[একজন প্রত্যক্ষ স্মৃতিধারীর চোখে সাহস, দৃঢ়তা, মানুষের ভালোবাসা ও শেষ বিদায়ের এক দীর্ঘ অধ্যায়]
কিছু মানুষকে আমরা শুধু কাছে থেকে দেখি না- তাঁদের জীবনের কিছু মুহূর্ত আমাদের নিজেদের জীবনের অংশ হয়ে যায়। সময় চলে যায়, বছর পেরিয়ে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়; কিন্তু কিছু দৃশ্য, কিছু কণ্ঠস্বর, কিছু রাতের অন্ধকার আর কিছু মানুষের মুখ হৃদয়ের ভেতর এমনভাবে গেঁথে থাকে, যা কোনোদিন মুছে যায় না।
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রহ.)-কে ঘিরে আমার জীবনের স্মৃতিগুলোও তেমনই। তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়ের সব ঘটনা হয়তো আজ আর স্পষ্টভাবে মনে নেই, কিন্তু ১৯৯৩ সালের সেই কুয়াশায় ঢাকা দীর্ঘ রাত, ১৯৯৪ সালের নারায়ণগঞ্জ ঈদগাহ মাঠের উত্তেজনাপূর্ণ দিন এবং জীবনের শেষ প্রান্তে ২০২৩ সালের সেই বেদনাবিধুর রাত- এই তিনটি অধ্যায় আজও আমার চোখের সামনে জীবন্ত।
এসব শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়; আমার কাছে এগুলো একটি সময়ের দলিল। এমন এক সময়ের দলিল, যখন যোগাযোগব্যবস্থা ছিল সীমিত, রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল উত্তপ্ত, আর কোনো একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করাও অনেক সময় সাহস, ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াত।
১৯৯৩: কুয়াশায় ঢাকা সেই দীর্ঘ রাত : ১৯৯৩ সালের কথা। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের একটি মাহফিল ছিল। তখনকার বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশের মধ্যে ব্যবধান ছিল অনেক। মোবাইল ফোন ছিল না, তাৎক্ষণিক যোগাযোগের সুযোগ ছিল না, আর নদীপথে যাতায়াত ছিল অনেক মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
মাহফিলে যাওয়ার জন্য আমরা ফতুল্লা থেকে ট্রলারে করে রওনা হয়েছিলাম। অনুষ্ঠানস্থলের কাছাকাছি পৌঁছানোর পরই দেখা দিল বিপত্তি। নদীতে ভাটা শুরু হয়ে যাওয়ায় ট্রলার আর এগোতে পারছিল না। স্থানীয় লোকজন কচুরিপানা ও মাটি দিয়ে কোনোভাবে একটি পথ তৈরি করেছিলেন। সেই পথ পেরিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছাতে আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেল। মাহফিল শেষ হতে হতে রাতও গভীর হয়ে গেল। অনুষ্ঠান শেষে ট্রলারে উঠে দেখা গেল-তেল নেই। আবার তেল সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হলো। সবকিছু গুছিয়ে যখন যাত্রা শুরু করলাম, তখন চারদিকে গভীর রাত, প্রচণ্ড শীত আর ঘন কুয়াশা। কুয়াশা এতটাই ঘন ছিল যে নিজের হাতও চোখের সামনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না।
এর মধ্যেই আরেক বিপত্তি। ট্রলারের মাঝি পথ হারিয়ে মুন্সিগঞ্জের দিকে চলে গেলেন। আমরা তখনও বিষয়টি বুঝতে পারি নি। পরে মুন্সিগঞ্জ ঘাটের আলো চোখে পড়ার পর বুঝতে পারলাম-আমরা ভুল পথে চলে এসেছি। আবার ট্রলার ঘুরল। ফতুল্লার উদ্দেশে যাত্রা শুরু হলো। কিন্তু রাতের সে যাত্রার সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় তখনও বাকি।
মাঝনদীতে আমরা ডাকাতের কবলে পড়লাম। চারপাশে আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা, মানুষের চিৎকার-এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। সে মুহূর্তে মানুষের আসল চরিত্র অনেক সময় প্রকাশ পায়। কেউ আতঙ্কিত হয়, কেউ দিশেহারা হয়ে পড়ে, কেউ আবার কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেকে স্থির রাখে।
সেদিন মাওলানা সাঈদী সাহেবের সঙ্গে তাঁর সন্তান মরহুম রফিক বিন সাঈদী ছিলেন, “সেদিন আমাদের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন পৌর আমীর মাওলানা মইনুদ্দিন এবং সুপার স্টার কোম্পানির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মরহুম জনাব মো. ইব্রাহীম।” সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আমি তাঁকে এক ভিন্ন রূপে দেখেছিলাম। আতঙ্কের মধ্যেও তাঁর মধ্যে যে স্থিরতা, সাহস ও মানসিক দৃঢ়তা দেখেছিলাম, সেটি আমার স্মৃতিতে আজও অমলিন।
