সম্প্রতি সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি (Mecca Joint Defense Agreement) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ চুক্তিতে বাংলাদেশ অংশ নেবে কি না তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে বিস্তর আলোচনা চলছে। কিন্তু আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারত বিষয়টি নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে যাচ্ছে। মূলত, দেশটি সে চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে ভূ-কৌশলগত ও নিরাপত্তা কারণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটি মনে করছে বাংলাদেশ এ জোটে যুক্ত হলে ভারতের পূর্ব সীমান্তে চিরশত্রু পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ একটি কৌশলগত ও সামরিক কাঠামোর উপস্থিতি তৈরি হবে। ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো সামরিক সংঘাত বাঁধলে, পাকিস্তান তার কৌশলগত সুবিধার্থে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে পারে। পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান, ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এবং তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরবের এ যৌথ সামরিক জোটকে এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারতের জন্য একটি নতুন ও জটিল সামরিক সমীকরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, এ চুক্তির গতিপ্রকৃতি তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তায় আঘাত আসতে পারে এমন যেকোনো পদক্ষেপে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। যা বাংলাদেশের জন্য প্রকাশ্য হুমকি এবং সার্বভৌমত্বের মারাত্মক লঙ্ঘন। মূলত, সৌদি তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঢাকা ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং এতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশ এখনো এ চুক্তিতে যোগ দেয়নি। তবে ঢাকার ইতিবাচক মনোভাবের খবর প্রকাশের পর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ভারতের কাছে। কারণ, সম্ভাব্য এ জোটে রয়েছে পাকিস্তান এবং তুরস্ক যারা ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বা মক্কা ডিফেন্স প্যাক্ট স্বাক্ষরিত হয় গত ৭ আগস্ট। পবিত্র নগরী মক্কায় চুক্তিতে সই করে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। চুক্তির মূল লক্ষ্য পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং যৌথ নিরাপত্তা জোরদার করা। তবে মক্কা চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিন সদস্যের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সূত্রমতে, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। একই সঙ্গে এটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের অধীনে ব্যক্তিগত ও যৌথ আত্মরক্ষার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে ইসলামাবাদ। সঙ্গত কারণেই মক্কা চুক্তিকে অনেকেই ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা ধারণার সঙ্গে তুলনা করছেন। তবে এটি এখনো ন্যাটোর মতো সমন্বিত সামরিক কাঠামো নয়। এর স্থায়ী কমান্ড কাঠামো বা ন্যাটোর মতো বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে এমন তথ্যও নেই। মূলত, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা প্রথম স্পষ্টভাবে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। গত ২৪ আগস্ট তিনি সাংবাদিকদের জানান, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে তাতে বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়।
মক্কা চুক্তি ভারতকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে বলেই মনে হচ্ছে। আর ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে পাকিস্তান। কারণ, বাংলাদেশ যদি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক পর্যায়ে থাকবে না; তা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে। দিল্লির জন্য এটিই উদ্বেগের কারণ। কারণ পাকিস্তানকে ভারত তার প্রধান নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি হিসেবে দেখে। ফলে ভারতের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত হিসাব বদলে যেতে পারে। যা ভারতের জন্য খুবই একটা ইতিবাচক হবে না।
এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তুরস্কের রয়েছে বড় সামরিক সক্ষমতা ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প। পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি শক্তি। এ তিন দেশের সমন্বিত নিরাপত্তা সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হলে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়তে পারে। ভারত মনে করছে, বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানের অংশীদারিত্বে গঠিত কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়, তবে ভারতের পূর্ব সীমান্তে ইসলামাবাদের সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। এতে তাদের তিন দিকের সীমান্তেই প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো সামরিক সংঘাত সৃষ্টি হলে এ চুক্তি বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মক্কা চুক্তির যৌথ প্রতিরক্ষা শর্তের কারণে পাকিস্তান তখন কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করার সুযোগ পাবে। এটি ভারতের নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে দেখা দেবে। মক্কা চুক্তির আলোচনা এমন সময় সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। বিশেষ করে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধের বিষয়টি দু’দেশের সম্পর্কে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করেছে। এছাড়া সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও ঢাকার সঙ্গে দিল্লির মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের নতুন কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যাওয়ার সম্ভাবনাকে ভারত স্বাভাবিকভাবেই আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশ যোগদানের প্রশ্নে ভারত অনেকটা অস্বস্তিতে ভুগছে বলেই মনে হচ্ছে। তবে এ চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না, সে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তবে ঢাকার ইতিবাচক মনোভাব স্পষ্ট হওয়ায় বিষয়টি এরই মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতের মাথাব্যথার মূল কারণ তাই শুধু সৌদি আরব বা তুরস্ক নয়। মূল প্রশ্ন পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য নতুন নিরাপত্তা-সম্পর্ক। বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও বড়। মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে ঢাকা কি নতুন কৌশলগত অংশীদার পাবে, নাকি এতদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হবে?
