মনসুর আহমদ
ফজরে মুসলমানদের ঘুম ভাঙে‘ আস্ সালাতু খাইরুম মিনান্ নাউম’ আহ্বানে, হিন্দুরা জেগে ওঠে কাঁসার ঘণ্টা শুনে। খণ্ডকালীন সময়ের জৈবিক ঘুম ভাঙাতে এত সব আয়োজন। একটি ঘুমন্ত জাতির আত্মিক জাগ্রতির জন্য প্রয়োজন কালের নকীব দরাজ কণ্ঠের মুয়াজ্জিন কবি Ñসাহিত্যিকদের। জাতির ঘুম ভাঙাতে কালের প্রয়োজনে কবি সাহিত্যিকদের আবির্ভাব ঘটে থাকে যুগে যুগে দেশে দেশে। পৃথিবীর সমাজ সভ্যতার দিকে তাকালে দেখা যায় একটি জাতিকে জাগাতে আধমরা জাতির মন- মস্তিষ্কে গভীর আঘাত হানে কবি -সাহিত্যিকগণ।
প্রত্যেক দেশের মুক্তি আন্দোলনে গণমনুষকে জাগিয়ে তুলতে সে দেশের শিল্পী -সাহিত্যিকদের একটি বিরাট ভূমিকা থাকে। আমরা দেখি রুশো, ভল্টেয়ারের (১৬৯৪Ñ১৭৭৭) সাহিত্যÑদর্শন ফ্রান্সবাসীকে তাঁদের লেখার জাদুকরী শক্তির বলে বিপ্লবী করে তুলেছিল, অত্যাচারী রাজশক্তির খড়গ কৃপাণকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ জ্ঞান করার প্রেরণা দিয়েছিল। ‘রাশিয়ার আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তার এক মহত্তম সৃষ্টি হল আ.ন.ম. রাদিশ্যভের রচনা, যা হয়ে দাঁড়ায় রাশিয়ার বৈপ্লবিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে সাহিত্য জগতের অতি পরিচিত পুশ্কিন, দস্তয়ভস্কি, গোর্গির নাম জানে না এমন কম লোকই আছে।
নীল নদের কবি হাফিজ ইবরাহীম আত্মবিস্মৃত সমাজের আত্মভোলা মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। তিনি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করতে লিখলেনÑ
আমরা ছিলাম সম্মানের উচ্চ শিখরে।
সূর্য আলো ছড়াতো আমাদের অঙ্গনে।
কেন আজ কটাক্ষ দৃষ্টি আমাদের পানে?
দুনিয়া ধোঁকা দিচ্ছে আমাদের; ত্যাগ করছে আমাদের!
আমরা হয়েছি অর্থহীন, সম্মানহীন।
নেই আমাদের সহানুভূতিশীল কোন বন্ধু।
(দেওয়ানে হাফিজ ইবরাহীম)
বাগদাদের কবি মারূফÑ আর রুসাফী ( ১৮৭৫Ñ ১৯৪৫) ‘তান্বিহুন নিয়াম’ কবিতায় ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলতে লিখলেনÑ
‘ এখনও কি এগিয়ে যাবার লগ্ন অসেনি?
এখনও নিদ্রা ভঙ্গের সময় হয়নি?
হৃদয়ে হৃদয়ে চেতনার জোয়ার কবে আসবে?
কখনই বা সংশয় আর জড়তা কেটে যাবে?
শৃঙ্খল ভেঙে যাক, মুছে যাক গ্লানি,
আত্মার মুক্তি আসুক।
এ ভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কবি Ñশিল্পীÑ সাহিত্যিকগণ জাতিকে জাগাতে এগিয়ে এলেন। পাকভারত উপমহাদেশে মুসলিম জাতিকে জাগাতে প্রায় একই সময় পশ্চিম প্রান্তে আবির্ভাব হল কবি ইকবালের, পূর্বে কবি নজরুল ইসলামের। আল্লামা ইকবাল দুর্দশাগ্রস্ত ও পদস্খলিত মুসলমানদের জন্য সিরাতুল মুস্তাকিমের আশা ব্যক্ত করে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করেছেনÑ
আয পরে কওমে খোদ না মহরমে,
খাস্তীমে আয হক হায়াতে মহকমে।
Ñ আত্মসত্তার অজ্ঞ ঘুমন্ত এই জাতির তরে,
যাঞ্চা করি দাও হে খোদা, সবল Ñসফল জীবন তারে।
ইকবাল ‘ হিমালাহ’ কবিতায় ঔপনেবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ভারতবাসীকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছেন।‘ তসবীর -ই -দরদ ’ কবিতায় স্বদেশবাসীকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করতে লিখলেন-
ইয়ে খামুশী কাহাঁতক, লজ্জতে ফরিয়াদ পয়দা কর
জমীঁ পর তু হো আওর তেরি সদা হো আসমানোঁ মেঁ।
Ñ কতকাল আর নীরব থাকিবে? ফরিয়াদ নিয়ে দাঁড়াও সব,
মাটিতে থাকিয়া বিপুল শূন্যে প্রেরণ করগো তোমার রব।
এখনো যদি না বুঝিয়া থাক হে স্বদেশবাসী, শোন গো তবে,
