বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সংগঠন পরিচালনায় অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তৃণমূলের দায়িত্বশীলদের যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। আদর্শ আচরণের মাধ্যমে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে এবং তরুণ প্রজন্মকে সংগঠন ও নেতৃত্বে সম্পৃক্ত করার কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রংপুর বড় আলিয়া মাদ্রাসায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী উপজেলা ও থানা দায়িত্বশীল শিক্ষাশিবিরের সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ২৫, ২৬ ও ২৭ আগস্ট এ শিক্ষাশিবির অনুষ্ঠিত হয়।

রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল পরিচালক ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শিক্ষাশিবিরে বিশেষ অতিথি হিসেবে আলোচনা উপস্থাপন করেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম। বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সহকারী অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও অঞ্চল টিম সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল এমপি এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেন।

পরিবার ও সংগঠনে যোগ্য নেতৃত্ব গঠনের আহ্বান

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় নিজেদের সমৃদ্ধ করতে হবে। পরিবার গঠনের দিকেও নজর দিতে হবে, যাতে স্ত্রী-সন্তানরা ইসলামী আন্দোলনের জন্য গড়ে ওঠে এবং আন্দোলনের সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নসহ স্থানীয় নির্বাচনের সব স্তরে অংশগ্রহণের জন্য প্রার্থী বাছাই করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে হবে।

তিনি বলেন, বিগত নির্বাচনে রংপুরের জনগণ জামায়াতের প্রার্থীদের নির্বাচিত করে সংগঠনের প্রতি যে আস্থা স্থাপন করেছেন, তার মর্যাদা রাখতে এমপিদের কাজ ও জনগণের সেবার মাধ্যমে দায়িত্বশীলদের সমন্বিত ভূমিকা পালন করতে হবে।

সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, নৈতিক স্খলন ও দুর্বলতা থেকে রক্ষা করতে সংগঠনের জনশক্তির মানোন্নয়ন করতে হবে। ফ্যাসিস্ট আমলে মজলুম ও শহীদ নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগ ও দুঃখ-কষ্টের মূল্যায়ন করে নিজেদের ত্যাগ-কুরবানির ক্ষেত্রে মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন, কর্মী পরিচালনা এবং জনগণের সঙ্গে সামগ্রিক কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনকে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল টিম সদস্য ফকিহ আবদুল হাকিমের পরিচালনায় শিক্ষাশিবিরে গ্রুপভিত্তিক আলোচনা ও পরিচালনায় অংশ নেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও মহানগর আমীর মাওলানা এটিএম আজম খান, অঞ্চল টিম সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম, রংপুর জেলা আমীর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী এমপি, সাবেক কুড়িগ্রাম জেলা আমীর মাওলানা আবদুল মতিন ফারুকী, লালমনিরহাট জেলার সাবেক আমীর অ্যাডভোকেট আবদুল বাতেন, প্রভাষক আতাউর রহমান, রংপুর মহানগর সেক্রেটারি কেএম আনোয়ারুল হক কাজল ও রংপুর জেলা সেক্রেটারি মাওলানা এনামুল হকসহ অন্যরা।

‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে জনগণকে রাজপথে নামতে হবে’

এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে রংপুর মহানগর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মিয়া গোলাম পরওয়ার দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন।

মহানগর আমীর এটিএম আজম খানের সভাপতিত্বে সভায় তিনি বলেন, জনদুর্ভোগ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও দলীয়করণের পাশাপাশি বড় সংকট হলো—চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, ক্ষমতাসীন সরকার তা মেনে নেয়নি।

তিনি বলেন, ‘গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ সংবিধানে নেই’—সরকারের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। অথচ কর্তৃত্ববাদী সরকার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

সরকারের বিভিন্ন নিয়োগের সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারি চাকরিতে সব দলের লোকেরা চাকরি করবেন এবং এ ক্ষেত্রে নিয়োগবিধি রয়েছে। রাজনৈতিক পদে থেকে সরকারি পদে নিয়োগ দেওয়া যায় না। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার দাবি, সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরই দায়িত্ব পালন করার কথা। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরিয়ে দলীয় প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সরকার বৈষম্য সৃষ্টি করছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং করে হারিয়ে দেওয়া’ মেনে নেওয়া হলেও সরকারের পরাজিত প্রার্থীদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে নির্বাচিত এমপিদের কাজের ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। সংরক্ষিত নারী এমপিদের নির্বাচিত বিরোধীদলীয় এমপিদের এলাকায় ‘অসাংবিধানিকভাবে’ তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

‘গণভোটে হ্যাঁ চেয়ে এখন অস্বীকার করছে বিএনপি’

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অভিযোগ করেন, বিএনপি গণভোটে রায় দেওয়া পাঁচ কোটি মানুষের সঙ্গে দ্বিচারিতা করছে। তাঁর দাবি, বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়ে এখন ক্ষমতায় এসে সেই অবস্থান অস্বীকার করছে।

তিনি বলেন, বিএনপির প্রস্তাবেই গণভোট হয়েছে এবং তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছে। ভোটের পর ক্ষমতায় এসে বিষয়গুলোকে সংবিধানবিরোধী বলা হচ্ছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করার এই বিষয়টি মানুষ বুঝতে পারছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গোলাম পরওয়ার সরকারের প্রতি জনগণের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি না করে সংসদে জুলাই সনদসহ সব বিষয়ে আলোচনা করা উচিত।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমাদের রাজপথে ঠেলে দিলে গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে রায় দেওয়া প্রায় ৭০ ভাগ মানুষকে চলা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।’

তিনি জানান, জুলাই সনদের পক্ষে জনমত ধরে রাখা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ছয় মাস ধরে ১১ দল সংসদ ও রাজপথে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক কর্মসূচি পালন করছে। জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে মিছিল, বিক্ষোভ ও মহাসমাবেশের পর আন্দোলনের তৃতীয় পর্ব শেষে চতুর্থ পর্বে লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

গোলাম পরওয়ার জানান, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে প্রথম লংমার্চ শুরু হবে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউয়ে সমাবেশের মাধ্যমে রংপুর অভিমুখে লংমার্চ শুরু হবে।

শহীদ আবু সাঈদের রক্তের স্মৃতিবিজড়িত উত্তরবঙ্গের রংপুরের লংমার্চে জনগণকে অংশ নিয়ে কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।