মাধবদী (নরসিংদী) সংবাদদাতা:

তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে নরসিংদীর মাধবদীসহ পুরো জেলায় তিন শতাধিক শিল্প কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং গত এক মাসে প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাপড় পচে নষ্ট হয়েছে। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ কাপড় জোগান দেওয়া এই শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় ডাইং, প্রিন্টিং ও সাইজিং কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত পড়েছে। এর মধ্যে গত দুই দিনে শতাধিক কারখানায় পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্পমালিকরা।

গ্যাসের সংকটে নরসিংদীর ছোটÑবড় শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বসে বসে সময় কাটাতে হচ্ছে। এদিকে বাসাবাড়িতেও চুলা জ্বলছে না। সিএনজি পাম্পেও দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি।

বন্ধ ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং কারখানাগুলোতে পচে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার কেমিক্যাল মিশ্রিত কাপড়। কারখানা মালিকদের দাবি, গত এক মাসে এ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

সরেজমিনে মাধবদীর বিভিন্ন ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং ও সাইজিং কারখানাগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে গ্যাসের সংকটে শাড়ি, থ্রি পিস, গজ কাপড়, বেডশিটের কাপড়গুলো পঁচে নষ্ট হচ্ছে। পানিতে ভেজানো উৎপাদনের জন্য কেমিক্যাল দিয়ে প্রসেসিং করা গ্রে কাপড়গুলো ফ্লোরের মধ্যে পচে নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

এসময় বিভিন্ন কারখানার কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কেমিক্যাল দিয়ে গ্রে কাপড় প্রসেসিং করলে ১৬ ঘণ্টার মধ্যেই প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়। কোনো কোনো কারখানায় তিন থেকে চার দিন ধরে গ্যাসের চাপ শূন্য পিএসআই থাকায় মেশিনগুলো একেবারেই বন্ধ হয়ে আছে। ফলে কেমিক্যাল দিয়ে ভেজানো কোটি কোটি টাকার কাপড়গুলো পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে, বাড়ছে কাপড়ের দাম, অন্যদিকে রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে।

মাধবদী তিথি টেক্সটাইলের প্রোডাকশন ম্যানেজার বলেন, দুই থেকে আড়াই লক্ষ গজ কাপড় বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে ভেজানো আছে প্রসেসিং করার জন্য। এগুলো ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। তারপর আমাদের বিভিন্ন দেশের বায়াররা (ক্রেতা) অলরেডি অর্ডার বাতিল করে দিচ্ছে। এদিকে কারখানার শ্রমিকদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে, বেতন দিতে পারছি না। সব মিলিয়ে অবস্থা খুবই খারাপ যাচ্ছে। সরকারের কাছে অনুরোধ গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে যেন কাপড় শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখে।

তিথি টেক্সটাইলের মেইনটেন্যান্স ম্যানেজার বলেন, গত ৪ দিন ধরে আমাদের গ্যাসের চাপ জিরো হয়ে গেছে। আমাদের জেনারেটর পাওয়ার পুরোটাই লকডাউন হয়ে গেছে। গ্যাস শূন্যতার কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। দুই থেকে তিন লক্ষ গজ কাপড় ড্যামেজ হয়ে গেছে, এগুলো আর কোনো কাজেই আসবে না। এসব কাপড়ের ক্ষতিপূরণ বায়ারদের দিতে হবে। শ্রমিক-কর্মচারীরাও অলস সময় পার করছে। তারা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। মালিকরাও লক্ষ লক্ষ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন প্রতিদিন। এভাবে গ্যাস শূন্য রাখলে এ শিল্প জগৎ একটা হুমকির মধ্যে পড়বে। আমরা অতি দ্রুত তিতাস কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে এ কারখানাগুলো যাতে সচল করে।

গ্যাসের অভাবে কারখানার মেশিন চালানো যাচ্ছে না। ফলে অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এতে একদিকে শ্রমিকদের আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে কারখানার মালিকরাও বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

শিল্পমালিকরা জানান, আগে থেকেই নরসিংদীতে গ্যাসের চাপ কম ছিল। তখন কম চাপের মধ্যেও পালাক্রমে কারখানা চালিয়ে উৎপাদন চালু রাখা হতো। কিন্তু গত এক সপ্তাহে গ্যাসের চাপ আরও কমে গেছে। কোনো কোনো সময় চাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসছে। স্বাভাবিক সময়ে শিল্পকারখানায় প্রায় ১৫ পিএসআই চাপের গ্যাস পাওয়ার কথা। কিন্তু কিছুদিন ধরে তা ২ থেকে ৪ পিএসআইয়ে নেমে এসেছিল। এখন অনেক সময় চাপ শূন্যের কাছাকাছি চলে যাওয়ায় কারখানার মেশিন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত এক মাসে সীমিত গ্যাস ও বিকল্প ব্যবস্থায় অনেক কারখানা মাত্র ১০ শতাংশের মতো উৎপাদন চালাতে পেরেছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ায় এখন অনেক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

নরসিংদী শহর ও আশপাশের এলাকায় চিশতিয়া সাইজিং মিল, ইয়ামিন সাইজিং মিল, মোমিন সাইজিং মিল, হোসাইন ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং মিল, আবেদ টেক্সটাইল মিলস, শিল্পী ডাইং, নদী-বাংলা সাইজিং মিল, ভূইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস, আনোয়ার প্রিন্টটেক্স, রংধনু সাইজিং মিল, এন আহমেদ ডাইং ও নাসির ডাইংসহ বেশ কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

মাধবদীতেও আমানত শাহ গ্রুপ ও পাকিজা গ্রুপের কয়েকটি কারখানা এবং জে এন্ড জে সাইজিং, এমএমকে ডাইং, মুক্তাদিন ডাইং, মাধবদী ডাইং, মুক্তা ডাইং ও মা সখিনা ডাইংসহ কয়েকটি কারখানা বন্ধ রয়েছে।

নরসিংদী টেক্সটাইল, ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নিজাম উদ্দিন ভূইয়া বলেন, নরসিংদী দেশের কাপড়ের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করে। গ্যাস সংকটে জেলার অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সংকট দীর্ঘ হলে শ্রমিকদের বেতনসহ কারখানার বিভিন্ন খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।

নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রাশেদুল হাসান রিন্টুর দাবি, ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় উৎপাদন শুরু হওয়ায় গ্যাস সংকট আরও বেড়েছে। শিল্পকারখানার জন্য বরাদ্দ গ্যাসের একটি অংশ সার কারখানায় যাওয়ায় স্থানীয় শিল্পগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না।

উৎপাদন বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন শ্রমিকরা। নিয়মিত কাজ না থাকায় অনেক শ্রমিক কারখানায় এসে বসে থাকছেন। কেউ কেউ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করলেও আগের মতো আয় করতে পারছেন না।

এক শ্রমিক বলেন, কারখানায় কাজ বন্ধ থাকায় নিয়মিত আয় হচ্ছে না। এতে সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে কারখানা চালুর দাবি জানান তিনি।

শিল্পমালিকরা বলছেন, সংকট দীর্ঘ হলে শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও বিভিন্ন বিল পরিশোধ করা কঠিন হবে। এতে শ্রমিক অসন্তোষের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

নরসিংদীতে তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক বিপণন কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘নরসিংদীতে গ্যাসের চাপ নেই বললেই চলে। যেটুকু পাচ্ছি তার পুরোটাই ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। গ্যাসের প্রেশার না পাওয়া গেলে এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়।’