- আরএলএনজি সরবরাহ ৪৫০ এমএমসিএফডি হ্রাস
- গৃহস্থালির পাশাপাশি ফিলিং স্টেশনেও গ্যাস নিয়ে হাহাকার
আরও তীব্র হয়েছে গ্যাস সংকট। কয়েকদিন ধরেই রাজধানীসহ অনেক জেলায় বেড়েছে ভোগান্তি। গৃহস্থালির পাশাপাশি ফিলিং স্টেশনেও গ্যাস নিয়ে হাহাকার। তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা। এদিকে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে শুক্রবার আংশিক সরবরাহ শুরু হলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে সংকট কেটে যাবে বলে আশা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ।
গতকাল মঙ্গলবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দেশে চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মহেশখালীতে ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের কাজ চলায় দেশজুড়ে যে সরবরাহ বিভ্রাট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সমর্থন প্রত্যাশা করেছেন তিনি।
জানা গেছে, এক সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকটে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন রাজধানীসহ আশেপাশের অনেক জেলার বাসিন্দারা। ভোর থেকে মধ্যরাত অবধি গ্যাস না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে গৃহস্থালি কাজ। ফিলিং স্টেশনেও গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে যানবাহন চালকদের। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, কেরানীগঞ্জসহ বেশকিছু এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকট চরমে পৌঁছেছে। ভোর থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত তীব্র থাকে এ সংকট। গ্যাসের চাপ কম থাকায় রান্না হয় এক চুলা জ্বালিয়ে।
ভুক্তভোগীরা জানান, দুপর ১২টা পর্যন্ত গ্যাস খুব কম থাকে, যেটা দিয়ে কখনো কখনো এক চুলাতেও রান্না সম্ভব হয় না। এদিকে সকাল থেকে ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা গেছে যানবাহনগুলোকে। কয়েকটিতে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ফিলিং স্টেশন।
জানা গেছে, গ্যাস সংকটে সিএনজিচালিত পরিবহণ খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চালকরা জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে চাহিদার মাত্র অর্ধেক গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। গ্যাসের অভাবে ভাড়ার গাড়ি চালাতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।
মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনাল থেকে আগামী শুক্রবার আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে। পুরো চালু হতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে। এদিকে বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস সংকট কেটে যাবে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক ও স্থাপনা প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন,আমাদের কিছু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বাইরে থেকে বুধবারের মধ্যে আসার কথা রয়েছে। সেগুলো আসলে আশা করছি, আগামী শুক্রবারের মধ্যে আমরা একটা রেজাল্ট পাবো।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘দুর্ঘটনাটা আরও বড় হতে পারতো। সে সময় একটা কার্গোও কিন্তু কাছাকাছি ছিলো। খুব দ্রুত সময়ে আমরা ওই কার্গোটা সরিয়ে দিতে পেরেছি। আমরা মনে করছি, আগামী সপ্তাহে যদি, ৫০ শতাংশ সাপ্লাই রি-স্টোর করতে পারি, তাহলে এর পরের সপ্তাহেই ১০০ ভাগ রি-স্টোর করতে পারব।’
জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসিক, শিল্প ও সিএনজিচালিত যানবাহনের জন্য তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েকদিন ধরে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বাসাবাড়িতে রান্নার কাজ ব্যাহত, শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমেছে এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।’ মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে এমন চিত্র লক্ষ্য করা গেছে ।
এসব এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে অনেক বাসায় চুলা জ্বালানোই সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও কোথাও গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও সেই চাপ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা যাচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। এতে মাসিক খরচও বেড়ে গেছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, আগে যেখানে আধা ঘণ্টায় রান্না শেষ হতো, এখন একই কাজ করতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগছে। সকালে সন্তানদের স্কুলে পাঠানো কিংবা কর্মজীবী সদস্যদের জন্য সময়মতো খাবার প্রস্তুত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছে।
জানা গেছে , গ্যাস সংকটের বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্প খাতেও। গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন কারখানায় প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় বয়লার ও উৎপাদন যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন লাইন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। শিল্প মালিকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় এ অবস্থা চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, সময়মতো ক্রেতার কাছে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হবে এবং রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে অনেক স্টেশনে পর্যাপ্ত সরবরাহ মিলছে না। ফলে স্টেশনগুলোর সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। অনেক চালক কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস নিতে পারছেন না। এতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের দৈনিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেকেই পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্মঘণ্টা শেষ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
দেশের চলমান গ্যাস সংকট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে আগুন লাগার কারণে এলএনজি খালাস ব্যাহত হয়েছে। এতে দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে এবং সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামতের কাজ চলছে। তবে মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এলএনজি কার্গো খালাস সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রান্নার গ্যাসের চাপ কমে গেছে। পাশাপাশি গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায়ও সমস্যা দেখা দিয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতার আশ্বাস
বাংলাদেশে চলমান গ্যাস সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। এমন আশ্বাস দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে এ আশ্বাস দেন তিনি। পরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে এ তথ্য জানান আনোয়ার ইব্রাহিম।
পোস্টে আনোয়ার ইব্রাহিম লিখেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছি। আমাদের আলোচনায় মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও বিনিয়োগ খাতে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতা নিয়ে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে গ্যাস সরবরাহে যে সংকটের মুখোমুখি। সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার সহায়তা চেয়েছেন। এর মধ্যে পেট্রোনাসের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহে বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশের জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণে সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
তিনি লিখেছেন, আমরা অর্থনৈতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদারের বিষয়েও আলোচনা করেছি। যা উভয় দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।
তিনি আরও লিখেছেন, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পারস্পরিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দুই দেশের জনগণের কল্যাণে আমরা একসঙ্গে কাজ করে যেতে চাই।
তীব্র গ্যাস সংকটের সতর্কতা তিতাসের
মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনালগুলোর কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে পুনঃগ্যাসীকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (আরএলএনজি) সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) কমে গেছে। ফলে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাস গ্যাসের আওতাধীন সব শ্রেণির গ্রাহককে তীব্র গ্যাসের স্বল্পচাপের ভোগান্তি পোহাতে হবে বলে জানিয়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির জনসংযোগ কর্মকর্তা আল আমিন পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মহেশখালীস্থ এলএনজি টার্মিনালসমূহে কারিগরি ত্রুটির কারণে আরএলএনজি সরবরাহ প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাস গ্যাসের অধিভুক্ত এলাকায় আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, বিদ্যুৎসহ সব শ্রেণির গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ বিরাজ করবে।