সাহস মানে যে ভয়কে অস্বীকার করা নয়, বরং ভয়কে সামনে রেখেও নিজেকে স্থির রাখা- সেদিন যেন তারই একটি বাস্তব উদাহরণ দেখেছিলাম। অনেক কষ্ট, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার পর অবশেষে আমরা ঘাটে পৌঁছাতে সক্ষম হলাম। রাত তখন প্রায় চারটা। সাঈদী সাহেবকে শান্তিবাগের বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমি নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হলাম।
ফজরের নামাযের পর যখন নারায়ণগঞ্জে ফিরলাম, মনে হলোÑ দীর্ঘ এক দুঃস্বপ্নের রাত যেন শেষ হলো। কিন্তু আমার ঘরে তখনও আরেকটি গল্প অপেক্ষা করছিল। সেদিন আমার আম্মা গ্রাম থেকে আমার বাসায় এসেছিলেন। কোনো মোবাইল ফোন ছিল না, যোগাযোগের সহজ কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সারারাত তিনি আমার জন্য দুশ্চিন্তা করেছিলেন। ঘুমাতে পারেননি।
আজও সেই দৃশ্য মনে পড়লে বুঝতে পারি- একজন মায়ের কাছে সন্তানের নিরাপত্তার চেয়ে বড় উদ্বেগ আর কিছু হতে পারে না। সেই রাত তাই শুধু সাঈদী সাহেবকে ঘিরে একটি স্মৃতি নয়; সেটি আমার মায়ের উদ্বেগ, নদীর অন্ধকার, কুয়াশা, বিপদ আর শেষ পর্যন্ত নিরাপদে ফিরে আসার এক দীর্ঘ মানবিক গল্প।
১৯৯৪: নারায়ণগঞ্জ ঈদগাহ মাঠে সাহসের এক অনন্য অধ্যায় : ১৯৯৪ সালে নারায়ণগঞ্জ ঈদগাহ মাঠে মাওলানা সাঈদী সাহেবের আরেকটি মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। সে সময় নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। আমার স্মৃতিতে আছে, শামীম ওসমান ও তাঁর অনুসারীদের পক্ষ থেকে ওই মাহফিল প্রতিহত করার ঘোষণা এসেছিল। পরিস্থিতি যে সহজ ছিল না, সেটি আমরা তখনই বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলামÑ যে কোনো পরিস্থিতিতে মাহফিল বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। মাহফিল ছিল বিকেলে।
আমরা ফজরের নামায পড়েই মাঠে অবস্থান গ্রহণ করেছিলাম। কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমার ওপরও ছিল। “সকাল যত গড়াতে থাকে, পরিস্থিতির উত্তেজনাও বাড়তে থাকে।
আমার স্মৃতিতে, বেলা প্রায় দশটার দিকে শামীম ওসমান ও তাঁর অনুসারীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে প্রশাসনের অনুরোধে আমরা মাঠ ছেড়ে দিই। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে কোনো বক্তার পক্ষে কর্মসূচিতে আসা থেকে বিরত থাকা খুবই স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত হতে পারত। কিন্তু মাওলানা সাঈদী সাহেব তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন- তিনি আসবেন এবং মানুষের সামনে কথা বলবেন। তিনি এসেছিলেনও। ঈদগাহ মাঠে তখন আর মাহফিল করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তিনি ফিরে যাননি। পাশের একটি মসজিদে আসরের নামায আদায় করেন এবং সেখানেই বক্তব্য শুরু করেন। এরপর যা ঘটেছিল, সেটি আমার কাছে সে দিনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্য।
দেখতে দেখতে চারপাশে মানুষের ঢল নামতে শুরু করল। মানুষ আসতে লাগল। অল্প সময়ের মধ্যে মসজিদ ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হলো। শেষ পর্যন্ত মাগরিব পর্যন্ত তিনি বক্তব্য রাখলেন এবং সেখান থেকেই পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।
সেদিন আমি একটি বিষয় খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছিলাম- একটি কর্মসূচির শক্তি শুধু তার নির্ধারিত স্থান বা মঞ্চে থাকে না; মানুষের ভালোবাসা ও আস্থাই অনেক সময় সেই কর্মসূচির প্রকৃত শক্তি হয়ে ওঠে। ঈদগাহের মাঠ বন্ধ করা গেলেও মানুষের মন বন্ধ করা যায় নি। মঞ্চ বদলে গেলেও বক্তব্য থামে নি। প্রতিকূলতা তৈরি হলেও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের পথ বন্ধ হয় নি।