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কূটনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। চুক্তিটির মূলনীতি হলো সদস্য কোনো একটি রাষ্ট্র সশস্ত্র আক্রমণের শিকার হলে সেটিকে সব সদস্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদের সঙ্গে এর ধারণাগত মিল থাকলেও চুক্তির সামরিক কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, সদস্যদের বাধ্যবাধকতা এবং সম্ভাব্য নতুন সদস্য গ্রহণের শর্ত এখনো পুরোপুরি জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশ এখনো এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির শুধু বলেছেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যের বাস্তবতা বিবেচনা করে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত কোনো অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে ঢাকা ইতিবাচকভাবে দেখছে। অর্থাৎ এটি এখনো একটি সম্ভাবনা ও নীতিগত আগ্রহের পর্যায়ে রয়েছে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
এমন প্রেক্ষাপটে ভারত যদি বাংলাদেশকে প্রকাশ্যে সতর্ক করে থাকে যে মক্কা চুক্তিতে যোগদান ‘বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক’ হবে, তবে তা অবশ্যই আপত্তিকর ও উদ্বেগজনক; আধিপত্যবাদী মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। কারণ স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ কোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গড়ে তুলবে—সেটি বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র এ সিদ্ধান্তের ওপর ভেটো দিতে পারে না বা হুমকির ভাষায় তা প্রভাবিত করার অধিকার রাখে না। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত সতর্কতা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও প্রকাশ্য সরকারি বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরের মুখে ‘মক্কা চুক্তিতে যোগদান বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক হবে’ এমন সুনির্দিষ্ট বক্তব্যের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় মূলত বলা হয়েছে যে তারা বাংলাদেশের আগ্রহ-সংক্রান্ত পরিস্থিতি ‘ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ’ করছে। জয়শংকর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ‘পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায়’ উত্তীর্ণ হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন, কিন্তু সেটিকে সরাসরি মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের প্রতি হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হলে বক্তব্যটির যথার্থতা যাচাই করা জরুরি।
তারপরও ‘ভারত পরিস্থিতি নজরে রাখছে’ এ ভাষাটিও বাংলাদেশের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ কোনো অধীন রাষ্ট্র নয় যে তার প্রতিটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত ভারত পর্যবেক্ষণ করবে এবং অনুমোদন বা আপত্তি জানাবে। ভারত তার নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনা করতেই পারে—যেমন বাংলাদেশও ভারত-ইসরাইল, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রভাব মূল্যায়ন করতে পারে। কিন্তু পর্যালোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ এক বিষয়; আর বাংলাদেশকে সতর্ক করা, চাপ দেয়া বা পরিণতির ভয় দেখানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ভারতের উদ্বেগের একটি প্রধান কারণ হতে পারে মক্কা চুক্তিতে পাকিস্তানের উপস্থিতি। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা, কাশ্মীর বিরোধ, একাধিক যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার কারণে পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত যেকোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোকে নয়াদিল্লি সন্দেহের চোখে দেখবে। বাংলাদেশ সেখানে যুক্ত হলে ভারত সেটিকে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে পরিবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু ভারতের পাকিস্তাননীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করতে পারে না। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বিরোধ আছে বলে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক বা প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রাখবে না এমন দাবি মোটেই বাস্তব ও যুক্তি সঙ্গত নয়। বাংলাদেশ যদি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয় তাহলে এজন্য ভারতীয় আধিপত্যবাদই দায়ি এতে কোন সন্দেহ নেই।
একথা ভারতকে অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, ভারত যখন কোন রাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপন করে তখন কী দেশটি বাংলাদেশ বা মুসলিম উম্মাহর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে? দেশটি যখন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইসরাইলের সঙ্গে ব্যাপক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করে, উন্নত অস্ত্র সংগ্রহ করে এবং বিভিন্ন সামরিক জোট ও কৌশলগত কাঠামোয় অংশগ্রহণ করে, তখন কি বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করা হয়? ভারত কোয়াডে অংশ নিতে পারে, ইসরাইলের সঙ্গে গোয়েন্দা ও সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে কিংবা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে পারে কিন্তু বাংলাদেশ কেন জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী অংশীদার নির্বাচন করতে পারবে না? সার্বভৌম সমতার নীতি দু’দেশের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। তাই মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ অংশ গ্রহণ করবে কি না এ বিষয়ে ভারতের কিছু বলার অধিকার নেই। এ বিষয়ে ভারত যত নাক গলানোর চেষ্টা করবে ততই বাংলাদেশের জন্য মক্কা চুক্তিতে যোগদানের যৌক্তিকতা সৃষ্টি হবে।
