল ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দর্শন। পরিকল্পনা করতে হবে, কিন্তু শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না। পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। একটি কাজ সফল হলে সেখানে থেমে থাকলে চলবে না; নতুন উদ্যোগ নিতে হবে, নতুন মানুষ তৈরি করতে হবে, নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। তাঁর মাথায় সবসময় হাজারো চিন্তা ঘুরপাক খেত। কীভাবে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা যায়? কীভাবে নতুন উদ্যোগ নেওয়া যায়? কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়? কীভাবে মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়? এসব ছিল তাঁর চিন্তার অংশ। তাঁর এই চিন্তাভাবনা পরবর্তীকালে বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যেও আমরা দেখতে পেয়েছি।

একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের অধ্যায়

দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশনের সময়ও তাঁর সঙ্গে কাজ করার স্মৃতি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান শুধু একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়— এটি একটি চিন্তার প্ল্যাটফর্ম, একটি সমাজকে প্রভাবিত করার মাধ্যম এবং মানুষের কাছে সত্য ও মতামত পৌঁছে দেওয়ার একটি শক্তিশালী অবকাঠামো। সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে অর্থ সংগ্রহ ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু শহীদ মীর কাসেম আলী ভাই সে চ্যালেঞ্জ থেকে দূরে থাকেন নি। বরং আমাদের সঙ্গে সামনে থেকে এগিয়ে ছিলেন। আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছি। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে মিডিয়া কর্পোরেশনের শেয়ারহোল্ডার সংগ্রহের চেষ্টা করেছি। সে কাজের পেছনেও তাঁর চিন্তা, শ্রম ও নেতৃত্ব ছিল।

তিনি শুধু স্বপ্ন দেখতেন না— স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথও খুঁজতেন। আজকের দিনে আমরা যখন উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান, নতুন শিল্প, নতুন প্রতিষ্ঠান কিংবা নতুন উদ্যোগের কথা বলি, তখন তাঁর সেই চিন্তাধারার কথা মনে পড়ে।

নেতৃত্বের অর্থ শুধু সামনে থাকা নয় : শহীদ মীর কাসেম আলী ভাইয়ের জীবন থেকে আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— নেতৃত্ব মানে শুধু সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা নয়। নেতৃত্ব মানে মানুষের মধ্যে সম্ভাবনা খুঁজে বের করা। নেতৃত্ব মানে অন্যকে তৈরি করা। নেতৃত্ব মানে পরিকল্পনা করা এবং সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে কাজ করা। তিনি আমাদের ওপর দায়িত্ব দিতেন। কখনো কঠোরভাবে বলতেন। কখনো ভুল ধরিয়ে দিতেন। কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে তৈরি করা। তাঁর সেই কথাটি—“পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন”—আজও আমার কাছে একটি জীবন্ত শিক্ষা। কারণ শুধু আবেগ দিয়ে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। শুধু স্লোগান দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো যায় না। শুধু স্বপ্ন দেখলেই কোনো পরিবর্তন আসে না। স্বপ্নের সঙ্গে পরিকল্পনা দরকার, পরিকল্পনার সঙ্গে দক্ষতা দরকার এবং দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োজন বাস্তবায়নের সাহস। শহীদ মীর কাসেম আলী ভাই এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে দেখতেন।

শেষ সাক্ষাতের স্মৃতি : মানুষের জীবনে কিছু সাক্ষাৎ থাকে, যার গুরুত্ব তখন বোঝা যায় না। সময় চলে যাওয়ার পর সেই সাক্ষাৎই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলোর একটি। কারাগারের সে ঈদের নামায় আমার কাছে তেমনই একটি স্মৃতি। আজও চোখ বন্ধ করলে সে দৃশ্য দেখতে পাই। চারপাশে বন্দিদের ভিড়। কঠোর কারাগারের পরিবেশ। ঈদের নামায। আর সে মানুষের মুখ, যিনি জানেন তাঁর সামনে মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে। আমি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলাম। তিনি আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। ভাবলে বিস্মিত হতে হয়— যার নিজের সামনে মৃত্যু, তিনিই অন্যকে সাহস দিচ্ছেন। এটাই হয়তো বিশ্বাসের শক্তি। এটাই হয়তো আদর্শের শক্তি। এটাই হয়তো একজন দৃঢ়চেতা মানুষের শক্তি।

স্মৃতি থেকে শিক্ষা : শহীদ মীর কাসেম আলী ভাই আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর জীবন থেকে নেওয়ার মতো শিক্ষা রয়েছে অনেক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন স্বপ্ন দেখতে। শিখিয়েছেন পরিকল্পনা করতে। শিখিয়েছেন পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে। শিখিয়েছেন মানুষ তৈরি করতে। শিখিয়েছেন প্রতিষ্ঠান গড়তে। আর জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে শিখিয়েছেন— মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বিশ্বাস ও সাহস হারানো যায় না। একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য তাঁর জীবনের দৈর্ঘ্যে নয়; তাঁর জীবন কত মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও কর্মকে প্রভাবিত করেছে, তার ওপর।

শহীদ মীর কাসেম আলী ভাইয়ের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলো তাই কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে না। এগুলো আমাদের জন্য শিক্ষা ও দায়িত্বের কথাও বলে। কারাগারের সেই ঈদের দিনে তাঁর কাঁধে আমার হাত ছিল না— বরং তাঁর হাত ছিল আমার কাঁধে। তিনি আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। আজ এত বছর পর মনে হয়, সে মুহূর্তে তিনি হয়তো শুধু আমাকে নয়, আমাদের একটি প্রজন্মকেই যেন বলে গিয়েছিলেন— ভয় পেয়ো না। কঠিন সময় আসবে। পরীক্ষাও আসবে। কিন্তু বিশ্বাস হারিয়ো না। দায়িত্ব থেকে সরে যেয়ো না। পরিকল্পনা করো, কাজ করো, মানুষ তৈরি করো এবং সত্যের পথে অবিচল থাকো।

মানুষ চলে যায়, স্মৃতি থেকে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাঁদের চিন্তা, কর্ম ও আদর্শের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকেন। শহীদ মীর কাসেম আলী ভাই আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ— যাঁকে শেষবার দেখেছিলাম কারাগারের এক ঈদের জামাতে, মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা একজন বন্দি হিসেবে; কিন্তু যাঁর চোখে আমি দেখেছিলাম জীবনের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর রবের প্রতি অটুট আস্থা। সে শেষ দেখা আজও আমার হৃদয়ে অম্লান।

সময় পেরিয়ে যাবে। প্রজন্ম বদলাবে। কিন্তু সে ঈদের সকাল, সে করমর্দন, সেই অশ্রুসিক্ত মুহূর্ত এবং কাঁধে হাত রেখে বলা সে কথাগুলো— “কাঁদছ কেন? কিছুই হবে না। আর যদি হয়, তাতেও কোনো সমস্যা নেই”—আমার স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে। এটাই হয়তো একজন মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন— তিনি চলে গিয়েও অন্যের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন।