কয়জনকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে কিংবা প্রয়োজনে দু-একটা লাশ ফেলে ছাত্রদল ক্যাম্পাসগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দিবাগত রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সারজিস আলম লিখেছেন, জন্মের পর থেকে অভ্যুত্থানের আগে পর্যন্ত ছাত্রদল যে রাজনীতি করে এসেছে, যে রাজনীতি দেখে এসেছে এবং যে রাজনীতির শিকার হয়েছে, তারা আজকে সেটাই করার চেষ্টা করেছে। এর বাইরে তাদের যাওয়ার সুযোগ কম। কারণ তাদের ভ্রাতৃসংগঠন থেকে শুরু করে মাতৃ সংগঠন, সবকিছুই এই ক্ষমতার অপব্যবহার আর পেশিশক্তি প্রদর্শন কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

অভ্যুত্থানের পর থেকে নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত কিছুটা লাগাম টানা থাকলেও এখন তারা হীনম্মন্যতায় ভুগছে। কারণ এতোবড় রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন হয়েও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনকভাবে হেরে যাওয়ার গ্লানি তাদের এখনো বইতে হচ্ছে। তারা সেটা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছটফট করছে। যখনই বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে ক্ষমতায় গেছে, তখনই যে কোনো মূল্যে তারা এই হীনম্মন্যতা থেকে মুক্তি পেতে চায়! সেই মুক্তি পেতে তারা পুরোনো পথকে বেছে নিয়েছে।

একদিকে ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতা, অন্যদিকে ক্ষমতার কাছে মাথা নত করা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। এ দুটিকে সামনে রেখে তারা তাদের ভাড়াটে ও নির্বোধ বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে জুবায়ের ও মোসাদ্দেকের ওপর হামলা করেছে, সাদিক কায়েমকে ভুয়া ভুয়া বলে স্লোগান দিয়েছে। এটা তাদের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু নয়। কিন্তু তাদের কে বোঝাবে—এই গায়ে হাত তোলা কিংবা বিব্রত করার স্লোগান দিয়ে সাময়িক আত্মতৃপ্তি পাওয়া গেলেও পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলা কিংবা বিজয়ীর মুকুট অর্জন করা কোনোদিন সম্ভব নয়।

ছাত্রদল একটা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে পড়েছে। জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ার পর তাদের নেতৃত্বে দেশ চলছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ নির্বাচনে এভাবে হেরে যাওয়ার পর ছাত্রদল এখনো ক্যাম্পাসের লিড নিতে পারছে না। ভাড়াটে লোক দিয়ে সংখ্যা বেশি দেখানো যায় কিন্তু মানসিক শান্তি পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ আর কেউ জানুক আর না জানুক তারা তো জানে, সেই পরাজয়ের গ্লানি এই সংখ্যা দিয়ে উপেক্ষা করা যায় না। তাই তারা কয়জনকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে কিংবা প্রয়োজনে দু-একটা লাশ ফেলে ক্যাম্পাসগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চায়! যার পরবর্তী ধাপটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ!

এই ত্রাসের রাজত্বের মধ্য দিয়ে তারা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো সেশনের শিক্ষার্থীদের হলে তুলবে, কৃত্রিম আবাসন সংকট তৈরি করবে, গণরুম কালচার ফিরিয়ে আনবে, গেস্টরুম করতে বাধ্য করবে এবং সেই কৃত্রিম সিট সংকটকে কাজে লাগিয়ে আবারও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাধ্যতামূলক দাসের রাজনীতি শুরু করবে।

তিক্ত সত্য এটাই যে, গণরুম-গেস্টরুম কালচার ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রদলের স্থায়ী রাজনীতির কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। যদি সিট সংকট না থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী তার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাগুলো রাজনীতি না করেই পায় তাহলে ৯৫ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে কখনও এই তথাকথিত রাজনীতিতে জড়াবে না। ফলে সামান্য কিছু শিক্ষার্থী দিয়ে পেশিশক্তির রাজনীতিতে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ থাকবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাতে!

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির মতো ক্ষমতাসীন দল কখনই তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরের কোনো অংশের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে চাইবে না। কারণ এটার সঙ্গে তাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত। আমি বিশ্বাস করি—ছাত্রদল তাদের হাইকমান্ডের নির্দেশেই এই কাজগুলো বিভিন্ন ক্যাম্পাসে করছে। পেশিশক্তি প্রদর্শন এবং অস্ত্রের ঝনঝনানির মাধ্যমে তারা ক্যাম্পাসে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে চায়, নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। কিন্তু আমি এটাও বিশ্বাস করি—দুর্ভাগ্যক্রমে সময়টা এখন আর ছাত্রদল কিংবা বিএনপির সেই পুরোনো কালচারের পক্ষে নেই। মানুষের আকাঙ্ক্ষার তীব্র একটা পরিবর্তন এসেছে। শ্রমিক থেকে করপোরেট কিংবা শিক্ষার্থী থেকে অভিভাবক প্রতিটি ক্ষেত্রে একটা মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটে গিয়েছে।

চাঁদাবাজি ছাড়া বিএনপির রাজনীতি চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়—এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি চাঁদাবাজি করেও আগামীর রাজনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়, এটাও সত্য। বিএনপিকে ঠিক করতে হবে তারা কোন পথ বেছে নেবে। নিশ্চয়ই পুরোনো পথে পতন অনিবার্য।