সাইফুল ইসলাম
যুদ্ধ ও সংঘাত শুরু হওয়ার আগে মানুষ একটি নাম, একটি পরিচয়, একটি পরিবার ও একটি স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু হঠাৎ যখন বারুদের গন্ধে আকাশ ভারী হয়ে ওঠে, তখন সে মানুষটির পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় তার বেঁচে থাকার সংগ্রাম। মানুষ হয়ে ওঠে তখন কেবলমাত্র একটি সংখ্যা। কতজন নিহত, কতজন আহত, কত ঘর ধ্বংস; পরিসংখ্যানের ভিড়ে হারিয়ে যায় একটি শিশুর কান্না, একটি মায়ের অপেক্ষা, একটি বাবার অসহায়ত্ব। অথচ প্রতিটি সংখ্যার পিছনে ছিল একটি পূর্ণ জীবন। এখানেই যুদ্ধের ভয়াবহ পরাজয়। বারুদের গন্ধে হারিয়ে যায় মানবতা।
ইসলাম মানুষের জীবনকে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে। একটি নিরপরাধ প্রাণের হত্যাকে কুরআন অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে তুলে ধরেছে। তাই যুদ্ধ হলেও মানবিকতার সীমারেখা অতিক্রম করার অনুমতি ইসলাম দেয় না। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা: আল-বাকারা, আয়াত: ১৯০) এ আয়াতের শিক্ষা যুদ্ধের উত্তাপেও আমাদের থামতে শেখায়। মনে রাখতে হবে, শত্রুতা ন্যায়বিচারকে গ্রাস করতে পারে না। প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার বৈধতা দিতে পারে না। শক্তিশালী হলেই দুর্বলকে ধ্বংস করার অধিকার জন্মায় না।
একজন মায়ের কাছে যুদ্ধের মানচিত্রের চেয়ে সন্তানের মুখ বড়। একজন বৃদ্ধের কাছে কোনো রাজনৈতিক বিজয়ের চেয়ে নিজের ঘরের দরজা বেশি মূল্যবান। যুদ্ধ যখন জীবন কেড়ে নেয়, তখন কোনো পক্ষের বিজয়ই সেই ক্ষতি পূরণ করতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধের ক্ষেত্রেও মানবিকতার সীমা রক্ষা করেছেন। বিভিন্ন সহিহ হাদিসে নারী ও শিশু হত্যার নিষেধাজ্ঞা এসেছে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু হলেই নৈতিকতার দরজা বন্ধ হয়ে যায় না; বরং কঠিন পরিস্থিতিতেই নৈতিকতার প্রশ্ন আরও বেড়ে যায়।
আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধের সঙ্গে আরেকটি যুদ্ধ চলছে; সে যুদ্ধ মানুষের বিবেকের বিরুদ্ধে। আমরা যখন নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুতে আনন্দিত হই, একটি শিশুর কান্নাকে কেবল অন্য পক্ষের ক্ষতি বলে দেখি, কিংবা প্রতিশোধের নামে সবকিছুকে বৈধ মনে করি, তখন বুঝতে হবে বারুদের আগুন কেবল জনপদে নয়, আমাদের বিবেকেও পৌঁছে গেছে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, ন্যায়বিচার নিজের পছন্দের মানুষের জন্য একরকম আর অপছন্দের মানুষের জন্য আরেক রকম হতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, “কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না করে।” (সূরা: আল-মায়িদা, আয়াত: ৮) এ শিক্ষা আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মানবতা মানে অন্যায়ের প্রতি নীরব থাকা নয় বরং অন্যায়ের প্রতিবাদ করেও নিরপরাধের জীবনকে মূল্য দেওয়া। নিপীড়িতের পাশে দাঁড়িয়েও প্রতিশোধের নামে সীমালঙ্ঘন না করা। ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও মানুষের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখা।
যুদ্ধের ভয়াবহতা তাই আমাদের সামনে শুধু রাজনৈতিক প্রশ্ন রাখে না; এটি আমাদের ঈমান, বিবেক ও চরিত্রেরও পরীক্ষা নেয়। আমরা কি দূরে বসে মানুষের মৃত্যু নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের হিসাব করব, নাকি একজন নিরপরাধ মানুষের জীবনকে সর্বাগ্রে মূল্য দেব? একজন মুমিনের হৃদয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর হবে, কিন্তু নিরপরাধের প্রতি কোমল থাকবে। সে নিপীড়নের প্রতিবাদ করবে, আবার প্রতিশোধের উন্মাদনায় নিজেই জালিম হয়ে উঠবে না। শান্তির অর্থ অন্যায় মেনে নেওয়া নয়। শান্তির অর্থ হলো এমন ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মানুষ নিরাপদে বাঁচতে পারে, শিশু ভয় ছাড়া ঘুমাতে পারে, মায়ের মনে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্ক থাকে না এবং মানুষের পরিচয় তার ধর্ম, জাতি বা ভূখন্ডের কারণে জীবন-মৃত্যুর মানদন্ডে পরিণত না হয়। ইসলাম এমন মানবিক সমাজের দিকেই আহবান জানায়।
আমাদেরও দায়িত্ব আছে। যুদ্ধ-সংঘাতের খবর শুনে গুজব না ছড়ানো, ঘৃণা উসকে না দেওয়া, নিরপরাধের দুর্ভোগকে উপহাস না করা। বরং সত্য জানা, অসহায়ের জন্য দোয়া করা, সামর্থ্য অনুযায়ী মানবিক সহায়তা করা এবং নিজের ভাষা ও আচরণে ন্যায় বজায় রাখা। কারণ যুদ্ধের সময় মানুষ কেবল অস্ত্র দিয়েই আহত হয় না; মুখের ভাষাতেও আহত হয়। যুদ্ধ একদিন থামবে। বারুদের বিষাক্ত ধোঁয়া সরে যাবে, ধ্বংসস্তূপের ওপর আবার ঘর উঠবে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা ঘৃণা যদি থেকে যায়, তাহলে যুদ্ধের ক্ষত প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বয়ে যাবে।
তাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু যুদ্ধ-সংঘাত থামানো নয়; বরং মানবতাকেও বাঁচানো। কারণ যুদ্ধ-সংঘাতের ময়দানে জয়ী হওয়া সহজ; কিন্তু নিজের ক্রোধ, প্রতিহিংসা ও ঘৃণাকে জয় করে মানুষ হয়ে থাকা অনেক কঠিন। তাই বারুদের গন্ধে হারিয়ে যাওয়া মানবতাকে উদ্ধার করতে পারলেই হয়তো একদিন পৃথিবী বুঝবে- সবচেয়ে বড় বিজয় কোনো ভুখন্ডের নয়, সবচেয়ে বড় বিজয় হলো মানুষের।
লেখক : শিক্ষক, যশোর ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ যশোর সেনানিবাস, যশোর।