সিএনএন

কিন্তু এর পরিণতি থেকে তারা রেহাই পাবে না। এটা তাদের যুদ্ধ নয়। কিন্তু এটি তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। যেসব বিশ্বনেতা ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি হামলার বিরোধিতা করেছিলেন, তারা এখন একদিকে এই সংঘাতে যোগ না দেওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রোধ এবং অন্যদিকে যুদ্ধ ও আমেরিকার প্রেসিডেন্টের প্রতি গভীরভাবে বিদ্বেষী নির্বাচকম-লীর মধ্যে উভয় সংকটে পড়েছেন।তাদের এই উভয় সংকট যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মধ্যকার গতিপ্রকৃতি বদলে দিচ্ছে। যে নেতারা একসময় বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষটিকে তুষ্ট ও তোষামোদ করার চেষ্টা করতেন, তারাই এখন তার সমালোচনা করার সাহস দেখাচ্ছেন এবং দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছেন। তারা শুধু মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রতি বিদ্বেষ থেকেই এমনটা করছেন না, বরং যুদ্ধ-সম্পর্কিত চাপের কারণেও করছেন, যা তাদের জনগণের জীবন-জীবিকা এবং ফলস্বরূপ তাদের নিজেদের সরকার ও কর্মজীবনকে হুমকির মুখে ফেলছে। এমনকি যে নেতারা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আচরণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন, তারাও তার অবজ্ঞার প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সোমবার বলেছেন, পোপ চতুর্দশ লিও-র ওপর ট্রাম্পের আক্রমণ ছিল “অগ্রহণযোগ্য”। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, যার সাথে ট্রাম্পের বন্ধুত্ব যুদ্ধের কারণে ভেঙে গেছে, গত সপ্তাহে বলেছেন যে ট্রাম্পের কর্মকা-ের ফলে ব্রিটিশদের জ্বালানির বিল বাড়তে হওয়ায় তিনি ‘বিরক্ত’।

নেতারা যুদ্ধের এমন সব পরিণতির প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন যা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক সতর্কবার্তা, যেখানে বলা হয়েছে যে বিশ্ব এ বছর মাত্র ২.৫% প্রবৃদ্ধির এক ‘প্রতিকূল’ পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে, যা ২০২৫ সালের ৩.৪% থেকে কম। মধ্যপ্রাচ্যের গ্যাস ও তেল সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। আইএমএফ ব্রিটেনের জন্য ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১.৩% থেকে কমিয়ে ০.৮%-এ নামিয়ে এনেছে। এটি স্টারমারের সংকটাপন্ন সরকারের জন্য একটি বিপর্যয় হবে, কারণ সরকার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র, জাপানও চাপের মধ্যে রয়েছে, কারণ দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম বাড়ছে এবং মজুরি সামান্য বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ফেব্রুয়ারিতে তার ঐতিহাসিক নির্বাচনী বিজয়ের পরপরই এমন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হবেন, তা তিনি কখনো আশা করেননি।

ইরান যুদ্ধের আগেও, অনেক মিত্র দেশে ট্রাম্প অত্যন্ত অজনপ্রিয় ছিলেন। গত বছর পিউ রিসার্চের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, এক ডজনেরও বেশি দেশে প্রেসিডেন্টের অনুমোদন রেটিং ৩৫% বা তার নিচে ছিল। ইসরাইল ও নাইজেরিয়াসহ মাত্র কয়েকটি দেশে তার অনুমোদন সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের চেয়ে বেশি ছিল। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি সময় পর্যন্ত স্থায়ী একটি বিচ্ছেদকে বোঝায় না। এটি সেই জোটগুলোকে হুমকির মুখে ফেলছে, যা কয়েক দশক ধরে মার্কিন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে, ন্যাটোর প্রতি ট্রাম্পের বিদ্বেষ এর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তাগুলোকে নড়বড়ে করে দিয়েছে, এমনকি যদি তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নাও নেন। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস তার বক্তব্য এবং পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত নথিপত্রে এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা একবিংশ শতাব্দীতে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার সর্বোত্তম উপায় হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শক্তি প্রয়োগকেই দেখে। রাষ্ট্রপতি ন্যাটোকে একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট হিসেবে নয়, বরং তাঁর পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখেন বলে মনে হয় — যেমন, ইরানে নিজের পছন্দের কোনো যুদ্ধ।