আগামী দিনের ইতিহাস মঝে নামটুকু তব নাহি ক রবে।
এভাবে কবি মানবতা বিধ্বংসী শত্রুর বিরুদ্ধে নির্যাতিত মানবতাকে রুখেদাঁড়াবার জন্য আহ্বান জানালেনÑ
উঠো মেরী দুনিয়া কি গরীবোঁকো জাগা দো,
কাখে উমারা কি দর ও দেওয়ার হেলা দো। Ñ
ওঠো বিশ্বের গরীব নিঃস্ব জাগিয়ে দাও,
ধনীর প্রাসাদে ত্রাসের কাঁপন লাগিয়ে দাও।
এ ভাবে কবি ইকবাল তাঁর বিভিন্ন কাব্য কবিতায় মুসলমান জাতিকে রসুল (সঃ)-এর আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের আকুল আহ্বান জানিয়ে ইসলামী নব জাগরণের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
একই ভাবে পাকভারত উপমহাদশের মুসলিম জাতির দুর্যোগপূর্ণ সময় বাংলারমাটিতে আবির্ভাব ঘটে মুসলিম জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলামের। পরাধীনতার শিকল ভেঙে জাতিকে মুক্ত করতে, ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলতে ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’ নিয়ে হাজির হলেন মুসলিম জাতির ভাগ্যাকাশে কাজী নজরুল। তিনি জাতিকে জাগাতে গেয়ে উঠলেন-
‘ বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা শির উঁচু করি মুসলমান,’
“ দিকে দিকে পুনঃজ¦লিয়া উঠিছে
দীন -ই -ইসলামী লাল মশাল,
ওরে বেÑখবর তুইও ওঠ জেগে
তুইও তোর প্রাণ Ñপ্রদীপ জ¦াল।
. . . খয়বর Ñজয়ী আলী হায়দার
জাগো জাগো আরবার।
দাও দুশমন Ñদুর্গ -বিদারী
দুধারী জুল্ফিকার। ”
এ ভাবে প্রচুর কবিতা ও গানের মাধ্যম নজরুল ইসলাম মুসলিম জাতিকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে সচেষ্ট ছিলেন। মুসলিম সমাজের নিষ্ক্রিয়তা ও স্পন্দনহীনতাকে ধিক্কার দিয়ে তিনি রচনা করলেন ‘শাতিল আরব’,‘ মোহাররম’,‘ খেয়া পারের তরণী’ প্রভৃতি জীবনাবেগময়ী কবিতা। স্বৈরাচারী রাজ্যশাসনের বিরুদ্ধে শোষিত জনশক্তির বিদ্রোহী মনোভাবকে জাগিয়ে তুলতে তিনি রচনা করলেন ‘রণভেরী’, ‘কামাল পাশা’, ‘আনোয়ার’, ‘চিরঞ্জীব জগলুল ’ ‘রীফ সর্দার আমানুল্লাহ’ প্রভৃতি কবিতা। মুসলমানদের দেহমনে অফুরন্ত তেজ জাগাতে কবি রচনা করলেন‘ ভোরের সানাই’, ‘খালেদ’, ‘ উমর ফারুক’, ‘সুবেহ উমীদ’, ‘ফাতেহা-ইÑ দোয়াজ দহম’ প্রভৃতি। নজরুল ইসলাম এ ভাবে তাঁর কবিতা ও গানের মাধ্যমে তার সুরের যাদু স্পর্শে পাকভারত উপমহাদেশের মুসলমানদেরকে জাগিয়ে তুললেন। রবীন্দ্র বলয়কে ছিন্ন করে নিজ প্রতিভায় ভাস্বর নজরুল যে ভাবে জাতির নকীব রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন তা সত্যিই বিস্ময়কর।
আজ আর ইকবাল ও নজরুল নেই। কিন্তু তাঁদের আদর্শ অম্লান রয়েছে তাঁদের উত্তরসূরি মুসলিম কবি সাহিত্যিকদের সামনে। আজ যখন মুসলমানকে, মুসলিম চেতনাকে নস্যাৎ করার জন্য নব নব সৃষ্টির মাধ্যমে জাতীয় আদর্শ চেতনাকে ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে তখন মুসলিম জাগ্রত সত্তার কবি সাহিত্যিকদের প্রয়োজন নজরুল ইসলামের রুদ্র রসের অগ্নি উদ্দীপনাকে, কবি ইকবালের আদর্শ, দর্শন ও দেশপ্রেমের ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে জিব্রিলের ডানায় (বালে জিবরিল) ভর করে, প্রবল সত্য বিজলী ঝলক ন্যায় কৃপাণ হাতে নিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়া। তা হলে মুসলিম জাতির ভাগ্যাকাশে নতুন চাঁদের আবির্ভাব ঘটবে। যে জাতির জন্য সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়োজন তাদের হাড়ির খবর নাড়ীর খবরের সাথে সম্পৃক্ত হয়েই সাহিত্য-শিল্প রচনায় এগিয়ে আসলে জাতি জেগে উঠবে, জাতির কল্যাণ হবে।