আত্মগোপনে থাকা নেতারা প্রবাসে হঠাৎ সরব
কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের বিদেশে পলাতক নেতারা নানাভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য বিদেশে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা।
গেল ৫ আগস্ট ভারতের নতুন দিল্লিতে সাউথ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে কথা বলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও ওই সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি প্রকাশ্যে দেখা দেন নি। ওই সাংবাদিক সম্মেলনে ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং বর্তমান সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন হাসিনা।
এরপর থেকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্মসম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, হাছান মাহমুদসহ শ, ম, রেজাউল করিম, মোফাজ্জল হোসেন চৌধূরী মায়া, নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান, নওফেলসহ অনেক শীর্ষ নেতা একের পর এক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। বিশেষ করে সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে তারা এদেশে লুকিয়ে থাকা আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের উস্কানি দেয়ার চেষ্টা করছেন। এতেই বুঝা যায় দেশে অস্থিরতার পায়তারা করছে পলাতক আওয়ামীলীগ নেতারা।
বেলজিয়ামে বসে বিডি এশিয়া নামে একটি অনলাইনে এসে ড. হাছান মাহমুদ হুঙ্কার দিয়ে বলেন, পুলিশ হত্যার ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। আমরা ক্ষমতায় ছিলাম। আমাদের দায় আছে। কিন্তু পুলিশের উপর হামলা হলে তারা কি বসে থাকবে তারা প্রতিকার করবে না?
সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকায় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার পর দলের ভেতরের এই অন্তর্দ্বন্দ্ব ও ক্ষোভের আগুন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ওই সাক্ষাৎকারে নানক অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী সুরে দাবি করেছেন যে, হাসিনার আগে তিনিই দেশে ফিরবেন এবং চরম প্রতিশোধ নেবেন। নানকের এই ফাঁকা আস্ফালন ও বুক ফুলিয়ে মিডিয়ায় বক্তব্য দেওয়ার ক্ষমতা ভারতে পালিয়ে থাকা দলের অন্য সিনিয়র ও কোণঠাসা নেতাদের মনে তীব্র ঈর্ষা, হতাশা এবং ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
তবে নানকের বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসদুজ্জামন কামাল বলেন, নানক বললেই কি ইচ্ছেমতো দেশে ফেরা যায়? নানক ফিরলে তিনি হয়তো ফিরবেন, কিন্তু আসাদুজ্জামান কামালের পক্ষে তো চাইলেই হুট করে দেশে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ আমার গলায় ইতিমধ্যেই ঝুলছে ফাঁসির দড়ি।
কামালের প্রশ্ন, যদি এই ধরনের কঠোর আইনি নির্দেশ বা ফাঁসির সাজা নানকের ওপর থাকত, তবে কি তিনি এভাবে বুক ফুলিয়ে প্রকাশ্যে ভারতীয় গণমাধ্যমে ইন্টারভিউ দিতে পারতেন? নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে কামাল জানান যে, তার ওপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কড়া রেস্ট্রিকশন বা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তিনি চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এই ভেবে যে, তার মুখ থেকে সামান্য কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বের হলেই ভারত সরকার তাকে ধরে বাংলাদেশের সরকারের হাতে তুলে দেবে।
শুধু আসাদুজ্জামান কামাল নন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং একসময়ের ক্ষমতার অধিকারী ওবায়দুল কাদেরও দল থেকে পুরোপুরি সাইডলাইন বা প্রান্তিক হয়ে পড়েছেন।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত ৭ আগস্ট কক্সবাজারে বলেছেন, জনগণ এ ধরনের প্রচেষ্টা বা দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করার কোনো উদ্যোগ কখনোই মেনে নেবে না।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে বসে সাংবাদিক সম্মেলন তিনি প্রসঙ্গে বলেন, কিসের হাসিনা? তিনি কোথায় কথা বলেছেন? তাকে কি কেউ দেখেছে করা? মাঝে মাঝে শুধু কিছু কণ্ঠ শোনা যায়। তারা বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে কি না, তা দেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তা কখনোই মেনে নেবে না। ‘গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ জন্য দায়ীরা কোনো অনুশোচনা দেখায়নি এবং জনগণের কাছে ক্ষমাও চায়নি।
