খুলনা ব্যুরো

সবুজ শ্যামল বাংলার মেঠোপথ ধরে চারজন বেহারার কাঁধে দুলতে দুলতে এগিয়ে চলা লাল শালুতে মোড়ানো পালকি-এ দৃশ্য যেন আমাদের লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত ক্যানভাস। একসময় গ্রামবাংলার বিয়ের আনন্দ মানেই ছিল পালকির উপস্থিতি, যার ছন্দময় দোলা আর বেহারার গীতের সুর পুরো গ্রামকে মাতিয়ে রাখত। নববধূকে বরণ করে নেওয়ার এই ঐতিহ্যবাহী বাহন কেবল যাতায়াতের মাধ্যম ছিল না, বরং এটি ছিল গ্রামীণ আবেগ, কৌতুহল ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সময়ের নির্মম পরিবর্তনে আধুনিক যানবাহনের ভিড়ে আজ সেই পালকি হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটি রূপকথার গল্পের মতো হলেও, প্রবীণদের স্মৃতিতে এবং বাংলার লোকজ ইতিহাসে পালকি আজও এক অমলিন ভালোবাসার নাম।

পালকির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উৎপত্তির শেকড়

পালকি কেবল বাঙালি সংস্কৃতির অংশ নয়, এর ইতিহাস বেশ প্রাচীন ও বর্ণাঢ্য। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে পালকি বা 'পালঙ্ক' ব্যবহৃত হয়ে আসছে যাতায়াত ও পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে। রাজা-বাদশাহ, জমিদার, অভিজাত ব্যক্তি এবং রাজপরিবারের নারীরা দূরে যাতায়াতের জন্য পালকি ব্যবহার করতেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে যায়, বিশেষ করে অভিজাত ও মধ্যবিত্ত পরিবারে বিয়েশাদীর মতো সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবে এর ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

বাংলার লোকসাহিত্যে, মঙ্গলকাব্যে এবং মধ্যযুগের নানা সাহিত্যে পালকির উল্লেখ পাওয়া যায়। পালকি তৈরির কারিগর বা শিল্পীরা কাঠ খোদাই করে এবং নানা রজন ও রঙের আল্পনায় সেটিকে রূপ দিতেন শিল্পের এক অনন্য নিদর্শনে। পালকির ছাদ, খুঁটি এবং বসার জায়গার কারুকাজ দেখে বোঝা যেত বাহনটির মালিকের সামাজিক মর্যাদা কেমন ছিল। সময়ের বিবর্তনে জমিদার প্রথা বিলুপ্ত হলেও বিয়ের অনুষ্ঠানে পালকির আবেদন বহু দিন ধরে টিকে ছিল।

গ্রামবাংলার বিয়েতে পালকির রূপ ও আবহ

আশি ও নব্বইয়ের দশকের গ্রামবাংলার স্মৃতি রোমন্থন করলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। বিয়ের নির্দিষ্ট দিনে বরযাত্রী আসার পর অথবা কনে বিদায়ের সময় কনের বাড়ির উঠানে সাজানো হতো পালকি। লাল, হলুদ কিংবা সবুজ রঙের কাপড়ের ছাউনি, ফুল এবং জরি দিয়ে পালকিকে সাজানো হতো অত্যন্ত যতেœ। কনে যখন পালকিতে উঠতেন, তখন চারপাশের বাতাসে এক অদ্ভুত বিষাদের সুর বেজে উঠত। মা-বাবা, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনের কান্নার রোল আর প্রতিবেশীদের ভিড়ে সেই পরিবেশ হয়ে উঠত ভারাক্রান্ত। পালকির দরজা বা পর্দা নামিয়ে দেওয়ার পর শুরু হতো বেহারার যাত্রা। চারজন বেহারা তাদের কাঁধে ভারী পালকি তুলে সমস্বরে এক ধরনের সুর বা গান ধরে পথ চলতেনÑ"হেইয়ো হো, হেইয়ো হো..."। তাদের এই ছন্দময় পদচারণার সঙ্গে পালকিও এক অপূর্ব ছন্দে দুলতে থাকত। গ্রামের মেঠোপথ পেরিয়ে যখন পালকি বরের বাড়ির দিকে যেত, তখন রাস্তার দুই পাশের মানুষ কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে থাকত নতুন বউকে এক নজর দেখার জন্য।

বেহারা সম্প্রদায়ের জীবন ও লোকজ সংস্কৃতি

পালকির ইতিহাস এবং এর টিকে থাকা ও না থাকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে একটি নির্দিষ্ট পরিশ্রমী জনগোষ্টিÑবেহারা বা কাহার সম্প্রদায়। বংশপরম্পরায় তারা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পালকি বহন করা কেবল তাদের জীবিকা ছিল না, এটি ছিল তাদের পেশাগত সংস্কৃতির অংশ।

কাহার সম্প্রদায়ের পুরুষেরা অত্যন্ত সুঠাম দেহের অধিকারী হতেন। দীর্ঘ পথ দুর্গম মেঠোপথ বা কাঁচা রাস্তায় ভারী পালকি কাঁধে নিয়ে তারা অবলীলায় হেঁটে যেতেন মাইল পর মাইল। তাদের এই কায়িক শ্রমের বিনিময়ে পরিবারে আসত অন্নসংস্থান। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া এবং পালকির প্রচলন উঠে যাওয়ায় এই সম্প্রদায়ের মানুষগুলো আজ পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ রিকশা চালান, কেউ কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন, আবার কেউ দিনমজুর হিসেবে জীবন কাটাচ্ছেন। পালকি হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে গ্রামীণ লোক সংস্কৃতির এই অতি পরিচিত ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষগুলোর গল্প।

