বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেছেন, সংশোধনের জন্য নয়, জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে গণভোটে রায় দিয়েছে। যারা গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি, তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে মানতে পারে না। গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সরকার মেজরিটি জনগণকে অসম্মান করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি ৫১ শতাংশ জনগণের ভোটে সরকার গঠন করার দাবি করলেও প্রায় ৭১ শতাংশ জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে গণভোটে রায় দিয়েছে, যা বিএনপি মেনে নিচ্ছে না। গণভোটের রায় যতদিন বাস্তবায়ন না হবে, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী সংসদে এবং সংসদের বাইরে সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। জনগণের দাবি আদায় না করে জামায়াতে ইসলামী সরে যেতে পারে না এবং শহীদদের রক্তের সাথে কাউকে বেইমানি করতে দেবে না।
আজ বুধবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে আয়োজিত “জুলাই গণঅভ্যুত্থান-উত্তর কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ব্যবস্থা ও আমাদের করণীয়” শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার হলে শিক্ষা ব্যবস্থাও সংস্কার হবে। জ্ঞান ও চরিত্র একই বৃত্তে অঙ্কিত—এই দুইয়ের সমন্বয়ে আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার আলোকে একটি শিক্ষানীতি প্রস্তুত করতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে, সরকারি চাকুরিতে কোটা প্রথা বাতিল করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের দাবিতে। পরবর্তীতে ছাত্র সমাজ ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ (আমরা ন্যায় বিচার চাই) স্লোগানে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যায়। ছাত্রদের সাথে যুক্ত হয় এদেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ। ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে চব্বিশের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু শহীদদের রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতার মসনদে গিয়ে বিএনপি আবারও সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনছে। আগে নানা রকম কোটা থাকলেও এখন শুধুমাত্র দলীয় কোটায় নিয়োগ ও পদায়ন দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের আগে বিএনপি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিলেও ক্ষমতায় বসার পর ‘সবার আগে বাংলাদেশের পরিবর্তে সবার আগে বিএনপি’ নীতিতে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। বিএনপির যেসব প্রার্থীকে জনগণ এমপি নির্বাচিত করেনি, তাদের কাউকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, আবার কাউকে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দলীয় বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক-বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে আবারও মেধার অবমূল্যায়ন হচ্ছে। পুরোনো ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি ফিরিয়ে না এনে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তিনি সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর ড. ইলিয়াস হোসেন মোল্লা এমপি বলেন, যার যার ধর্মের আলোকে নৈতিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পশ্চিমাদের গোলামি বাদ দিয়ে আল্লাহর গোলামি ও আনুগত্য করতে হবে। সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকারি দল ৩১ দফা জাতির সামনে উপস্থাপন করে যেই প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার করেছিল, তা থেকে তারা সরে যাচ্ছে। ৩১ দফার প্রথম দফা ছিল সংবিধান সংস্কার, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধন করতে চাইছে। জনগণের সাথে কৃত ওয়াদা-অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
অন্যতম বক্তা মুফতি আলী হাসান ওসামা বলেন, ভাষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। বাংলা ও ইংরেজির মতো আরবি ভাষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আমাদের প্রবাসীরা দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে পারবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য কোনো বাজেট বরাদ্দ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-উত্তর কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ব্যবস্থা ও আমাদের করণীয় হচ্ছে গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর জোর দেওয়া। পাশাপাশি দলীয় রাজনীতির প্রভাব শিক্ষাঙ্গন থেকে দূর করা এবং শহর ও গ্রামে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে নিশ্চিত করে জেনারেল ও মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি অধ্যাপক নুর নবী মানিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. জামাল হোসেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নুর নবী মানিক বলেন, জেন-জি যেই বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ করতে হবে। জাতীয়করণের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সংশোধিত আরপিও (RPO)-তে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা নির্বাচন করতে পারবে না বলে যে বিধান করা হয়েছে, তা বাতিলের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক সংসদ সদস্য হতে পারলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে পারবেন না—এই বৈষম্য শিক্ষক সমাজ কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করিম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক মানবকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম এবং অধ্যক্ষ মাওলানা মোশাররফ হোসেন।