আমার কাছে ১৯৯৪ সালের সে দিনটি তাই শুধু একটি মাহফিলের ঘটনা নয়; এটি প্রতিকূলতার সামনে দৃঢ় থাকার একটি স্মৃতি। তিন দশক পর: ২০২৩ সালের সে শেষ রাত সময় কখনো থেমে থাকে না। ১৯৯৩ সালের সে রাত থেকে ১৯৯৪ সালের সে দিন পেরিয়ে প্রায় তিন দশক পর এল ২০২৩ সাল।
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের মৃত্যুর সংবাদ যখন পেলাম, মনে হলো বহু বছরের স্মৃতি যেন একসঙ্গে ফিরে এসেছে। আমি পিজি হাসপাতালে গেলাম। ভেতরে প্রবেশ করে যখন তাঁকে হাসপাতালের বেডে শায়িত অবস্থায় দেখলাম, তাঁর চেহারার দিকে তাকিয়ে নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নি। চোখের সামনে তখন একসঙ্গে ভেসে উঠছিল তিন দশক আগের দৃশ্যগুলো।
১৯৯৩ সালের সে কুয়াশা। শীতের সে রাত। নদীর অন্ধকার। পথ হারানো ট্রলার। মাঝনদীতে ডাকাতের আতঙ্ক। আর সে ভয়াবহতার মধ্যেও তাঁর স্থির ও সাহসী মুখ। আবার মনে পড়ছিল ১৯৯৪ সালের সে দিন। প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর কর্মসূচিতে আসার দৃঢ়তা। একজন মানুষকে আমরা অনেকভাবে স্মরণ করি- কেউ তাঁর বক্তব্যের জন্য, কেউ তাঁর রাজনৈতিক বা সামাজিক ভূমিকার জন্য, কেউ তাঁর ব্যক্তিত্বের জন্য। কিন্তু আমার কাছে সাঈদী সাহেবের স্মৃতির সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে আছে তাঁর জীবনের কিছু কঠিন মুহূর্তে দেখা সেই দৃঢ়তা।
দীর্ঘ সময় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার পর আমি ও হামিদুর রহমান আজাদ ভাই তাঁর লাশ গোসল করানোর ব্যবস্থা করি। এরপর বর্তমান এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, কামাল হোসেন, ঢাকা মহানগরী সেক্রেটারি রেজাউল করিমসহ নেতৃবৃন্দ সারারাত আমরা হাসপাতালেই ছিলাম। মনে হচ্ছিল, জীবনের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের শেষ প্রহরের সাক্ষী হয়ে আছি।
একসময় যাঁকে ঘন কুয়াশার রাতে নদীপথে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, তিন দশক পর তাঁর নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে-জীবন যে কত বিচিত্রভাবে মানুষকে স্মৃতির সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, সেদিন তা গভীরভাবে অনুভব করেছিলাম।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন ঢাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। পিজি হাসপাতালমুখী হতে থাকে মানুষের ঢল। পঙ্গপালের মতো চারদিক থেকে মানুষ ছুটে আসতে থাকেনÑ কেউ প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে, কেউ শোক জানাতে, কেউ আবার বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে তাঁর প্রিয় বক্তা আর নেই।
হাসপাতালের ডি-ব্লকের সামনে অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি হয় মানুষের বিশাল ভিড়। সেখানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।
সেদিন রাতের সেই দৃশ্য ছিল যেন এক অভাবনীয় আবেগের বিস্ফোরণ-কেউ কাঁদছিলেন, কেউ দোয়া করছিলেন, কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রিয় মানুষটির শেষ খবরের অপেক্ষায়। একজন মানুষের মৃত্যুর সংবাদ কীভাবে অগণিত মানুষের হৃদয়ে শোকের ঢেউ তুলতে পারে, ১৪ আগস্ট ২০২৩-এর সেই রাত তারই এক স্মরণীয় সাক্ষী হয়ে আছে।
ভোরের দিকে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আমাদের হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়। পরিস্থিতির মধ্যেই আমি একটি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করি। এরপর তাঁর মরদেহ পিরোজপুরের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। সে সময় ভারপ্রাপ্ত আমীর ছিলেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তাঁর সঙ্গে আমিও পিরোজপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হই। নানা প্রতিকূলতা ও পথ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অবশেষে আমরা গন্তব্যে পৌঁছাই। সেখানে তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাযা শেষ করেই আবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিই। সে যাত্রায় মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একজন পরিচিত মানুষকে বিদায় দিয়ে ফিরছি না; আমার জীবনের প্রায় তিন দশকের একটি অধ্যায়কে পেছনে ফেলে ফিরছি। মানুষ চলে যায়, স্মৃতি থেকে যায় মানুষের জীবন আসলে কিছু মুহূর্তের সমষ্টি। কেউ আমাদের জীবনে কয়েক বছর থাকে, কেউ কয়েক দশক। কেউ খুব কাছের মানুষ হয়, কেউ আবার ইতিহাসের কোনো একটি মুহূর্তের মাধ্যমে আমাদের স্মৃতিতে জায়গা করে নেয়। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের সঙ্গে সম্পর্কের মূল্য সময় দিয়ে মাপা যায় না। তাঁদের সঙ্গে কাটানো কয়েকটি মুহূর্তই হয়ে ওঠে জীবনের দীর্ঘতম স্মৃতি।
এই তিনটি সময় যেন আমার জীবনের তিনটি আলাদা অধ্যায়-কিন্তু অদৃশ্য এক সুতোয় বাঁধা। একদিকে ছিল যৌবনের সাহস ও কর্মব্যস্ততা। অন্যদিকে ছিল দায়িত্ব ও প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই। আর শেষে এসে দাঁড়িয়েছে মৃত্যু, বিচ্ছেদ ও স্মৃতির ভার। ইতিহাস শুধু বড় ঘটনার নাম নয় আমরা সাধারণত ইতিহাস বলতে যুদ্ধ, আন্দোলন, নির্বাচন, রাজনৈতিক পালাবদল কিংবা বড় বড় ঘটনার কথা বুঝি। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি দিক আছেÑ ব্যক্তির স্মৃতি। একটি কুয়াশাচ্ছন্ন রাতও ইতিহাসের অংশ হতে পারে। একটি নদীপথের বিপজ্জনক যাত্রাও ইতিহাসের অংশ হতে পারে। একটি মসজিদের ছোট্ট পরিসরে মানুষের ঢল নামাও ইতিহাসের অংশ হতে পারে। আর কোনো প্রিয় মানুষের নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে দাঁড়িয়ে থাকাও হতে পারে একটি ব্যক্তিগত ইতিহাস।
এই স্মৃতিগুলো হয়তো কোনো সরকারি নথিতে লেখা নেই। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে লেখা ইতিহাসের মূল্যও কম নয়। কারণ রাষ্ট্রের ইতিহাস যেমন দলিল দিয়ে সংরক্ষিত হয়, মানুষের ইতিহাস তেমনি সংরক্ষিত থাকে স্মৃতিতে।
শেষ কথা : আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়Ñ ১৯৯৩ সালের সে রাত, ১৯৯৪ সালের সে সাহসী দিন এবং ২০২৩ সালের সে শেষ রাতÑ আমার জীবনের তিনটি ভিন্ন সময়কে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে। সময় বদলেছে। পরিবেশ বদলেছে। মানুষের জীবন বদলেছে। প্রযুক্তি বদলেছে। কিন্তু স্মৃতি বদলায়নি।
আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই সে ঘন কুয়াশার রাত। দেখতে পাই মাঝনদীতে আতঙ্কিত মানুষদের মুখ। দেখতে পাই রাত চারটার অন্ধকারে সাঈদী সাহেবকে শান্তিবাগের বাসায় পৌঁছে দেওয়ার মুহূর্ত। আবার দেখতে পাই ১৯৯৪ সালের সে প্রতিকূল পরিবেশে তাঁর মাহফিলে আসার দৃঢ়তা।
আর সবশেষে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ২০২৩ সালের হাসপাতালের সে বেডÑ যেখানে জীবনের শেষ প্রান্তে শায়িত ছিলেন এক সময়ের পরিচিত সে মানুষটি। জীবন বড় অদ্ভুত। একদিন আমরা কাউকে নিরাপদে ঘরে পৌঁছে দিই, আর বহু বছর পর সে মানুষটির শেষ যাত্রার সাক্ষী হয়ে দাঁড়াই। এ দুই প্রান্তের মাঝখানে থাকে অসংখ্য স্মৃতি। সে স্মৃতিই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। মানুষ চলে যায়, সময় চলে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়Ñ কিন্তু কিছু মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মুহূর্তগুলো থেকে যায় আজীবন। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রহ.)-কে ঘিরে আমার জীবনের সে স্মৃতিগুলোও তেমনই।
এগুলো কেবল একজন মানুষকে ঘিরে স্মৃতিচারণ নয়; এগুলো আমার দেখা একটি সময়ের সাক্ষ্য, আমার জীবনের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের দলিল এবং এমন কিছু মুহূর্তের গল্পÑ যেগুলো সময় যতই পেছনে ফেলুক, হৃদয়ের পাতা থেকে কখনো মুছে ফেলতে পারবে না। স্মৃতির কাছে মানুষ পরাজিত হয় নাÑ বরং স্মৃতির মধ্যেই মানুষ নতুন করে বেঁচে থাকে।