মোঃ নূরুজ্জামান

শিরোনামবিহীন সিলেটের প্রাণকেন্দ্র অর্থাৎ সংগ্রামী সুফিসাধক শাহজালাল (র:)-এর দরগাহ লাগোয়া, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম দিগন্তে, শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের পশ্চিম প্রান্তঘেঁষা সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালাধীন প্রায় শতবর্ষী আসাম-প্যাটার্নের আবু সিনা ছাত্রাবাসটির বুকে এখন ‘২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সিলেট জেলা হাসপাতাল’ নাম ধারণ করে পনের তলা বিশিষ্ট নান্দনিক ও অত্যাধুনিক চিকিৎসা স্থাপত্যকলা ভবনরূপে বৃহত্তর সিলেটের প্রায় ২০.০০ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা বিলাতে প্রায় প্রস্তুত। প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য সুরম্য আকাশচুম্বি ভবনটি কয়েক বছর থেকে অনাদর-অবহেলায় শতকোটি টন সিমেন্ট, পাথর, রডের ধলা বুকচাপা দিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে।

চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তি মানব সন্তানের মৌলিক অধিকারের একটি। চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবার বৃহত্তর স্বার্থে পরিবেশবিদ ও নাগরিক সমাজের মৃদু আপত্তি থাকা সত্ত্বেও নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর ঐতিহ্যবাহী আবু সিনা ছাত্রাবাস ২০২০-২১ সালে ভেঙে নগরীর চৌহাট্টা এলাকায় প্রায় ৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫ তলাবিশিষ্ট এই আধুনিক হাসপাতাল ভবনটি নির্মাণ করা হয়। ২০২৬ সালের জুন মাসে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। এটি একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি তদারকিতে পরিচালিত হতে যাচ্ছে।

সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি অধ্যাপক ডা. মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরী। তিনি একজন উদ্যোগী, উদ্যমী, এবল, ক্যাপাবল, সাহসী, স্বপ্নচারী সফস্টিকেটেড ভিশন এবং মিশনারী ব্যক্তিত্ব । যিনি একাধারে সিলেটের মাটি ও মানুষের মাঝে বেড়ে ওঠা অত্যন্ত সুপরিচিত, সুদর্শন, সুবাচনের অধিকারী ও বিশিষ্ট শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসাবিদ, উদ্যোক্তা, এডমিনিস্ট্রেটর,​ সাবেক অধ্যক্ষ এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ এবং একি মেডিকেল কলেজের শিশুবিভাগের ​বিভাগীয় প্রধান।

ফ্যাসিবাদের মদদে বুকে পাথর চাপাদিয়ে অপলকে দেখতে হয়েছে, তার নিজ ছাত্র কিভাবে একজন শিক্ষকের সিনিয়র হয়ে যান। এমনই একজন বঞ্চনার প্রত্যক্ষ শিকার ফ্যাসিবাদ পতনের পর লাইম লাইটে আসা প্রফেসর ডা. জিয়াউর রহমান চৌধুরী। রাইট প্লেসে রাইট পার্সন এর সাথে আমার দেখা হয়, কথা হয় বৃহত্তর সিলেটের চিকিৎসা সেবাকে সহজলভ্য ও আমজনতার দোরগোড়ায় পৌঁছানো নিয়ে, তার আগামীর স্বপ্ন ও পথচলার পথনকশা নিয়ে।

এই হাসপাতালে, বিশেষায়িত আউটডোরে স্পেশালিস্ট ডাক্তারের সাথে মেডিকেল অফিসার থাকবেন এবং অ্যাপ বেইজড রোগী রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে যথাসময়ে রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে।

সিলেট বিভাগের উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি করে একেক উপজেলায় নির্ধারিত দিনে সিলেট জেলা হাসপাতাল থেকে টেলি বা ভিডিও মেডিসিন বা ট্রিটমেন্ট চালু করে রোগীদের বিড়ম্বনা এবং ব্যয় সংকোচন করা হবে।

নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য স্পেশাল ইনফার্টিলি কেয়ার ইউনিট স্থাপন করা হবে।

হাসপাতালের ৮ম তলায় ১৫০ জন একমেডেশনের আধুনিক কনফারেন্স রুম কাম ওয়েল ইক্যুইপ্ট সাইন্টিফিক সেমিনার সেন্টার, ই-লাইব্রেরি কাম স্পেশালাইজ ক্লাস রুম, হাওর, বাঁওড়, চা বাগান, নৃগোষ্ঠী, সুবিধাবঞ্চিত প্রভৃতি প্রান্তিকজনপদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বিভাগীয় গবেষণাগার হিসাবে কাজ করবে সিলেট জেলা হাসপাতাল।

চমৎকার নির্মাণশৈলীর এ হাসপাতালের ফ্লোর ও সেবাভিত্তিক বিন্যাস ১৫ তলা ভবনের মধ্যে প্রথম ৮টি তলার অভ্যন্তরীণ কাজ ও অবকাঠামো সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। ফ্লোর অনুযায়ী সেবাসমূহ হয়েছে সাজানো :

বেজমেন্ট: গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা।

১ম তলা: টিকিট কাউন্টার এবং দর্শনার্থীদের জন্য অপেক্ষা ও বিশ্রামাগার।

২য় তলা: বহির্বিভাগ (আউটডোর), রিপোর্ট ডেলিভারি কাউন্টার এবং কনসালটেন্ট চেম্বার।

৩য় তলা: সম্পূর্ণ ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি বিভাগ।

৪র্থ তলা: কার্ডিয়াক এবং জেনারেল অপারেশন থিয়েটার (OT), আইসিসিইউ (ICCU) এবং সিসিইউ (CCU)।

৫ম তলা: গাইনি, চক্ষু, অর্থোপেডিকস এবং ইএনটি (নাক-কান-গলা) বিভাগ।

৬ষ্ঠ থেকে ৮ম তলা: সাধারণ ওয়ার্ড এবং রোগীদের জন্য কেবিন। শয্যা ও বিশেষায়িত সুবিধা, আইসিইউ (ICCU) শয্যা-১৯, সিসিইউ (CCU) শয্যা-৯টি, কেবিন-৪০টি।

তাছাড়াও সিলেট বিভাগে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী ও সেবাগ্রহীতার মাঝে আন্তরিকতা, সেবামানসিকতা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেট প্রথা তিরোহিত করে চিকিৎসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সকল মহল বিশেষ করে বুদ্ধিবৃত্তিক সুধীজনের পরামর্শ ও সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি এও জানেন, এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা বাধাবিপত্তি মাথা উঁচু করে এসে সামনে দাঁড়াবে। সকল স্ট্যাক হোল্ডার, সরকার, সুধীজনের শুভকামনা, সহযোগিতা, দোয়াকে পাথেয় করে তিনি এগিয়ে যেতে চান।

সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত ভিসি অধ্যাপক ডা. মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরীর সকল মহতী উদ্যোগের সফলতার প্রত্যাশী।

লেখক : সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, ইসলামী ব্যাংক সিলেট শাখা ও প্রাবন্ধিক।