জাপান টাইমস, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

চার বছরেরও বেশি সময় আগে হাসপাতালে যাওয়ার সময় সাহায্য করার জন্য এই কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। খুব শিগগিরই বাসা বদলানোর কাজ এবং মানসিক সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই সেবা সম্প্রসারণ করা হতে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনেরও বেশি মানুষ এখন একা বসবাস করেন। এর ফলে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাওয়া কিংবা শুধু বাসা বদলানোর মতো সাধারণ কাজগুলোও তাদের জন্য বিশাল ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে সিউল প্রশাসন এই সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান বের করেছে। তারা একটি 'সঙ্গী সেবা' চালু করেছে। এই সেবার অধীনে এমন একজন সাহায্যকারী পাঠানো হয়, যিনি একাকী থাকা মানুষদের সেসব কাজে সাহায্য করেন, যেগুলো একা হাতে সামলানো বেশ কঠিন। গত রোববার সিউল সিটি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চার বছরেরও বেশি সময় আগে হাসপাতালে যাওয়ার সময় সাহায্য করার জন্য এই কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। খুব শিগগিরই বাসা বদলানোর কাজ এবং মানসিক সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই সেবা সম্প্রসারণ করা হতে যাচ্ছে।

এক বিবৃতিতে সিউলের ওয়েলফেয়ার পলিসি ডিরেক্টর বা কল্যাণ নীতি পরিচালক ইউন জং-জাং বলেন, 'সিউলে একা বসবাসকারী যেকোনো বাসিন্দা এই সঙ্গী সেবা নিতে পারবেন।' তিনি আরও বলেন, 'একা থাকা মানুষের সংখ্যা যেহেতু বাড়ছে, তাই তারা যেন দৈনন্দিন জীবনের কাজগুলো কোনো অসুবিধা ছাড়াই সামলাতে পারেন, সে জন্য আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী এমন সহায়তা আরও বাড়াব।'

গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত দ্য কোরিয়া টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার মোট পরিবারের প্রায় ৩৬ শতাংশই ছিল এক ব্যক্তির পরিবার। দেশটিতে বর্তমানে এটিই বসবাসের সবচেয়ে সাধারণ চিত্র। একা থাকা এই মানুষদের প্রায় অর্ধেকই জানিয়েছেন যে তারা প্রায়ই বা মাঝেমধ্যেই একাকী বোধ করেন। এই হার জাতীয় গড় ৩৮.২ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি।

আগামী মাস থেকে সিউলের বাসিন্দারা এই সঙ্গী ভাড়া করতে পারবেন। এই সঙ্গীরা শুধু হাসপাতালেই নয়, বরং পুনর্বাসন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন্দ্রেও তাদের সাথে যাবেন। তারা পুরোটা সময় রোগীর সাথে থাকবেন এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা সামলাতে সাহায্য করবেন। এই সেবার জন্য এখন থেকে প্রতি ঘণ্টায় ৬ হাজার ওন (প্রায় ৪ মার্কিন ডলার) খরচ হবে, যা আগে ছিল ৫ হাজার ওন। একজন ব্যক্তি মাসে সর্বোচ্চ ১০ বার বা বছরে ২০০ ঘণ্টা এই সেবা ব্যবহার করতে পারবেন। তবে যাদের আয় মধ্যম আয়ের নিচে, তারা বছরে ৪৮ বার সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে এই সেবা নিতে পারবেন। কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২১ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়ার পর থেকে সিউলের এই হাসপাতাল সঙ্গী সেবাটি প্রায় ৭০ হাজার বার ব্যবহার করা হয়েছে। আর এই সেবায় গ্রাহক সন্তুষ্টির হার ৯০ শতাংশেরও বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা একা বাসা বদলানোর ঝক্কি সামলাতে হিমশিম খান, তাদের জন্য বাসা বদলের দিন সর্বোচ্চ ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত একজন সঙ্গীর সাহায্য নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এই সঙ্গী বাসা পরিদর্শন, ঠিকানা পরিবর্তনের নিবন্ধন এবং গ্যাস-বিদ্যুতের বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে সাহায্য করবেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই সেবায় আসবাবপত্র সরানো বা জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার মতো শারীরিক পরিশ্রমে সাহায্য করা হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এদিকে একাকী বোধ করা বাসিন্দাদের সাথে কথা বলার জন্য একটি নির্দিষ্ট কল লাইন চালু করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে এই সেবার মাধ্যমে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য কল্যাণ কেন্দ্রেও পাঠানো হবে। এই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি কেবল দক্ষিণ কোরিয়াই নয়। সংবাদ মাধ্যম নিপ্পন ডটকম-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত জাপানেও মোট পরিবারের প্রায় ৩৪ শতাংশ মানুষ একা বসবাস করতেন। জাপান সরকার এই সমস্যাকে জাতীয় পর্যায়ে সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২১ সালে তারা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং একাকিত্বের জন্য একজন আলাদা মন্ত্রী নিয়োগ দেয়। এরপর ২০২৪ সালের এপ্রিলে একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে একটি আইনও পাস করে দেশটি। তবে গত বুধবার এক প্রতিবেদনে নিপ্পন ফাউন্ডেশনের একটি জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়। ওই জরিপে দেখা যায়, জাপানের তরুণরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশায় ভুগছে। ৬টি দেশের মধ্যে জাপানের কিশোর-কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি নিরাশাবাদী।

জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রিটেন ও ভারতের ১৭ থেকে ১৯ বছর বয়সী ১ হাজার মানুষের ওপর এই জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, জাপানের মাত্র ৬২ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন যে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্বপ্ন আছে, যা জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। জরিপে মাত্র ১৬ শতাংশ তরুণ বিশ্বাস করেন যে তাদের দেশের ভবিষ্যৎ উন্নত হবে। অন্যদিকে, বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করা তরুণের সংখ্যা ২০২২ সালের একই ধরনের জরিপের তুলনায় ৭.৪ শতাংশ কমে ৫৮.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জাপানের মতো এমন একটি অতি-বৃদ্ধ সমাজের জন্য এই পরিসংখ্যান দীর্ঘমেয়াদে চরম উদ্বেগজনক, যারা এমনিতেই তীব্র জনমিতিক সংকটের মুখে ধুঁকছে।