হারুন ইবনে শাহাদাত

‘পিপীড়ার পাখা উঠে মরিবার তরে’-ইতিহাস তাই বলে। এ বাক্যে পিপীড়া একটি ‘প্রতীকী’ শব্দ। এখানে সীমা লঙ্ঘনকারীর পরিণতির কথাই বুঝানো হয়েছে। ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী এ পঙক্তিটি রচনা করেছেন মধ্যযুগে। কিন্তু এর বক্তব্য আজও প্রাসঙ্গিক। এ নিবন্ধ লেখার আগে চারদিক থেকে খবর আসছিলো- হঠাৎ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কিছু নেতা-কর্মীর পাখা গজিয়েছে। তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উড়তে শুরু করেছে।

ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবির এদেশেরই সন্তান। যারা দুইবছর আগের এই দিনে এক সাথে ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে। তারও আগে প্রায় দেড় দশক হাসিনার আওয়ামী ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের ফ্যাসিবাদী আচরণের কারণে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছাড়া ছিল ছাত্রদল এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ প্রায় সব ছাত্র সংগঠন। সেই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ভয়কে জয় করে প্রথম প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলো যারা। প্রথম সারিতে ছিল যারা তাদের অধিকাংশই ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মী। এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ ছাত্রদলের অধিকাংশ নেতা-কর্মীর অবস্থা ছিল ‘নিজে বাঁচলে বাবার নাম।’

৩৬ জুলাই বিপ্লবের নায়কদের নামের তালিকা করলে যাদের নাম প্রথমে আসে তারা ঐ দুই ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে কোন বিতর্ক নেই। প্রকৃত নায়করাও নিজেদেরকে এ বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে পছন্দ করেন।

আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের বিভিন্ন লেখা ও মন্তব্যে রাজধানীতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নেপথ্য নায়ক হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এবং যারা আজকে জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠন করেছে তাদের কথা এসেছে। ছাত্রশক্তি নাম তখন কেউ তেমন জানতো। কিন্তু ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তিই যে হাসিনাকে পালিয়ে যাওয়ার আন্দোলনের মূল শক্তি জুলকারনাইন সায়েরের এবং আরো অনেক অনুসন্ধানী সাংবাদিকই স্বীকার করেন। যেমন: জুলকারনাইন সায়ের লিখেছেন, ‘একটা বিষয় ক্লারিফাই করি, সালমান যদি তখন আমার সাথে শিবিরের বা অন্যকোন রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে যোগাযোগ করতো, তখন আমি কিছুতেই আমার বিশ্বস্ত বন্ধুদের কাছে তাদের পাঠাতাম না। এর মধ্যে জড়িতই হতাম না। কিন্তু সালমান আমার কাছে এসেছিলো সাধারণ একজন ছাত্র হিসেবে যে তার বন্ধুদের জন্যে নিরাপদ আবাস খুঁজছিলো। যেহেতু আন্দোলনটা তখন একপ্রকারের গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল, সে কারণেই আমি সালমান, কাদের ও অন্যান্যদের সহায়তা করি। সালমান তার রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে অপরাধ করেছে নাকি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে তা একমাত্র সাধারণ জনগণই বিচার করতে পারেন।’

এত কথা বলার কারণ পালিয়ে থাকা হাসিনা যেদিন ভারতের মাটিতে বসে হুংকার দিচ্ছে, সেদিন এবং সেই সময় ছাত্রদলের ব্যানারে যারা জুলাইযোদ্ধা, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা করছে; যেদিন জুলাইয়ের দুইবছর পূর্তি সেইদিনটিকে বেছে নিয়ে কেন শিক্ষাঙ্গন রক্তাক্ত করা হলো। আসলে তাদের মূল এজেন্ডা কী? কোন কোন পত্রিকায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব সন্ত্রাসীরা হামলার অগ্রভাগে থেকে হত্যার উদ্দেশ্যে অস্ত্রবাজি করছে, আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে তাদের দেখা গেছে ছাত্রলীগের ব্যানারের পিছনে। তাই বলতেই হচ্ছে, এই পিপীড়ারা আসলে নিজে মরিবার তরে নয়, ৩৬ জুলাই আন্দোলন এবং অসমাপ্ত বিপ্লবের সফল বাংলাদেশের সম্ভবনার মৃত্যুদূত। ওদের এখনই থামাতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, থামাবে কে? থামানোর দায়িত্ব যাদের তাদের অনেকেও তো, ‘সবার আগে দেশ’ ভুলে , ‘সবার আগে দল নিয়ে মেতে প্রথমে নিজে পরে দল এবং তারপর দেশ ধ্বংসের খেলায় মেতেছে।