মন্ত্রী বলেন, এই দেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার তাদের নেই। বাংলাদেশের জনগণ তাদের এখানে রাজনীতি করতে কখনোই দেবে না। যদিও তারা মাঝে মাঝে বিদেশ থেকে বিবৃতি দিতে পারে, সরকার এখন আর সেসব মন্তব্যে গুরুত্ব দেয় না।
জানা গেছে, পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর তার দল আওয়ামী লীগ মাঠের রাজনীতিতে একেবারে নীরব হয়ে গেলেও সরব হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের পাশাপাশি টেলিগ্রাম চ্যানেল, এক্স (সাবেক টুইটার), ইউটিউবে প্রতিনিয়ত তথ্যমূলক ভিডিও আপলোড করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভিনদেশীয় একটি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে সেখান থেকেও আপডেট জানানো হচ্ছে।
জানা গেছে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। বর্তমানে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। দলীয় প্রধানের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরপরই মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও দলের সক্রিয় অধিকাংশ নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যান। অবশ্য পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে কেউ কেউ পরে স্থলপথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে চলে গেছেন। কেউ কেউ আকাশপথেও বিদেশ যেতে সক্ষম হয়েছেন। দেশে অবস্থানকারীদের মধ্যে গত দেড় মাসে বেশ কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। অন্যরা এখনও দেশেই বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে রয়েছেন।
সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়, নেতাকর্মীদের বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ সময় আওয়ামী সমর্থিত কয়েকজন ‘গণপিটুনিতে’ হত্যার শিকারও হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ১৩ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে প্রথম হত্যা মামলা করা হয়। এরপর গত দেড় মাসে তার বিরুদ্ধে দেড় শতাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর সিংহভাগই হত্যা মামলা। এর মধ্যে একটি মামলায় তার মৃত্যুদন্ড হয়। শেখ হাসিনা ছাড়াও সব মামলায় আওয়ামী লীগ ও সাবেক সরকারের প্রভাবশালী এমপি-মন্ত্রীদের আসামি করা হয়েছে। এখনও নতুন নতুন মামলা দায়ের চলমান রয়েছে।
ভেরিফায়েড ফেসবুকসহ আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত কয়েকদিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিনিয়তই এসব মাধ্যমে পোস্ট, ফটোকার্ড, ভিডিও, বার্তা আপলোড দেওয়া হচ্ছে। এতে দলের নেতাকর্মী ও গণমাধ্যমকে উদ্দেশ করে নানা নির্দেশনা ও বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানের ঘটনা দেওয়া হচ্ছে।
বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতারা হুঙ্কার দিয়ে বলেন ‘৮০-৯০ দশকে ফিরে যেতে বাধ্য করবেন না। শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে ফিরবেন। এসময় ভিডিওতে দেওয়া বক্তব্যকে উসকানিমূলক মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘উসকানিমূলক বক্তব্যের’ বিষয়টি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দিল্লির সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
সম্প্রতি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতে বসে তারা (আওয়ামী লীগ নেতারা) যে কাজটা করছেন, রাষ্ট্রীয় জায়গা থেকে এটা নিয়ে আগেও আমাদের সরকার থেকে কথা বলা হয়েছে, এটা বলা হবে। কারণ এদের অনেকেই মামলার আসামি আছেন, এদের অনেকের নামেই ওয়ারেন্ট আছে, কারো কারো সাজা হয়ে গেছে। কথা বলা দূরে থাকুক, তাদেরকে তো আমাদের কাছে হস্তান্তর করারই কথা আছে। আমরা সেই জায়গা থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই কথা নিয়মিতভাবে বলা হচ্ছে, আমরা সেটা চালিয়ে যাব।
জানা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে যারা সুযোগ পেয়েছেন দেশ ছেড়েছেন, কেউ কেউ দেশের মধ্যেই আত্মগোপনে রয়েছেন। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেইজে নেতাকর্মীদের প্রতি একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে জানানো হয়, দলের সাবেক হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নম্বর দেয়া হয়। স্থানীয় কর্মসূচি ও সকল ঘটনার তথ্য নতুন এই হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরের মাধ্যমে কেন্দ্রে জানাতে বলা হয়। এর মাধ্যমে একটা বিষয় স্পষ্ট দেশ থেকে নয়, এখন আওয়ামী লীগ পরিচালিত হচ্ছে দেশের বাইরে থেকে। দেশের বাইরে থাকা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠন তাদের নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।