সংগ্রাম ডেস্ক
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, গতকাল বুধবার তারা জর্ডানে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে ১০টি জাহাজে হামলা করেছে তারা। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, তারা ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা এ যুদ্ধে সর্বশেষ এই পাল্টাপাল্টি হামলা নতুন করে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি করেছে। আঞ্চলিক মিত্ররাও এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। অথচ প্রায় এক মাস ধরে যুদ্ধ পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল। এখন এই উত্তেজনার মধ্যে তেলের দাম আবার দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বিবিসি, রয়টার্স, তাসনিম নিউজ, ইরনা।
মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের নৌবাহিনী দাবি করেছিল, তারা হরমুজ প্রণালিতে একটি চালকবিহীন মার্কিন সাবমেরিন জব্দ করেছে। আইআরজিসি বলেছে, গতকাল তারা যে ১০টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ২টি মার্কিন জাহাজ ও ৮টি তেলবাহী ট্যাংকার। জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালির একটি ‘নিষিদ্ধ ও অনিরাপদ’ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করছিল। ইরানের অব্যাহত হামলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ জ্বালানি পরিবহন পথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। গত দুই দিনে তেহরান দুবার একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তার জবাবেই গতকালের এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। সেন্টকমের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইরানি তেলবাহী চারটি ট্যাংকারকে ওমান উপসাগরে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এ ছাড়া পারস্য উপসাগরীয় উপকূলের অদূরে অবস্থিত ইরানের খারগ দ্বীপের কাছে আরেকটি ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে। খারগ দ্বীপে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা রয়েছে। এসব হামলার জবাবে তেহরান জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। জর্ডান দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি ভূপাতিত করেছে। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছেন জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনীর একজন মুখপাত্র।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান নিয়মিতভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও তাদের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। এর মধ্যে জর্ডানেও বেশ কয়েকবার হামলা হয়েছে। জুলাইয়ে চালানো একটি হামলায় অন্তত দুই মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হন।
উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে এশিয়ার বাজারে আজ দিনের শুরুতে তেলের দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৯৯ দশমিক ৪১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেন হওয়া তেলের দাম ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ৫৫ ডলারে উঠেছে। এক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা আবার তীব্র হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জেরে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ সাত মাসে গড়িয়েছে।
ইতিমধ্যে ইরান আরও প্রতিশোধমূলক হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরগুলোর কাছে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর নাবিকদের উদ্দেশে ইরান বলেছে, তারা ‘নোঙর করা বা বন্দরে থাকাÑযে অবস্থায় থাকুন না কেন, অবিলম্বে যেন জাহাজ ছেড়ে চলে যান, কারণ এগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হবে।’ একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর সর্বশেষ এই যুদ্ধ উত্তেজনা বেড়ে যায়। সেন্টকম দাবি করেছে, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ‘সফলভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে’। হামলায় কোনো মার্কিন সেনা ক্ষতিগ্রস্ত হন নি।
যুক্তরাষ্ট্র আরও বলেছে, তারা ইরানি তেলবাহী যে পাঁচটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে, সেগুলো ‘বহু বিলিয়ন ডলারের একটি গোপন নেটওয়ার্কের অংশ, যা ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং তাদের আঞ্চলিক সহযোগী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন করে’। ইরানের মোট অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) প্রায় ৯০ শতাংশই খারগ দ্বীপের মধ্য দিয়ে রপ্তানি করা হয়। মূল ভূখ- থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল এনে দ্বীপটি হয়ে তা পরিবহন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পরিস্থিতিকে ‘বেশ সরল’ বলে মন্তব্য করেন। কলম্বিয়া সফরের সময় রুবিও বলেন, ‘ইরান মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে হামলার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আর তারা যতবারই এমন করবে বা করার চেষ্টা করবে, ততবারই তাদের তেলবাহী ট্যাংকার হারাতে হবে। আমার মনে হয়, আজও আপনারা সেটাই দেখতে পাবেন।’ গতকালের মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের নৌবাহিনী দাবি করেছিল, তারা হরমুজ প্রণালিতে একটি চালকবিহীন মার্কিন ‘সাবমেরিন ড্রোন’ জব্দ করেছে।
এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত
হরমুজ প্রণালীতে নজরদারি চালানোর সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-১ গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। হরমুজ প্রণালীর প্রবেশপথে ড্রোনটি শনাক্ত করার পর ইরানি সামরিক বাহিনী সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম । সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেশটির সেনাবাহিনী ও ইসলামীক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে।
ইরানের দাবি, আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘শত্রুভাবাপন্ন’ ওই ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ড্রোনটি ভূপাতিত হওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্যের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
মার্কিন গোয়েন্দা সাবমেরিন আটক
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে শত্রুপক্ষের একটি মার্কিন বুদ্ধিমান ও চালকবিহীন সাবমেরিন আটক করার খবর জানিয়েছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানায়, মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে বিপ্লবী গার্ডের নৌবাহিনীর যোদ্ধারা গতকাল ভোরে একটি জটিল গোয়েন্দা ও অপারেশনাল তৎপরতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে মার্কিন সেনাবাহিনীর অন্যতম আধুনিক কৃত্তিমবুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবস্থা সম্পন্ন ও চালকবিহীন সাবমেরিন ফাঁদে ফেলে আটকাতে সক্ষম হয়েছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আটক করা এই সাবমেরিনটি বিশ্বের সর্বাধুনিক আন্ডারওয়াটার প্রযুক্তির অধিকারী। এটি ২০২৫ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীর বহরে যুক্ত করা হয়েছিল। ইসলামী বিপ্লবী গার্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাবমেরিনটি বর্তমানে ইরানের হাতে জব্দ অবস্থায় রয়েছে এবং এরই মধ্যে এর ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।