শিল্পে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারের পরামর্শ
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ কমে অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও ভারসাম্য সৃষ্টি করা গিয়েছিল। কিন্তু সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যে পুনরায় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পণ্য আমদানি কমিয়ে শিল্পের জন্য স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও রফতানি আয় স্থবির থাকায় বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে। এই সময়ে মোট আমদানি ব্যয় ছিল ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার এবং রফতানি আয় ছিল ৪৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এর মূল কারণ হিসেবে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্প উপকরণের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারদরকে দায়ী করা হয়েছে। এসময় রফতানি আয় দাঁড়ায় ৪৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ০.২ শতাংশ কম। এর প্রধান কারণ হিসেবে পোশাক খাতে শুল্ক জটিলতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক চাহিদার মন্থরগতির কথা বলা হয়েছে। সবমিলিয়ে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের তুলনায় এই ঘাটতি প্রায় ৩৩ থেকে ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই ঘাটতি মোকাবিলায় রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বড় ভূমিকা রেখেছে।
পূর্ববর্তী বছরের পরিস্থিতি
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে যে ভারসাম্যহীনতা বিরাজ করছিল সেটি পূর্ববর্তী তথা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে আসার কথা জানা যায়। দেশে পণ্য আমদানির পরিমাণ হ্রাস পাওয়া এবং পণ্য রফতানি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে আশা করা হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য কম এবং রফতানিকৃত পণ্যের মূল্য বেশি দেখা গেলে সেক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসছে বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো, এনবিআরসহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য ছিল ৬ হাজার ৫১৪ কোটি মার্কিন ডলার। এটি পূর্ববর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়ে ৭ শতাংশ কম। বিপরীতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি বাবদ আয় দাঁড়ায় ৪৮ হাজার ২৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের রফতানি পণ্যের মূল্য ছিল ৪৫ হাজার ৬৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রবৃদ্ধি ঘটে ৮ দশমক ৫৮ শতাংশ। এছাড়াও ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের জুলাই-আগস্ট সময়ের পণ্য খাতের অর্জিত রফতানি আয় দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা বিগত ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৬১ ভাগ বেশি।
তবে পরিমাণের দিক থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি বেড়েছে। সব মিলিয়ে সোয়া ১৪ কোটি টন পণ্য আমদানি হয়েছে, যা এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১৩ কোটি ৭৬ লাখ টনের চেয়ে ৪ শতাংশ বেশি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন ৫০টি শুল্ক স্টেশনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খালাস হওয়া পণ্যের তথ্য পর্যালোচনা করে আমদানির এই চিত্র পাওয়া যায়। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল, দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ দেশে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয়- এরকম অনেক পণ্য আমদানি হয়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতির কারণ ও প্রতিকার
দেশের বাণিজ্য ঘাটতির প্রধান কারণগুলোর অন্যতম হলো জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এছাড়াও অতিরিক্ত পণ্য আমদানি, দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া এবং বৈদেশিক কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও এর অন্যতম কারণ। এছাড়াও জাতীয় চাহিদার তুলনায় বিদেশ থেকে বেশি পরিমাণ ভোগ্যপণ্য, যন্ত্রপাতি ও জ্বালানি ক্রয় করা আরেকটি কারণ। বৈশ্বিক বাজারে দেশীয় পণ্যের চাহিদা বা প্রতিযোগিতার ক্ষমতা কমে যায়। বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরতাও আরেকটি কারণ। শিল্প কারখানার জন্য বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করায় বাণিজ্যে চাপ পড়ে। এসব কারণে দেশীয় মুদ্রার মান কমে গেলে আমদানি খরচও বৃদ্ধি পায়।
এই পরিস্থিতির উন্নয়ন করতে রফতানি আয় বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে পণ্যের বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে আমদানি ও রফতানির ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। রফতানি খাতকে বহুমুখী করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। তৈরি পোশাক খাতের মতো শুধু একটি বা দুটি খাতের ওপর নির্ভর না করে কৃষিপণ্য, চামড়া, আইসিটি, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের রফতানি বাড়াতে হবে। আমদানি নিয়ন্ত্রণে বিলাসবহুল ও অ-জরুরি পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করতে উচ্চ শুল্ক বা কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে। সেই সঙ্গে দেশীয় বিকল্প পণ্য উৎপাদনে জোর দিতে হবে। উৎপাদন খরচ কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। বন্দর ও লজিস্টিক অবকাঠামোর উন্নয়ন করে এবং সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনার খরচ ও সময় কমাতে হবে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের উপরেও গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা দেশের অভ্যন্তরে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ালে তা স্থানীয় উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমায়। এছাড়াও অশুল্ক বাধা দূর করার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করতে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।