থামছে না দালালদের দৌরাত্ম্য

কবির আহমদ, সিলেট ব্যুরো

সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা অতি সাধারণ ও নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজন সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাচ্ছেন না। প্রতিদিনই রোগীদের দুর্ভোগ-দুর্যোগ বেড়েই চলেছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাকঢোল পিটিয়ে সিলেট এম.এ.জি ওসমানী হাসপাতাল পরিদর্শন করতে আসেন। মন্ত্রী’র পরিদর্শনের খবর পেয়ে নতুন সাজে সেজেছিল এই হাসপাতাল। টয়লেট, ড্রেইন, কেবিন, ওয়ার্ডের সাজ সাজ অবস্থা বিরাজ করছিল। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স, ব্রাদার, ওয়ার্ড বয়, আয়া এমনকি ক্লিনারদেরও কথার মধ্যে মায়াবী চিত্র ফুটে ওঠে। কিন্তু মন্ত্রী পরিদর্শন করে যাওয়ার প্রায় ৮ দিন অতিবাহিত হয়েছে মাত্র। কিন্তু ওসমানী হাসপাতাল আগের চেহারায় ফিরে এসেছে, থামছে না দালালদের দৌরাত্ম্য।

সিলেট অঞ্চলের অবহেলিত ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র প্রধান ভরসাস্থল সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ৯০০ শয্যার এই বৃহৎ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজারেরও বেশি অসহায় ও মুমূর্ষূ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন।

তবে বিপুল এই রোগী ও তাদের স্বজনদের সরলতার সুযোগ নিয়ে হাসপাতাল কম্পাউন্ড জুড়ে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। ক্লিনিক ও ফার্মেসির দালাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যস্বত্বভোগী এবং বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা এখন চরমভাবে ব্যাহত ও প্রশ্নবিদ্ধ।

সরেজমিন এবং বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ওসমানী হাসপাতাল ঘিরে সক্রিয় এই সকল সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহলের হাতে। মূলত তাদেরই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রছায়ায় বহিরাগত দালাল ও বিভিন্ন চক্র দিন দিন আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব অনিয়ম চললেও প্রভাবশালীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের।

ওসমানী হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে জরুরি বিভাগ ও প্রধান ফটক পর্যন্ত সর্বত্রই ওত পেতে থাকে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং বাইরের ফার্মেসির দালালরা। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগীদের ডাক্তার দেখানোর সিরিয়াল পাইয়ে দেওয়া, কম মূল্যে ওষুধ বা পরীক্ষার সুবিধা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাইরের নির্দিষ্ট ফার্মেসি ও ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়াই এদের মূল কাজ। হাসপাতালের ভেতরে অনেক ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অসহায় রোগীদের বাইরের চড়া দামের ফার্মেসি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাতে বাধ্য করছে এই সিন্ডিকেট।

হাসপাতালের ভেতরের প্রধান রাস্তা ও বিভিন্ন ভবনের চারপাশ এখন প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স ও সাধারণ যানবাহনের অবৈধ পার্কিং জোনে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন বেনামি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন অ্যাম্বুলেন্স সারিবদ্ধভাবে হাসপাতালের জরুরি চলাচলের পথ আটকে দাঁড়িয়ে থাকে। এতে সরকারি হাসপাতালের নিজস্ব জরুরি সেবার গাড়ি ও গুরুতর রোগীদের বহনকারী যানবাহনগুলো প্রতিনিয়ত তীব্র যানজটের সম্মুখীন হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালীদের আশীর্বাদপুষ্ট এই চালক সিন্ডিকেটের সদস্যরা মৃতদেহ বা রেফার্ড রোগীদের পরিবহনের ক্ষেত্রে স্বজনদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে থাকে।

দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী ও দালালদের চতুর সিন্ডিকেটের কারণে প্রতি পদে পদে তারা হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। সিলেট অঞ্চলের এই একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতালের সুনাম ধরে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিরবচ্ছিন্ন সেবা পৌঁছে দিতে অনতিবিলম্বে হাসপাতাল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর ও স্থায়ী পদক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ।

সার্বিক এই অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের বিষয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন, ভারপ্রাপ্ত) ডা. কাজী আব্দুল্লাহ কায়সার বলেন, রোগীদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই পাঁচটা অ্যাম্বুলেন্স রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু তাদের সরিয়ে দেওয়ার পরেও আবার ফিরে ভিড় করে। তারপরও আমরা একটা চেষ্টা করছি একটা বিকল্প পার্কিং এর ব্যবস্থা করা যায় কি না, এই ব্যাপারে আমরা তৎপর আছি।

দালালদের উপদ্রব প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন বা দুই একদিন পর পরই দেখা যায় যে আমাদের পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্য আছে তারা একজন বা দুইজন দালাল, ধোঁকাবাজ এদেরকে গ্রেফতার করে এবং আইনত ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু হাসপাতাল সেনসিটিভ জায়গা হওয়ায় তারা ‘আমার রোগী আছে’ বলে এই সুবিধাটাকে কাজে লাগায় দালালরা। তাই একদম পুরোপুরি দালামমুক্ত হওয়া যাচ্ছে না।

সুনামগঞ্জের জাউয়াবাজার থেকে ওসমানী হাসপাতালে ডেলিভারী করাতে এসেছেন সুফিয়া বেগম। কিন্তু তিনি সিট না থাকায় লেবার রুমের বাইরে ফ্লোরে বসে আছেন। তার স্বামী মাসুক মিয়াকে একজন ওয়ার্ডবয় বলেছে, বিকেলের দিকে রোগী চলে যাবে তবে ৩০০-৪০০ টাকা তাকে দিলে সিটের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু কখন সুফিয়া বেগমের ডেলিভারী হবে তিনি জানেন না। আবার কয়েকজন দালাল তাকে একটি হাসপাতাল থেকে বাকিতে ঔষধ কিনে দেয়ার অফার দিচ্ছে, যাওয়ার সময় টাকা দিলে হবে। কিন্তু কত টাকা লাগবে সঠিক তথ্য জানাতে পারছে না এই দালাল। তার স্বামী মাসুক মিয়া বলেন, আমরা যেন দালালের খপ্পরে পড়ে অসহায় হয়ে না যাই।