কামাল উদ্দিন সুমন: গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সংকটে ভুগছে দেশের গ্যাসনির্ভর ছোট-বড় সব কারখানা। ইতিমধ্যে তৈরি পোশাক কারখানা, নিত্যপণ্যসহ ওষুধ, সিরামিক, ইস্পাতসহ গ্যাসনির্ভর প্রায় সব কারখানায় উৎপাদন কমেছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী , সাভার ও চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ এলাকার কারখানাগুলো। ওষুধ, ইস্পাত, হিমাগার খাতের কিছু কারখানা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রেখেছে। এতে তাদের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
গতকাল শনিবার নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও খুলনা এলাকায় বিভিন্ন শিল্পকারখানার তথ্য দিয়ে জানা গেছে, দেশের বেশির ভাগ উৎপাদনমুখী বড় শিল্পকারখানা এসব এলাকায় অবস্থিত। সংকটের কারনে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে কারখানা। বিকেএমইএ সম্প্রতি সাংবাদিক সম্মেলন করে ৩শ কারখানা বন্ধ হওয়ার কথা জানিয়েছে। অপরদিকে বিজিএমইএ বলছে এমন সংকটে শিল্পকারখানা চালু রাখা খুবই কঠিন।
শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে প্রায় ২ মাস ধরে গ্যাসের বেশি সরবরাহ সংকট রয়েছে। এর মধ্যে কয়েক সপ্তাহে এই সংকট তীব্র হয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রেখে বসে থাকতে হচ্ছে।
জানা গেছে, গ্যাস সংকটের কারণে গত এক সপ্তাহে শত শত কারখানার উৎপাদন ঠিকমত হচ্ছেনা। এর মধ্যে বড় একটি অংশ নিত্যপণ্যের কারখানা। কারখানার মধ্যে বড় শিল্পগোষ্ঠীর কারখানাই অর্ধশতাধিক। এ ছাড়া বন্ধ না হলেও উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন কমেছে দেড় শতাধিক কারখানায়।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন আরও ব্যাহত হতে পারে। একদিকে বিদ্যুতের সমস্যা ভোগাচ্ছে। আবার যেসব কারখানায় জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো, গ্যাস না থাকায় এখন সেই জেনারেটরও চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার গ্যাস না থাকায় বয়লারনির্ভর কারখানায় উৎপাদন একেবারেই কমে গেছে। সব মিলিয়ে আমাদের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি মুখে পড়তে হচ্ছে।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম এলাকায় চিনি, গম, ভোজ্যতেল ও ডালসহ নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতের শতাধিক কারখানা রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক কারখানাই সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে। যেগুলো চালু রয়েছে, তারাও সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করতে পারছে।
দেশের আরেক শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী এসিআই লিমিটেডের বিভিন্ন কারখানায় সামগ্রিক উৎপাদন কমেছে। ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের বেশ কয়েকটি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে লবণ কারখানা, বন্দর এলাকায় আটা-ময়দা ও ওষুধ তৈরির কারখানা এবং গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও টঙ্গীতে ন্যাপকিন, ডায়াপার, বিভিন্ন কৃষি উপকরণ, মোটরসাইকেল সংযোজন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তৈরি করে কোম্পানিটি। সব কারখানাতেই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে।
গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধের প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে। উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতির কারণে পাইকারি বাজারে চিনির দাম কেজিতে বেড়েছে ৭ টাকা। কমেছে ভোজ্যতেল উৎপাদনও।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রেশনিং চালু :
উৎপাদন অনেকাংশে বন্ধ থাকায় বাজার সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, বাজারে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তাঁরা এখন গুদামে থাকা মজুত পণ্য ব্যবহার করছেন। সংকট কত দিন চলবে, তা নিশ্চিত না থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেকে ‘রেশনিং’ পদ্ধতিতে পণ্য সরবরাহ করছে। তবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাজারে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি হতে পারে। গ্যাস সংকটে সিরামিক খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি গুলোতে উৎপাদন কমেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানার উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে।’
জানা গেছে, ইস্পাত বা রড উৎপাদনকারী কারখানায়ও গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সংকটে রয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে আমরা ডিজেল ব্যবহার করে বিকল্প উপায়ে কোনোরকমে উৎপাদন সচল রেখেছি। তাও উৎপাদন হচ্ছে সক্ষমতার অর্ধেকের কম। ডিজেল ব্যবহারের কারণে উৎপাদন খরচ বেশি পড়ছে। তারপরও পরিবেশকদের চাহিদার কারণে কারখানা সচল রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম ইপিজেডে চাহিদার অর্ধেক গ্যাস :
চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় গ্যাসের সংকট এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যার কারণে অন্তত ৩৫টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে চারটি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ এবং ১০ থেকে ১২টি কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) অবস্থিত কারখানাগুলোর জন্য ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১৫ থেকে ১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে এর অর্ধেক।
ধুকছে নরসিংদীর শিল্পকারখানা :
জানা গেছে, সারা দেশে স্থানীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান আসে নরসিংদী জেলা থেকে। জেলায় টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলের সংখ্যা সব মিলিয়ে তিন হাজারের বেশি। তীব্র গ্যাস সংকটে নরসিংদীর শিল্পকারখানাগুলো এখন স্থবির। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ৯০ শতাংশ কারখানা এখন পুরোপুরি বন্ধ। কারখানাগুলোর গড় উৎপাদন ১০ শতাংশে নেমেছে।
