সিন্ধু পানি চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত রাখতে পারবে না ভারত—এমন রায় দিয়েছে হেগের স্থায়ী সালিশি আদালত (PCA)। আদালত বলেছে, ছয় দশকের পুরোনো চুক্তিটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর এবং এর আওতায় ভারতকে দেওয়া সব বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে।
সোমবার (০১ সেপ্টেম্বর) পাঁচ সদস্যের সালিশি আদালত সর্বসম্মতভাবে এ রায় দিয়েছে বলে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের দিকে প্রবাহিত নদীগুলোর ওপর ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর নকশা ও পরিচালনার বিষয়েও ভারতকে চুক্তির বিধান মানতে হবে বলে জানিয়েছে আদালত।
চুক্তি স্থগিত রাখার ভারতের সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে বৈধ কি না- এ বিষয়ে কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের এটিই প্রথম রায়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার পর সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয় নয়াদিল্লি।
ভারতের দাবি ছিল, পাকিস্তান আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের সমর্থন ‘বিশ্বাসযোগ্য ও অপরিবর্তনীয়ভাবে’ বন্ধ না করা পর্যন্ত চুক্তি স্থগিত থাকবে।
তবে পাকিস্তান ওই হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ওই হামলায় ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন।
আদালতে অংশ নেয়নি ভারত
সূত্র জানায়, ভারত শুরু থেকেই এই মামলায় স্থায়ী সালিশি আদালতের (PCA) এখতিয়ার প্রত্যাখ্যান করে আসছে। জাতিসংঘের কাঠামোর বাইরে থাকা এই আন্তঃসরকারি আদালত অন্যান্য কিছু বিষয়ে ভারতের এখতিয়ার মেনে নিলেও সিন্ধু পানি চুক্তি-সংক্রান্ত মামলায় তা গ্রহণ করেনি।
পাকিস্তান ২০২৬ সালের মার্চে চুক্তিটির আইনি অবস্থান নির্ধারণের জন্য PCA-তে আবেদন করে।
আদালত ভারতকে শুনানিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলেও নয়াদিল্লি তাতে সাড়া দেয়নি। ২৬ থেকে ২৮ এপ্রিল হেগের পিস প্যালেসে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এতে শুধু পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ভারতের সব যুক্তিই প্রত্যাখ্যান
চুক্তি স্থগিত রাখার পক্ষে ভারত যেসব যুক্তি দিয়ে আসছিল, আদালত সেগুলোও পরীক্ষা করে জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়-
সার্বভৌমত্ব, পাকিস্তানের পুনরায় আলোচনায় অনাগ্রহ, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রয়োজন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় সামনে এনেছিল নয়াদিল্লি।
তবে আদালত এসব যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, কোনো রাষ্ট্র সার্বভৌম—এই কারণে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সেটি একতরফাভাবে কোনো চুক্তি স্থগিত করার অধিকার পায় না।
পাকিস্তানের স্বস্তি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রায়কে স্বাগত জানিয়েছে পাকিস্তান।
দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, আদালতের সর্বসম্মত রায় ভারতের ‘অবৈধ’ভাবে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তিনি বলেন, চুক্তিটি দুই দেশের জন্য এখনো পুরোপুরি কার্যকর ও বাধ্যতামূলক। ভারতকে চুক্তির সব বাধ্যবাধকতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে।
রায় মানছে না ভারত
তবে রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আদালটিকে ‘অবৈধভাবে গঠিত’ বলে অভিহিত করেছে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, পাকিস্তান আন্তঃসীমান্ত হামলায় সমর্থন ‘বিশ্বাসযোগ্য ও অপরিবর্তনীয়ভাবে’ বন্ধ না করা পর্যন্ত চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে।
রায় বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের অবস্থান শক্তিশালী করলেও ভারতকে তা মানতে বাধ্য করার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ আহমার বিলাল সুফির মতে, রায়টি শুধু ঘোষণামূলক নয়। এর ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে প্রয়োজনে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি সুযোগ পাকিস্তানের সামনে তৈরি হয়েছে।
লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক সিকান্দার আহমেদ শাহও মনে করেন, শুনানিতে ভারতের অনুপস্থিতি রায়ের গুরুত্ব কমায়নি।
তবে বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেছেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আদেশের মতো PCA-এর রায় বাস্তবায়নের কোনো সরাসরি আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।
কী চায় পাকিস্তান
পাকিস্তান এখন দুই দেশের মধ্যে সিন্ধু পানি কমিশনের কার্যক্রম পুনরায় চালুর দাবি জানাচ্ছে।
২০২২ সালের মে মাসের পর থেকে পার্মানেন্ট ইন্ডাস কমিশনের কোনো বৈঠক হয়নি। পাকিস্তানের অভিযোগ, ২০২৩ সাল থেকে ভারত নিয়মিত নদীর পানিপ্রবাহের তথ্য দেওয়া এবং চুক্তির আওতায় প্রয়োজনীয় স্থাপনা পরিদর্শনও বন্ধ করে দিয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার দুই দেশের মধ্যে কারিগরি সংলাপ, স্বচ্ছতা ও তথ্য বিনিময় পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন।
পানিকে ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে দুই দেশের উত্তেজনা সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেড়েছে।
পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বিষয়টিকে দেশটির নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য দিচ্ছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গত ১৩ আগস্ট সতর্ক করে বলেন, ‘পাকিস্তানের পানির প্রতিটি ফোঁটা আমাদের লাল রেখা।’
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের পানি বা সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ভারত কোনো পদক্ষেপ নিলে ২০২৫ সালের মে মাসের সংঘাতের চেয়েও শক্তিশালী জবাব দেওয়া হবে।
তবে জলবিদ্যা ও পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ হাসান আব্বাস মনে করেন, এই মুহূর্তে চুক্তির অচলাবস্থা পাকিস্তানের জন্য তাৎক্ষণিক অস্তিত্বগত হুমকি তৈরি করেনি।
তার মতে, পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলো মূলত চুক্তির কারণে নয়, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই পাকিস্তানের জন্য তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত।
তিনি বলেন, চেনাব নদীতে ভারতের পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা পাকিস্তানের মৌসুমি সেচের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ফলে ভারত পানি প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করলে শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদেরই সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
তবে পাকিস্তানের পানি ব্যবস্থাপনাতেও দুর্বলতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, নতুন বড় বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি সেচব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি। এতে নতুন জলাধার নির্মাণের চেয়েও বেশি পানি সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা