স্টাফ রিপোর্টার
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে গুলীবিদ্ধ হন এক ছেলে। বাড়িও ঘেরাও করেন আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। প্রাণ বাঁচাতে ছাদ টপকে পালিয়ে যান বাবা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দীতে এমনটিই উল্লেখ করেছেন ৫৫ বছর বয়সি এক প্রত্যক্ষদর্শী।
তিনি জানান, আন্দোলনকারীদের সহায়তা করায় তাকে বারবার খুঁজতে থাকেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ২ আগস্ট রাতে ঢাকার আজিমপুরের বাড়ি ঘেরাও করলে পরদিন ভোরে চট্টগ্রামে পালিয়ে যান তিনি।
গতকাল বুধবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কামরুল ইসলাম ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে দুই নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন এই সাক্ষী। নিরাপত্তার স্বার্থে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
জবানবন্দীতে সাক্ষী বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সন্ধ্যা ৭টার সময় বাসা থেকে আমাকে ফোন করা হয়। ফোনে আমার বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজা নীলক্ষেত এলাকায় আন্দোলনরত অবস্থায় পায়ে গুলীবিদ্ধ হয়েছেন বলে জানানো হয়। ওই দিন আন্দোলনে গিয়ে নিউমার্কেট ২ নম্বর গেটে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের ছোড়া গুলীতে আবদুল ওয়াদুদ নামে পরিচিত একজন ব্যবসায়ী নিহত হন। আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টারের গেটে শহীদ হন আরও এক আন্দোলনকারী। এছাড়া একই দিন জুমার নামাজের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড্ডা, রামপুরা এলাকায় ছয়-সাতজন প্রাণ হারান। এর মধ্যে ১১ বছরের শিশু তামিম শিকদারও রয়েছে। আমি নিজেও কয়েকজন আন্দোলনকারীকে গুলীবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি।
তিনি বলেন, ১৯ জুলাই ১৪ দলের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কারফিউ জারি ও আন্দোলনকারীদের দেখামাত্রই গুলী করার সিদ্ধান্ত জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বৈঠকে তার পাশে ছিলেন ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা রাশেদ খান মেনন। সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামও ছিলেন। ২০ জুলাই সকাল থেকে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বাসায় বাসায় তল্লাশি শুরু করে। তারা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মারধর করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেন। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের বইপুস্তক পুড়িয়ে দিয়ে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেন। তারা আমার বাসায়ও তল্লাশি চালান। ২০ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত এসব নির্যাতন চলতে থাকে।
৫৫ বছর বয়সী এই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ায় তাকে খুঁজতে থাকেন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এজন্য ২৪ জুলাই পালিয়ে চট্টগ্রামে চলে যান তিনি। তার গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়াতেও পুলিশ ও আওয়ামী লীগ হামলা চালায়। ২৬ জুলাই পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসেন এই সাক্ষী।
সাক্ষ্যে তিনি আরও বলেন, ২৬ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত আমি আহত আন্দোলনকারীদের খাবার, চিকিৎসা, পোশাকসহ বিভিন্ন জিনিস দিয়ে সাহায্য করি। ২ আগস্ট রাতে আমার আজিমপুরের বাড়ি ঘেরাও করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। তখন আমি বাড়ির ছাদ থেকে অন্য ছাদে লাফিয়ে পালিয়ে যাই। ৩ আগস্ট ভোরে আমি চট্টগ্রামে চলে যাই। ওই দিন রাতে সাতকানিয়ার বাড়িতে আমার ওপর ভয়াবহ হামলা চালান আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। একই দিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে আন্দোলনকারী ছাত্ররা শেখ হাসিনার পতনের একদফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমি প্রাণভয়ে যেতে পারিনি।
সাক্ষী বলেন, ৪ আগস্ট আমি চট্টগ্রাম নিউমার্কেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে অংশ নেই। আমাদের সঙ্গে চট্টগ্রামের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের গুলীতে গুলীবিদ্ধ হন আমার পাশে থাকা আন্দোলনকারী চট্টগ্রাম ইসলামিক ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ছাত্র একেএম নুরুল্লাহ। তার কোমর থেকে পা পর্যন্ত অসংখ্য গুলী লাগে। গুলীগুলো ছিল বড় বড়। তার রানে একটি গুলী লেগে মাংস ছিড়ে যায়। ছেলেটি ছিল হতদরিদ্র। আমি তার চিকিৎসায় সাহায্য করি। ছেলেটি পঙ্গু হয়ে গেছে। ওই সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের প্রত্যেকের হাতে অস্ত্র দেখতে পাই। তাদের অনেককে আমি চিনে ফেলি। ওই দিন চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা, বকশিরহাট, চট্টগ্রাম কোর্ট এলাকা, নিউমার্কেট এলাকা, ষোলশহর, ওয়াশামোড়সহ বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগ ও পুলিশের গুলীতে হাজারও আন্দোলনকারী আহত ও নিহত হন। তাদের মধ্যে আমার তিনজন কর্মচারীর গায়ে ছররা গুলী লাগে। ৪ আগস্ট রাতে আমি আট-নয়বার গাড়ি পরিবর্তন করে ঢাকায় চলে আসি।
জবানবন্দীতে আরও উল্লেখ করা হয়, ৫ আগস্ট আমি আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আজিমপুর নিউমার্কেট এলাকা থেকে বেলা ১১টার পর গণভবনের উদ্দেশে রওনা দেই। ওই দিন সকালে চানখারপুল, শহীদ মিনার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনসহ গুলী চালানো হয়। অনেক ছাত্র আহত ও নিহত হন। আমরা রাস্তায় পদে পদে বাধার সম্মুখীন হই। একপর্যায়ে দুপুর ১টার দিকে শুনতে পাই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাচ্ছে। আমরা গণভবনে আনন্দ মিছিলে যোগ দেই।
একই দিন বিকেল ৩টার দিকে আমার বন্ধু খলিলুর রহমান আমাকে ফোন দেন। ফোনে জানানো হয়, তারা বাড্ডা এলাকায় আছেন। পুলিশ, বিজিবি, আওয়ামী লীগের লোকজন তাদের ঘেরাও করে রেখেছেন। যেকোনো সময় তাদের মেরে ফেলতে পারে। তাদের উদ্ধারের জন্য সাহায্য চাওয়া হয়। বিকেল ৫টার সময় আমি বাড্ডায় পৌঁছাই। সেখানে বন্ধু খলিলুর রহমানকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে একটি গলির মধ্যে খুঁজে পাই। তার শরীরে সাত শতাধিক ছররা গুলীর চিহ্ন দেখতে পাই। তাকে পাশে একটি বাড়িতে নিয়ে রাখি। পরবর্তী সময়ে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। আমিও বাসায় চলে আসি। সরকারের সহায়তায় পাঁচ মাস ধরে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে দেশে আছেন খলিলুর রহমান। তবে পঙ্গু হয়ে গেছে।
এ সময় আন্দোলনকারীদের নির্বিচারে গুলী করে হত্যা ও আহত করার জন্য শেখ হাসিনার অন্যতম পরামর্শদাতা ছিলেন ওবায়দুল কাদের, রাশেদ খান মেনন এবং কামরুল ইসলাম। আমি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।
জবানবন্দী শেষে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এ মামলায় কামরুল ও মেননকে আসামি করা হয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণের সময় তারা ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ, মামুনুর রশিদসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।