দেশে চলমান গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পরেছে সাভারের বিভিন্ন শিল্পকারখানায়। সাভার উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী ধামরাই উপজেলা আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ ১–এর এর আওতাধীন। এ দুটি উপজেলায় ১ হাজার ৭০৫টি শিল্পকারখানা রয়েছে। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ বলেছে, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি। ৪-৫টি কারখানায় উৎপাদন বেশি ব্যাহত হওয়ার মাঝেমধ্যে তাঁরা ছুটি ঘোষণা করলেও পরে আবার চালু করছেন।
দেশের হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ খুলনা অঞ্চলের কারখানাগুলো থেকে হয়ে থাকে। বর্তমানে চিংড়ির ভরা মৌসুম চলছে। লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছে খুলনা অঞ্চলের মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো। বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালিয়ে হিমাগারে চিংড়ি সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এতে কারখানাগুলোর উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ৩০০ কোটি ঘনফুট হলেও মোটামুটি সব খাতে সরবরাহ ধরে রাখা যায়। যদিও স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করে রেশনিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে এখনো দিনে ২৬ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে। এক্সিলারেট টার্মিনাল থেকে পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে সেই ঘাটতি পূরণ হতে পারে।
বন্ধ কলকারখানা চালু করতে ৪১ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা :
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কলকারখানা চালু, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্থবির অর্থনীতিকে সচল করতে গত ২৩ মে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বন্ধ কলকারখানা চালু এবং স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অংশ হিসেবে ১৭টি ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
প্রণোদনা প্যাকেজে অর্থ দিতে সম্মত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, ব্র্যাক, সিটি, যমুনা, ডাচ্-বাংলা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, উত্তরা, প্রাইম, ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি, পূবালী, ইস্টার্ন, মার্কেন্টাইল, ট্রাস্ট ও সাউথইস্ট ব্যাংক। সম্প্রতি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কলকারখানা চালু, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্থবির অর্থনীতিকে সচল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বন্ধ কারখানা চালু, ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
বিকেএমইর দাবি ৩০০টিরও বেশি কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ :
চলমান ভয়াবহ গ্যাস সংকট দেশের শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যাহত, কারখানার সক্ষমতা হ্রাস এবং রপ্তানি কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। গত প্রায় এক মাস ধরে চলমান গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। একপর্যায়ে ৩০০টিরও বেশি কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। রপ্তানি ক্ষতির আশঙ্কায় সরকারের কাছে ৬ দফা দাবিও জানিয়েছে বিকেএমই। এ বিষয়ে সম্প্রতি সাংবাদিক সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় বিকেএমইএ ভবনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা উক্ত তথ্যগুলো জানিয়েছেন।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত মাসের(জুলাই) ২০ তারিখ থেকে দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় ১০ তারিখ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা নির্ধারিত সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিকেএমইএর সভাপতি বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মাসিক প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বিবেচনায় চলমান সংকটে প্রায় দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সংকটের পরোক্ষ ক্ষতি আরও ভয়াবহ। গ্যাস সংকটের কারণে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের শিল্পখাত নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু ক্রেতা অর্ডার প্রতিবেশী দেশগুলোয় সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অর্ডার বাতিল হয়ে অন্য দেশে চলে গেছে। আগামী মৌসুমের অর্ডারও সরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পোশাক মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, বর্তমানে খাতের গড় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে ৪০ শতাংশেরও বেশি। সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন তারা। তবে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি বলছেন, উৎপাদন কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি। দ্রুত সমস্যা সমাধান না করা গেলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি চাপে পড়বে দেশের অর্থনীতি।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘কিছু কিছু জায়গাতে প্রায় ৫০, ৬০, ৭০% ও প্রোডাকশন হ্যাম্পার হচ্ছে। আর ৩০-৪০% তো প্রায় সব ফ্যাক্টরিতেই আমার প্রোডাকশন কম আছে। এটার কারণে আমি সময়মত কাপড় পাচ্ছি না। সময়মত কাপড় না পাওয়াতে আমি বায়ারের সাথে কমিটমেন্ট ঠিক রাখতে পারতেছি না। ফলে বায়াররা আবার সেখানে গুডসগুলো আমাকে তখন এয়ার করতে বলছে, এবং এয়ার করা মানে তো একটা হিউজ লস।’