অথচ জাতীয় নির্বাচনের সময় বিএনপি’র মাঠ কাঁপানো স্লোগান ছিল ‘সবার আগে দেশ’। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর নির্বাচনী ইশতেহার, সংবিধান, প্রচলিত আইন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ভুলে এক চলো নীতি-,সবার আগে বিএনপি গ্রহণ করে নতুন বিতর্ক এবং জনমনে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার আশংকা বাড়াচ্ছে সরকারি দলের নীতি নির্ধারণ থেকে নিয়ে তৃণ-মূলের নেতা-কর্মীরা। রাজনীতি বিশ্লেষক ও বিরোধী দলের নেতাদের অভিযোগ ৩৬ জুলাই চেতনার উল্টোপথে হাঁটছে সরকারি দল বিএনপি। প্রশাসনকে দলীয়করণ, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংকোচন, শরিক ও বিরোধী দলগুলোর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চরম ব্যর্থতা দেশের নতুন রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পুরোনো ফ্যাসিবাদী কায়দায় ‘একলা চলো’ নীতি গ্রহণ করে বিএনপি মূলত দেশের অর্জিত গণতন্ত্রকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। ইতোমধ্যেই তারা অনেকগুলো খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। তারমধ্যে আছে, প্রশাসনে দলীয়করণ। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিএনপি সরকারের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে নজিরবিহীন দলীয়করণ। সিভিল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সচিবালয় পদ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদে কেবল দলীয় অনুগতদের বসানো হচ্ছে। যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের কৌশলে ‘ওএসডি’ (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে রাখা হয়েছে অথবা গুরুত্বহীন পদে বদলি করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন ও অধিদপ্তরে দলীয় লোক নিয়োগ। নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তরের প্রধান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা পুরোপুরি ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও মেধাবীরা বঞ্চিত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য (ভিসি), উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে শিক্ষক রাজনীতির সংশ্লিষ্টতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ দলীয় শিক্ষকদের তৎপরতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবার সন্ত্রাসী মাস্তাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। ৩৬ জুলাই চেতনার অপমৃত্যু ঘটছে।

ক্ষমতাসীন দলের ব্যানারের অপব্যহার করে অছাত্ররা টেন্ডার বাণিজ্যের ধান্ধা করতে বিএনপি’র গায়ে ফ্যাসিস্ট লেবেল লাগানোর আয়োজনে ব্যস্ত। তারা হাসপাতলে চিকিৎসা নিতে যাওয়া আহত শিক্ষার্থী এবং কী রোগীদের স্বজন এবং দাঁড়ি টুপি পরা বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা করছে জামায়াত-শিবির ট্যাগ লাগিয়ে। এদিক বিবেচনা করলে তারা পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের চেয়ে কয়েক কাঠি এগিয়ে।

ইতোমধ্যেই বিরোধীদলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের করা প্রশ্ন জাতিকে ভাবিয়ে তুলেছে। তার প্রশ্ন, যে বিএনপি দলে শৃঙ্খলা ফিরাতে ব্যর্থ, তারা দেশ চালাবে কী ভাবে? এ প্রশ্ন আমাদেরও। আমরা যারা চাই দেশে গণতন্ত্র বিকশিত হোক। নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি সরকার পাঁচ বছর, পাড় করুক। জুলাই সনদের আলোকে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে নির্বাচনী অঙ্গীকার রক্ষা করুক। কারণ বারাবরের মতো ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, লুটপাট, অর্থপাচার, দখল বাণিজ্যকে রাজনীতির অনুষঙ্গ বানিয়ে শাসনের নামে শোষণ শুরু করলে, জনগণ আর তা মুখ বন্ধ করে সহ্য করবে না। তখন রাষ্ট্র ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু হবে, মানে সেই নতুন বোতলে পুরানো মদ, মানে ফ্যাসিবাদ। পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদী অপশক্তি বসে বসে তামাশা দেখবে না। তাদের আশ্রয়দাতা বন্ধু দেশের অর্থ, অস্ত্র, মাদক আর সামরিক শক্তির ব্যবহার করবে। দেশে আবার পিলখানা, শাপলার মতো বধ্যভূমি, ১/১১ মতো দুঃশাসন ফিরবে, আগের চেয়ে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে। অতএব সাবধান। ক্ষমতার পাখায় ভর করে উড়তে যেও না। উড়তে গেলে পিপীড়াদের পরিণতি হয় অগ্নিসমাধি, আশা করি তা ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।

ইমেইল: [email protected]