সংগ্রাম ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টানা দুই সপ্তাহের বোমা হামলা বন্ধ করার পর ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখনও তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তারা কোনও শান্তি আলোচনার অনুরোধ জানায়নি। মার্কিন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের পরামর্শে ওয়াশিংটন বোমা হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তেহরানের পক্ষ থেকে এ প্রতিক্রিয়া এলো। এপি, রয়টার্স, আল-জাজিরা, রয়টার্স আল-জাজিরা সূত্র: বিবিসি আনাদোলু এজেন্সি।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলোচনার অনুরোধ জানানোর খবর সম্পূর্ণ মনগড়া ও ভিত্তিহীন।

মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান চললেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া তাদের ডিএনএ-তে নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ট্রাম্পের দুই সপ্তাহের হামলায় নিজেদের সামরিক লক্ষ্যমাত্রা শেষ হয়ে যাওয়া এবং আকাশ প্রতিরক্ষা গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসার আশঙ্কায় মার্কিন সামরিক প্রধানদের পরামর্শেই এই হামলা বন্ধ করা হয় বলে উল্লেখ করেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। হামলা বন্ধের খবরে তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ৮ শতাংশের বেশি কমে প্রতি ব্যারেলে ৮৯ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

ইরানী রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করায় সোমবার সকালে ছয়টি অপরাধী জাহাজকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে একটি দুর্ঘটনায় পড়েছে। দুই সপ্তাহের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ইরানে বহু মানুষ নিহত হওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ অঞ্চলের সেতু ও সুড়ঙ্গ ধ্বংস হয়েছে এবং ইরানের পাল্টা হামলায় চারজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।

‘ইচ্ছেমতো’ যুদ্ধ থামাতে পারবে না

যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ কিংবা শান্তির সময় নির্ধারণ করার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেন, ওয়াশিংটন নিজেদের তৈরি সংকটে নিজেরাই আটকে গেছে।

রোববার ইসমাইল বাঘেই তার সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ওয়াশিংটন নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী যুদ্ধ থামানো বা শুরু করার সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নিতে পারে না।

এর আগে রোববার ইরানের সামরিক মুখপাত্র আমির মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানান যে যুক্তরাষ্ট্র দুই রাত ধরে হামলা স্থগিত রাখার পর ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা অভিযান বন্ধ রাখা হয়েছে।

তৃতীয় রাত হামলা স্থগিত

কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ দিতে ইরানে টানা তৃতীয় রাতের মতো হামলা স্থগিত রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, আলোচনার সুযোগ তৈরিতে প্রেসিডেন্ট একটু সময় ও সুযোগ দিচ্ছেন। এর জবাবে ইরানী সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্রও জানান, তেহরানও এই অঞ্চলে তাদের প্রতিশোধমূলক হামলা স্থগিত রেখেছে। টানা প্রায় দুই সপ্তাহ মার্কিন হামলা ও পাল্টা হামলার পর এই বিরতি এলো, যা জুনে হওয়া যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলেছিল।

হামলা স্থগিতের খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত কমে সোমবার সকালে প্রতি ব্যারেলে ৯০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা গত সপ্তাহে মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ১০০ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে ট্রাম্প উত্তেজনা কমানোর স্থায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিনা- এমন প্রশ্নে এনবিসিকে ওয়াল্টজ বলেন, প্রেসিডেন্টের সামনে সব ধরনের বিকল্প খোলা রয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা গোলাবারুদের ঘাটতির যে কথা বলা হয়েছিল, তা খারিজ করে ওয়াল্টজ দাবি করেন, সামরিক অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছুই মার্কিন বাহিনীর রয়েছে। সিবিএসকে তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হচ্ছে এবং ট্রাম্পের বক্তব্যকে ইরানের গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত।

এখনও ট্রাম্প এ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না বললেও তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে মার্কিন যুদ্ধবিমান দ্বারা ইরানের জাহাজ ও খার্গ দ্বীপে বোমাবর্ষণের এআই-জেনারেটেড ছবি পোস্ট করেছেন। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হুমকি কমানোর লক্ষ্যে টানা ১৩ রাত যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এই বিরতি এলো।

টোল আদায়ের সিদ্ধান্তে অনড়

হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। এ বিষয়ে একটি কার্যকর কৌশল নির্ধারণের লক্ষ্যে সম্প্রতি ওমানের একটি প্রতিনিধিদল তেহরান সফর করে ইরানের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে।

তবে মধ্যস্থতার চেষ্টা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের মূল অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বিকল্প কোনো করিডর তৈরির প্রস্তাব এখনো প্রত্যাখ্যান করে আসছে দেশটি।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনার জন্য ওমান একটি আঞ্চলিক যৌথ ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের টোল বা শুল্ক না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ওমানি প্রতিনিধিদল।

তবে ইরান তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, দেশটি এখনো জাহাজের কাছ থেকে ‘সার্ভিস ফি’ আদায় করার নীতিতে অটল রয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির মূল ব্যবস্থাপনা নিজেদের নিয়ন্ত্রণেই রাখতে চায় তেহরান।

৬ জাহাজের পথ রোধ

হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাংশে আন্তর্জাতিক নৌপথের নিয়ম ভঙ্গ করায় অন্তত ছয়টি জাহাজের পথ রোধ করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা আইআরআইবির বরাত দিয়ে গতকাল সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

ইরানী গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজগুলো তাদের নিজস্ব নেভিগেশন ও পজিশনিং (অবস্থান নির্ণয়কারী) সিস্টেম বন্ধ করে একটি ‘অবৈধ ও বিপজ্জনক’ পথ দিয়ে প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করছিল। এ সময় একটি জাহাজে দুর্ঘটনা ঘটে এবং ইরানের ‘দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপের’ মুখে বাকি জাহাজগুলো আবারও পারস্য উপসাগরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

ইরানের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, সোমবার ভোরের দিকে এ ঘটনা ঘটে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর উসকানিতেই জাহাজগুলো ওই বিপজ্জনক পথে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছিল বলে দাবি করেছে তেহরান।