আধুনিকতার ছোঁয়া এবং পালকির বিলুপ্তি

পরিবর্তন প্রকৃতির নিয়ম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপেও এসেছে বিরাট পরিবর্তন। এককালের ধূলিধূসর মেঠোপথ আজ পাকা সড়কে রূপান্তরিত হয়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থার অবিশ্বাস্য উন্নতির ফলে মানুষের হাতে এসেছে রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, নছিমন-করিমণ এবং মাইক্রোবাসের মতো আধুনিক যানবাহন। বিয়েতে যাতায়াতের খরচ ও সময় বাঁচাতে মানুষ এখন আর পালকি বা বেহারা খোঁজার ঝামেলায় যেতে চায় না। যেখানে একসময় দুই দিন সময় লেগে যেত পালকিতে করে বর-কনে আনা-নেয়া করতে, সেখানে আধুনিক গাড়িতে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় সেই দূরত্ব পার হয়ে যায়। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধার আধিক্যে পালকি আজ অপ্রয়োজনীয় এক বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে যেতে পালকি স্থান পেয়েছে কেবল জাদুঘরের কাঁচের বাক্সে কিংবা স্মৃতির অ্যালবামে।

বর্তমান প্রজন্ম ও পালকির দূরত্ব

আজকের প্রজন্মের কাছে 'পালকি' শব্দটির অর্থ অনেকটাই অপরিচিত। শহরের যান্ত্রিক কোলাহলে বেড়ে ওঠা শিশুরা পালকিকে কেবল বইয়ের পাতার ছবি বা টেলিভিশনের পর্দায় দেখে অভ্যস্ত। গ্রামের তরুণ সমাজও এর ঐতিহাসিক ও নান্দনিক গুরুত্ব সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহাল নয়। ফলে লোকসংস্কৃতির একটি সুদীর্ঘ অধ্যায় আজ নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যে পালকি একসময় একটি পরিবারের আনন্দ, বেদনা, আশা ও নিরাশার প্রতীক ছিল, তা আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী। ঐতিহ্যের এই ব্যবধান দূর করতে না পারলে আমাদের শেকড়সন্ধি মানসিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ একটি জাতির পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার ইতিহাসের প্রতিটি উপাদানে।

প্রবীণদের স্মৃতিচারণ ও নস্টালজিয়া

গ্রামের প্রবীণ মানুষদের সঙ্গে কথা বললে এখনো চোখে পড়ে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়ার আলো। তাদের শৈশব ও কৈশোরের সোনালী দিনে পালকি ছিল গ্রামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণের বস্তু। বিয়ের মৌসুমে পালকি আসার খবর শুনলে গ্রামের ছোট-বড় সবাই মিলে ছুটে যেত দেখতে। প্রবীণরা জানান, তখনকার দিনে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি নিবিড়। একটি বিয়েকে কেন্দ্র করে পুরো গ্রাম একত্রিত হতো, আর পালকি ছিল সেই মিলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। আজকের যান্ত্রিক যুগে সেই সামাজিক উষ্ণতা ও সম্মিলিত আনন্দ আর আগের মতো দেখা যায় না। মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, বিয়েগুলোও হয়ে উঠেছে যান্ত্রিক ও আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ। প্রবীণদের দীর্ঘশ্বাস এবং স্মৃতির রোমন্থনে বারবার ভেসে ওঠে সেই দিনগুলোর কথা, যা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।

ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ও করণীয়

পালকি হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল একটি কাঠের তৈরি বাহনের বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে গেছে আমাদের গ্রামীণ লোকশিল্প, কারুশিল্প এবং এক অপূর্ব সামাজিক ঐতিহ্য। তাই ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে পালকির স্মৃতি সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন লোকশিল্প জাদুঘরে পালকি সংরক্ষণ এবং এর সঠিক ইতিহাস প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। গ্রামীণ মেলা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব এবং দিবসে পালকি প্রদর্শনী বা এর রেপ্লিকা রেখে নতুন প্রজন্মকে এর সঙ্গে পরিচিত করা সম্ভব। এছাড়া সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রে পালকির শৈল্পিক ব্যবহার ফুটিয়ে তুলে তরুণ সমাজের মাঝে ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা যেতে পারে।

সময়ের স্রোত অপ্রতিরোধ্য। স্রোতের টানে কত শত আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি আর বাহন হারিয়ে গেছে অতল গহ্বরে। সেই স্রোতেই হারিয়ে গেছে গ্রামবাংলার মেঠোপথের পালকি। আজ পাকা সড়কে মোটরগাড়ির হর্ন আর ঝাঁ চকচকে মাইক্রোবাসের ভিড়ে পালকি হয়তো আর দেখা মিলবে না। কিন্তু মানুষের মন থেকে, লোকসংহিতায় এবং লোকসাহিত্যের পঙ্ক্তমালায় পালকির সেই ছন্দময় দোলন কোনোদিন মুছে যাবে না। কালের সাক্ষী হয়ে পালকি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শেকড়, আমাদের সংস্কৃতি এবং ফেলে আসা সেই সোনালী অতীতকে।