পঞ্চগড় থেকে আব্দুল গনি

ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে মসজিদ একটি পবিত্র ঘর। আর এই মসজিদটি যদি হয় পুরোনো ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত তাহলে তো কথায় নেই। তেমনি শত শত বছরের ইতিহাসের স্বাক্ষী পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুরে অবস্থিত একটি মসজিদ। মোঘল আমলের নান্দনিক স্থাপত্য শিল্পকর্ম আর সেই সময়ের কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় কারুকার্যের সমন্বয়ে তৈরী এ মসজিদটি যে কারুরই মনকে আকৃষ্ট করবে। প্রায় ছয়শ বছর আগে নির্মিত হলেও কালের স্বাক্ষী হয়ে এখনও তার জৌলুস ধরে রেখেছে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুরের তিনগম্বুজ বিশিষ্ট শাহী মসজিদ। মসজিদের দেয়ালের প্রাচীন টেরাকোটা ও খোদাই করা দৃষ্টিনন্দন নকশা মসজিদটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। শাহী মসজিদের নির্মাণ শৈলীর সাথে ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত মসজিদের অনেকটাই সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। মসজিদের দেয়ালের টেরাকোটা আর সুনিপুণ কারুকাজ দেখতে প্রতিদিনই আসেন অনেক দেশী বিদেশী পর্যটক।

প্রাকৃতিক ও প্রাচীনতার কারণে হারিয়ে গেছে দেশের অসংখ্য প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন। পুরনো দিনের কারিগরদের সুদক্ষ হাতে তৈরি কিছু নিদর্শন এখনও কালের স্বাক্ষী হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া দিন ও পুরোনো ইতিহাস ঐতিহ্যকে খুঁজে ফেরে বর্তমান প্রজন্ম।

তেমনই কয়েকশ বছরের পুরনো ইতিহাসকে বুকে আগলে রেখেছে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুরের শাহী মসজিদ। ঐতিহাসিক এ মসজিদটি কে নির্মাণ করেছেন এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বেশ মতপার্থক্যও রয়েছে।

স্থানীয় কারো কারো মতে মালিক উদ্দিন নামে মির্জাপুর গ্রামেরই এক ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেন।

আবার অনেকে বলেছেন,দোস্ত মোহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ করেন। মসজিদের অষ্পষ্ট এক শিলালিপি অনুযায়ী মুঘল শাসক শাহ সুজার শাসনামলে মির্জাপুর শাহী মসজিদটি নির্মাণ করা হয় বলে ঐতিহাসিক সূত্রে কেউ কেউ ধারণা করছেন। মসজিদের মধ্যবর্তী দরজার উপরিভাগে পারস্য ভাষায় লেখা অস্পষ্ট একটি ফলক অনুযায়ী ধারণা করা হচ্ছে মুঘল সম্রাট শাহ আলমের রাজত্বকালে এই মসজিদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এছাড়া মোঘল স্থাপত্য রীতি ও বৈশিষ্ট্যে নির্মিত এ মসজিদের গম্বুজের শীর্ষবিন্দু ক্রমহ্রাসমান বেল্ট দ্বারা যুক্ত।

৪০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৫ ফুট প্রস্থের এ মসজিদের ভেতরে দুটি কাতার বা দুই লাইনে বসার সুযোগ রয়েছে। যাতে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করে থাকে।

মসজিদের দেয়ালে টেরাকোটা, ফুল আর লতা-পাতার খোদাই করা নকশা আগত দর্শনার্থীদের সহজেই আকৃষ্ট করে। মজার বিষয় হলো নকশা গুলো একটির সাথে অন্যটির মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

এছাড়া মসজিদটির চার কোণে চারটি মিনার রয়েছে। সামনের দেয়ালের দরজার দু’পাশে গম্বুজের সঙ্গে মিল রেখে অপর দু’টি মিনার দৃশ্যমান। মসজিদের দেয়ালে ব্যবহৃত পাতলা প্রতিটি ইটে বিশেষ নকশায় পরিপূর্ণ। নান্দনিক কারুকাজ আর প্রাচীনকালের এক রহস্যময় আলেখ্য এ মসজিদটি।

হারানো দিনের সমৃদ্ধ ইতিহাস খুজতে এখন গবেষণা করছেন দেশী বিদেশী গবেষকরা। মসজিদটিকে জেলার পর্যটন শিল্পের অন্যতম উপাদান হিসেবে মনে করা হয়। স্থানীয় মুসল্লিরা জানায়, অনেকদিন আগে প্রবল ভুমিকম্পে মসজিদটির বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন এ গ্রামেরই তৎকালীন মালিকউদ্দীন নামের এক ব্যক্তি ইরান থেকে দক্ষ কারিগর এনে মসজিদটির সংস্কার কাজ করেন। বর্তমানে উপজেলা প্রশাসন মসজিদটির প্রয়োজনীয় তত্ত্বাবধান করছে।

মসজিদের পূর্বপাশে রয়েছে ইমামবাড়া বা হোসেনি দালান। ইটের তৈরি ইমামবাড়ার ভেতরটা গোলাকার এবং একটি কক্ষ রয়েছে। আর এ ইমামবাড়ার ভেতরের কক্ষে একসময় মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা হতো। স্থানীয়রা জানান, সেখানে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে তৎকালীন সময়ের ধর্মীয় নেতারা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করতেন। তবে বর্তমানে জরাজীর্ণ ও অসংরক্ষিত হিসেবে ইমামবাড়াটি পড়ে রয়েছে। পঞ্চগড়ের এমন পুরনো ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে সম্পৃক্ত স্থাপনা গুলোকে সংস্কার ও মেরামত করা গেলে জেলার পর্যটন শিল্পের বিকাশে অনন্য অবদান রাখবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

আর মোঘল আমলের নান্দনিক স্থাপত্য শিল্পকর্ম মির্জাপুর শাহী মসজিদ দেখতে চাইলে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনে ও বাসে আসতে পারবেন। ট্রেন যোগে আসলে পঞ্চগড় রেলওয়ে স্টেশনে নামবেন। তারপর স্টেশন থেকে অটো যোগে মির্জাপুর শাহী মসজিদ যেতে হবে।