কারণ, এ ধরনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিকল্পও সম্প্রসারিত করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ওপর ভারতের মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব রয়েছে এমন অভিযোগ জনমনে প্রবল। তাই মক্কা প্যাক্টে যোগদান বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে এবং কোনো একটি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এ নীতির অর্থ কোনো একটি শক্তির প্রভাববলয়ে বন্দি থাকা নয়; বরং একাধিক অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। ভারতের আপত্তি আরো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে, যখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অতীত অভিজ্ঞতার দিকে তাকানো হয়। সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির দীর্ঘসূত্রতা, বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক শক্তিকে দীর্ঘকাল সমর্থন-এসব কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারতের প্রতি গভীর অনাস্থা ও অশ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে। ভারত যদি সে আস্থা পুনরুদ্ধার না করে উল্টো বাংলাদেশের নতুন অংশীদার নির্বাচনের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করতে চায়, তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বাংলাদেশকে বিকল্প ভাবার অবকাশ সৃষ্টি হবে।
আমাদের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সার্বভৌম সমতা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করার কথা বলা হয়েছে। তাই প্রতিরক্ষামূলক জোটে অংশগ্রহণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ নীতির পরিপন্থী নয়। কিন্তু এমন কোনো ধারা গ্রহণ করা যাবে না, যা বাংলাদেশের জনগণ, সরকার ও জাতীয় সংসদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত ছাড়াই দেশকে অন্য রাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ, সংসদে আলোচনা, সামরিক ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব পর্যালোচনা করা আবশ্যক। তাই কোন চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বাংলাদেশকে অবশ্যই এর অগ্রপশ্চাতৎ ভাবতে হবে। তা হবে স্বাধীনভাবেই। ভিন্ন কোন রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনায় নয়। এটিই প্রকৃত বাস্তবতা।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশকে একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার পশ্চিমা বিশ্বে; চীন বৃহৎ বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন অংশীদার; মধ্যপ্রাচ্য রেমিট্যান্স এবং জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস; আর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত, নদী, যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগদানের ফলে এসব সম্পর্ক, রপ্তানি, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা কিংবা প্রবাসী শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না, তা হিসাব করতে হবে। ঢাকা বলতে পারে ভারতের নিরাপত্তা-উদ্বেগ শুনতে বাংলাদেশ প্রস্তুত, কিন্তু নিজের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতি নির্ধারণের সার্বভৌম অধিকার নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে শুধু বাংলাদেশের জনগণ, সংবিধান, জাতীয় নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে। কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের চাপ, হুমকি বা অনুমোদন সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে না।
ভারতকে অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে, বাংলাদেশের সঙ্গে টেকসই বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠার পথ হলো সম্মান ও সমতা চাপ ও অভিভাবকসুলভ আচরণ নয়। বাংলাদেশও যেন নিজের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বাস্তববাদী, বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করে। ভারতের উদ্বেগের কারণে মক্কা চুক্তি প্রত্যাখ্যান করা বাংলাদেশে জন্য অবশ্যই আত্মমর্যাদাহীনতা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি অবশ্যই বাংলাদেশের। এ বিষয়ে ভারতের নাক গলানোর কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশ কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, কোন প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হবে এবং কীভাবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে তার নির্ধারক হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নয়; হতে পারে না।
ভারতকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ। তাই নিজেদের নিয়ে স্বাধীনভাবে ভাবার অধিকার রয়েছে। ভারতের স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করার আগে বাংলাদেশকে নিজেদের স্বার্থকেই অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। মূলত, ভারত মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান নিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যেসব প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে তা কোনোভাবেই সৎপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বসুলভ আচরণ নয় বরং প্রভুসুলভ। তাই ভারতকে সে অশুভবৃত্ত থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।
www.syedmasud.com