সংসদ রিপোর্টার

শিল্পে গ্যাস সংকট ঠেকাতে সরকার নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনসহ ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, আকস্মিক বা সাময়িক গ্যাস- সংকটের কারণে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার।

এছাড়া ২০৩০-২০৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি কূপ খনন, ৪ হাজার ৫০০ বর্গ কিলোমিটার ২ডি সিসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সদস্য সুলতানা আহমেদের তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। বেলা সাড়ে তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বিড দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে কমবেশি দৈনিক গড়ে ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস সংকটে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের সুবিধাজনক কোনো স্থানে জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আকস্মিক গ্যাস–সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত সরবরাহসক্ষমতা তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার।

ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্যাস নেটওয়ার্কে যুক্ত করার বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের মূল গ্যাস নেটওয়ার্কে নিয়ে আসতে চাইলে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছর সময় লাগবে। তাই ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করে শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। ইতিমধ্যে সেখানে গ্যাসনির্ভর কিছু শিল্প স্থাপনের চেষ্টা চলছে। এর ফলে ভোলা অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতির আকারও বাড়বে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের মানুষের স্বার্থে ভোলার গ্যাস যথাযথভাবে ব্যবহারের জন্য সেখানে একটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও করছে সরকার।

ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখ-ে এনে আগ্রহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের বিষয়েও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যাসপ্রাপ্তি সাপেক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

সরকারের এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা মোকাবিলা এবং শিল্প ও রপ্তানি খাতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানিÑনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান, উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রামে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ, অর্থায়ন পেলে কাজ শুরু

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে যাতায়াতের সময় ও দূরত্ব আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে আনতে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এই রুটে পরিবেশবান্ধব ও দ্রুতগতির ইলেকট্রিক ট্রেন পরিচালনার লক্ষ্যে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিশদ ডিজাইন প্রণয়নের কাজ ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেবল প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা।

কাক্সিক্ষত অর্থায়ন মিললেই মেগা প্রকল্পটির বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণ করে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন শুরু করা হবে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হকের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে সরকারের এই সমন্বিত পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

ইলেকট্রিক ট্রেনের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করে প্রধানমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, চট্টগ্রাম-ঢাকা করিডোরে আধুনিক ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থার যাবতীয় কারিগরি প্রস্তুতি ও নকশা তৈরি শেষ। এখন বৈদেশিক বা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থসংস্থান নিশ্চিত হওয়ামাত্রই প্রকল্পটি দৃশ্যমান করার মূল কাজ শুরু হবে। এটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রথমবারের মতো দ্রুতগতির ইলেকট্রিক ট্রেন চলাচল শুরু হবে, যা রেলওয়ের সার্বিক পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যাতায়াতে এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করবে।

ভোলায় গড়ে তোলা হবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানা

ভোলা থেকে সরাসরি মূল ভূখ-ে গ্যাস নিতে পাইপলাইন নির্মাণে অন্তত সাত বছর সময় লাগবে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাই মূল ভূখ-ে গ্যাস নেওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষায় না থেকে ভোলাতেই শিল্প-কারখানা স্থাপন, সার কারখানা গড়ে তোলা এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য সুলতানা আহমেদের করা সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সরকারপ্রধান এসব কথা বলেন।

ভোলার গ্যাসকে দেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণে ও জাতীয় স্বার্থে ব্যবহারের বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, সেখানে একটি বড় সার (ফার্টিলাইজার) কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। এর পাশাপাশি একই স্থানে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভোলার গ্যাস সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

প্রকল্পে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা ঠেকাতে বেশ কিছু কঠোর ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি জানান, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, যথাযথ ব্যয় প্রাক্কলন না করা, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল মনিটরিং ও জবাবদিহিতার ঘাটতিসহ একাধিক কারণ জড়িত রয়েছে।

কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা জানান।

বিকেল সাড়ে তিনটায় বৈঠক শুরু হওয়ার পর প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নানামুখী সংস্কার ও ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেন।

যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম, সেগুলোর উপযোগিতা ও কার্যকারিতা বিবেচনা করে পুনর্বিন্যাস, স্কোপ পরিবর্তন কিংবা প্রয়োজনভেদে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা জানান তিনি। একই সাথে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প না নিয়ে সমন্বিত কর্মসূচির অধীনে গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ই-জিপি ব্যবহারের সম্প্রসারণ ঘটানো হচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্বে অভিজ্ঞদের আনার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এ সংক্রান্ত নীতিমালা হালনাগাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপি মডেলে প্রকল্প গ্রহণে জোর দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি ক্রয় আরও প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিতামূলক করতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল ২০২৫ হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পলিথিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পলিথিন ও প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে এ নিয়ে যথাযথ দায়িত্ব পালনের নির্দেশনাও দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক পর্যালোচনা সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব গাজী শাহরিয়ার পামির এ কথা জানান।

সভায় পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বায়ু, পানি, মাটি ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।

সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক) ড. সাইমুম পারভেজসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।