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ সক্ষমতা আছে দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তাহলে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি অন্তত এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট চাহিদার প্রায় ২৬ থেকে ২৯ শতাংশ। এই ঘাটতি নিশ্চিত করা হয় বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে।
বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ রয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জি এবং সামিট গ্রুপ পরিচালিত এই টার্মিনালগুলোর মাধ্যমেই বিদেশ থেকে আনা এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন বা রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। তবে গত ২১শে জুলাই আগুনে সেই এলএনজি টার্মিনালের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহে বিঘœ ঘটেছে এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শুরুতে এই সংকটকে সাময়িক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ত্রুটি চিহ্নিত করতে সময় বেশি লাগার কারণেই প্রেক্ষাপট আরও জটিল হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সংকট তীব্র হওয়ার পেছনে, এর পেছনে মূল কারণ ত্রুটিযুক্ত এফএসআরইউ না। বরং, সংকটের একটি বড় কারণ হলো দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সেই ঘাটতি পূরণে পর্যাপ্ত নতুন গ্যাসক্ষেত্র বা কূপ থেকে উৎপাদন যোগ না হওয়া। ফলে কয়েক বছর ধরেই বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও আবাসিক গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে।
আর দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি সামাল দিতে বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানি করে সেগুলো জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে হয়। অর্থাৎ, দেশের গ্যাস সরবরাহ এখন শুধু নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, আমদানি করা এলএনজিও গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ২০১৮ সাল থেকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ এলএনজি থেকে এবং বাকি ৭০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে আসছে। কিন্তু আমদানি করা এলএনজির খরচ দেশীয় গ্যাসের তুলনায় অনেক বেশি বলে জানান তিনি। বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। কিন্তু ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতা এখনও চলছে। তাই, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি আমদানি করার ক্ষেত্রেও একপ্রকার জটিলতা তৈরি হয়ে আছে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের হিসাবে, দেশীয় উৎস থেকে ৭০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহে বছরে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাকি ৩০ শতাংশ এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে এলএনজিনির্ভর সমাধান ব্যয়বহুল হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে আমদানি নির্ভরতাও বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
পরিস্থিতির উন্নতি হবে কবে?
চলমান জ্বালানি সংকট সমাধানে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করতেও দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগবে। ফলে এর আগে সমস্যার সমাধান হবে না।
মন্ত্রী জানান, সম্ভাব্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সরকার দ্রুত সেসব নিচ্ছে। দীর্ঘ সময় গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। এখন সেটা করা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজ হচ্ছে, কয়লা নিয়ে কাজ হচ্ছে। কোন ধরনের জ্বালানি কত পরিমাণ লাগবে, তা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
তার মতে, আমাদের এখানে আরও এলএনজি প্লান্টের কথা বলা হচ্ছে। এটি আরও দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি নির্ভরশীলতা বাড়াবে। কিন্তু এগুলোর বিকল্প হলো অভ্যন্তরীণ গ্যাস এক্সপ্লোরেশন। সরকার কয়লা এক্সপ্লোরেশনে যাওয়ার কথা বলছে, কিন্তু এটি সলিউশন না।”
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেছেন, বর্তমানে দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাত শুধু গ্যাস সংকটেই নয়, অর্থায়ন ও নিরাপত্তা সংকটেও রয়েছে। তার ভাষায়, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রেখেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন চললে কার্যকর মূলধন শেষ হয়ে যাবে এবং বহু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারবে না।
কেন বারবার এমন সংকট?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল সমস্যা শুধু একটি এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি নয়; বরং দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। গত কয়েক বছরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ছয় বছরে দেশীয় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেই ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। ফলে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যেকোনও একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই পুরো জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় কোনও অতিরিক্ত সক্ষমতা বা বিকল্প ব্যবস্থা নেই। তাই একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই শিল্প খাতসহ পুরো অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়ে।
অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প সক্ষমতা তৈরি না করলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে।
সরকারের পরিকল্পনা:
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি হলেও দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে নতুন গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং অতিরিক্ত এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।