পাখির কিচিরমিচির কলতানে এক সময় গ্রাম বাংলার মানুষের ঘুম ভাঙতো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই গ্রামের বাগানগুলোতে পাখির কলতানে মুখরিত হতো। দেশের গ্রাম বাংলায় শ্যামল প্রকৃতিতে হরেক রকম পাখির উপস্থিতি আরো মনোরম করে তুলতো বৃহত্তর কুষ্টিয়ার গ্রাম বাংলাকে। স্থায়ী বসবাসকারী পাখি আর মৌসুমী অতিথি ২২১ প্রজাতির পাখি যোগ হয় পাখিদের কাঁতারে। এদের মধ্যে যেসব পাখির নাম আমরা সর্বাধিক শুনেছি এবং দেখেছি গ্রাম বাংলায় অবাধ বিচরণ করতে।

তাদের মধ্যে দোয়েল, শ্যামা, ময়না, টিয়া, শালিক, কোকিল, পেঁচা, চড়ুই, মাছরাঙা, ঘুঘু, পাপিয়া, ময়ুর, সারস, ডাহুক, চিল, ঈগল, শকুন, পানকৌড়ি, কাঠঠোকরা, বুলবুলি, চাতক, বাবুই, বক, বউ কথা কও, হলুদিয়া, কানা কুকো, টুনটুনি, ফিঙে, পায়রাসহ নানা প্রজাতির পাখি।

বর্তমানে অনেক প্রজাতির পাখি হারিয়ে যাচ্ছে নানাবিধ কারণে। এর মধ্যে মানুষের সৃষ্ট কারণসমূহই প্রধান। জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বনাঞ্চল। পাখিরা হারাচ্ছে তাদের আবাসস্থল। নদী পৃষ্ঠের লবণাক্ততা ও কীটনাশকের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় পাখির খাদ্য সংকটের পাশাপাশি নদী অঞ্চলে লবণাক্ত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।

অধিক ফলনের আশায় কৃষক জমিতে অধিক মাত্রায় কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করার ফলে পরিবেশগত বিপর্যয়ের ফলে পাখি তার প্রজনন ক্ষমতা হারাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পাখির সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে, অপরদিকে বহু প্রজাতির পাখি বিলুপ্তির পথে। মানিকজোর, সবুজ ঘুঘু, হারগিলা, শঙ্খচিল, ভুবনচিল, মদনটাক, ময়ূর, ঈগল, শকুন, বক,বাদুর বিলুপ্তির পথে রয়েছে।

এ দেশে শকুনের যেকটি প্রজাতি আছে, তার মধ্যে বাংলা শকুন ছাড়া বাকি সব জাতের শকুন হারিয়ে গেছে। শকুনের খাবার ও আবাসস্থল নেই। যার ফলে বাংলা শুকুন হারিয়ে যাচ্ছে। শকুনরা সাধারণত পুরোনো বড় গাছে বাসা বাঁধে এবং ডিম পাড়ে। পুরোনো বড় বড় গাছ নিধন করে ফেলায় পরিবেশের বন্ধু শকুন হারিয়ে গেছে।

দেশে ৪৩ প্রজাতির চিল, বাজ, ঈগল ও শকুন পাখি দেখা যেতো। এরা খাবার হিসাবে ইঁদুর, মাছ, ব্যাঙ, ছোট সাপ, পোকামাকড় পছন্দ করে। নদী-নালা ও জলাশয়ের পাশের বড় গাছে বসবাস করত এরা। নদী-নালা ও জলাশয়ের দূষণের ফলে বিপন্ন হয়ে পড়েছে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাসের শঙ্খচিল।

বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় যত ধরনের ঘুঘু দেখা যায়, তার মধ্যে সবুজ ঘুঘু সবচেয়ে সুন্দর। ছায়াঘেরা বনের নির্জনে খুব সকালে ও শেষ বিকেলে এরা খাবার খুঁজে বেড়াতো যা দেখতে খুব ভালো লাগতো। বাকি সময় বৃক্ষের ডালে বসে সময় কাটাতো। জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনে এখন ঘুঘুর বিচরণ চোখে পড়ে না । গ্রামীণ জনপদে ঘুঘু দেখা গেলেও সবুজ ঘুঘুর দেখা মেলে না। যাও দেখা যায় শিকারীদের কারণে তা মারা পড়ছে প্রতিদিনই।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষন আইনে বাংলাদেশে পাখি শিকার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হলেও প্রচলিত আইনকে উপেক্ষা করে কিছু অসাধু ব্যক্তি পাখি শিকার করেও পাখিকে খাঁচায় বন্দী করে ব্যবসা করে যাচ্ছে।

পাখি শিকারী আইন থাকলেও এর নেই কোন প্রয়োগ ফলে পাখি শিকারীরা নির্বিঘ্নে পাখি শিকার করে চলেছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের উদাসীনতায় পাখি শিকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। শিকারীরা ইয়ারগান দিয়ে জেলার হাওড় বাওড় খাল বিলে অবস্থানরত অতিথি পাখিসহ বিভিন্ন পাখি নির্বিঘ্নে মেরে ফেলছে। জেলার নদ-নদী ও বন জঙ্গলে অতিথি পাখির যখন আগমন হতে শুরু করে ঠিক সেই সময়ই পাখি শিকারীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রতিদিনই বিভিন্নভাবে পাখি ধরে জেলার বাবর আলী গেটসহ বিভিন্ন হাট বাজারে বিক্রি করছে। বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় বিলুপ্তির পথে বহু প্রজাতির পাখি। পাখি শিকারী বন্ধে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে কুষ্টিয়ার পাখিপ্রেমীসহ জেলার সুশীল সমাজ।