আর্থিক খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় নিয়োগের বয়সসীমা বিলুপ্ত সংক্রান্ত দুটি বিল পাসকে কেন্দ্র করে এদিন সংসদ নেতা, সরকারের মন্ত্রী এবং বিরোধী দলীয় সদস্যরা পাল্টাপাল্টি যুক্তি ও অভিযোগে লিপ্ত হয়েছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর শীর্ষ পদের বয়সসীমা বিলোপের বিষয়টি নিয়ে সরকারি দলের ‘যোগ্যতা’র যুক্তি এবং বিরোধী দলের ‘রাজনৈতিক প্রভাব’ ও ‘ব্যক্তি বিশেষকে সুবিধা দেওয়ার’ অভিযোগে উত্তপ্ত হয় সংসদ। বিশেষ করে গভর্নরের নিয়োগের বিষয়ে বিরোধী শিবিরের বিরোধীতা জবাবে অর্থমন্ত্রী বিরোধী দলকে ধৈর্য ধরে পারফরম্যান্স দেখার আহ্বান জানান।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন (সংশোধন) ২০২৬’ এবং ‘বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল ২০২৬’ পাসের প্রস্তাব করেন। বিল দুটির ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রথমেই আপত্তি তোলেন বিরোধী দল ও জোটের সদস্যরা।
বিলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু বলেন, অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় কাজে লাগাতেই এই বয়সসীমা শিথিল করা জরুরি। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ১৯৯৩ সালে যখন সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন হয়, তখন মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫৭ বছর, যা এখন বেড়ে ৭২ বছর হয়েছে।
অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কেন এই কর্মযজ্ঞের বাইরে রাখা হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, বিশ্বের সফল অর্থনীতিগুলোতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে যোগ্য ব্যক্তিদের বয়সের ফ্রেমে বাঁধা হয় না। দেশের আগামীর অর্থনীতির প্রয়োজনে প্রফেশনাল লোক দরকার এবং এখানে ইমোশনের কোনো সুযোগ নেই।
মন্ত্রীর এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এর আগে ১৩৩টি অধ্যাদেশ বিল আকারে আসার সময়ও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে বিরোধী দল পুরোপুরি কথা বলার সুযোগ পায়নি, এবারও একই প্রক্রিয়ায় অধিকার খ-ন করা হচ্ছে। সরকারের গত দুই মাসের কার্যকলাপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, নীতিগত জায়গাগুলোতে যেভাবে পরিবর্তন আনা হচ্ছে তাতে জনগণের আকাক্সক্ষা শেষ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, যেভাবে সাবেক গভর্নরকে বিদায় করা হয়েছে এবং নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা গণতন্ত্র সমর্থন করে না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন বলেন, বয়সের বাধা তুলে দিয়ে সবকিছুকে পলিটিসাইজ বা রাজনৈতিকীকরণ করা হচ্ছে এবং গোষ্ঠী বা পরিবারকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
বিরোধী দলের উপনেতা ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন,বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন।
বিরোধী দলীয় নেতার অভিযোগের জবাবে অর্থমন্ত্রী পুনরায় ফ্লোর নিয়ে বলেন, সংসদীয় রুলস অব প্রসিডিউরের বাইরে গিয়েও বিরোধী দলের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হচ্ছে। অতীতে বিএনপি সরকারের সময়ও আর্থিক খাতে নিয়োগগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়নি বলেই শৃঙ্খলা ছিল। তিনি বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে একটি বড় ঘোষণা দিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নরের বিষয়ে তিনি বলেন, আপনি (বিরোধী দলীয় নেতা) বলছেন ‘প্রুফ অব দ্য পুডিং ইজ ইন দ্য ইটিং’। আসুন আমরা অপেক্ষা করি এবং দেখি। তিনি তার (গভর্নর) পারফরম্যান্সের মাধ্যমে যদি দলীয় কোনো বিষয় বা প্রভাবের প্রমাণ দেন, তখন আপনি তা বলতে পারবেন। আর এখন পর্যন্ত তার পারফরম্যান্স দেখছি। কোনো ব্যক্তি একটি দলের সমর্থক হতেই পারেন, কিন্তু তার যোগ্যতা থাকলে নিয়োগে অসুবিধা কোথায়? ‘প্রুফ অব দ্য পুডিং ইজ ইন দ্য ইটিং’ প্রবাদ উল্লেখ করে এসময় তিনি বিরোধী দলকে ধৈর্য ধরে পারফরম্যান্স দেখার আহ্বান জানান।
এদিকে আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই কি এই বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে? সরকারি দল সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে আইন পাস করছে ঠিকই, কিন্তু এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
দু’টি বিল পাস
বিরোধী দলের আপত্তির মধ্য দিয়েই সংসদে দুটি বিল পাস করা হয়েছে। বিল দুইটি হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ এবং ‘বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’। বিল দুইটি উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হলেও কণ্ঠভোটে বিল দুটি পাস হয়ে যায়।
বিদ্যমান আইনে, কোনও ব্যক্তি ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ করলে তাকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর চেয়ারম্যান বা কমিশনার হিসেবে নিয়োগের অযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয় বা তিনি পদে বহাল থাকতে পারেন না। পাস করা বিলে এই বিধানটি বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অপরদিকে, বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কতৃপক্ষ (আইডিআরএ) আইনে বলা আছে, ৬৭ বছর বয়স পূর্ণ হলে কোনও ব্যক্তি বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে পারেন না। বিলটিতে এই বিধানও বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।
দুটি বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত পৃথক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভিজ্ঞ, দক্ষ ও জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে আইনগুলো সময়োপযোগী করা প্রয়োজন।
আমাদের অধিকার খর্ব করবেন না, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমাদের অধিকার খর্ব করবেন না। আমাদের অধিকার আপনার (স্পিকার) মাধ্যমে সংরক্ষিত হোক। এই বিল দুইটিই স্থগিত করুন, যেগুলোর কাগজ আজকেই সরবরাহ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা বেশিরভাগ সংসদ সদস্য এখানে নতুন এসেছি। আমরা বিধিগুলো আস্তে আস্তে রপ্ত করছি। বিধি মোতাবেক এই সংসদ চলবে, এতে আমাদের সকলের সহযোগিতা করা উচিত। স্পিকারের চেয়ার থেকে বারবার এ অনুরোধ আমাদের জানানো হয়েছে এবং আমরা তা সম্মান করি।
তিনি আরও বলেন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল, ২০২৬Ñএই বিলটি কোনো সময়সীমার মধ্যে বন্দি নয়। এখানে সময়ের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তাই বিধি মানাই উচিত ছিল। আমরা তিন দিন আগে চেয়েও তো পেলাম না, এমনকি এক দিন আগেও ম্যাটেরিয়ালসগুলো পাইনি। মাত্র এখন ডেস্কে এসে পেয়েছি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমি আবারও বলছি, এটি সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আরও অনেক বিল এই সংসদে আসবেÑএটাই স্বাভাবিক। বিল আসবে, আইন সংশোধন হবে; আমাদের এগিয়ে যেতে হলে এগুলো লাগবে। কিন্তু যেখানে যা প্রযোজ্য, তা-ই হওয়া উচিত। যেহেতু এর কোনো সময়সীমা নেই, তাই এটি পরবর্তী অধিবেশনে আনা যেতে পারে। আমি অনুরোধ করব, এই আলোচনা এখানে স্থগিত করা উচিত।
তখন ডেপুটি স্পিকার বলেন, মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা, আমরা বিধি ৮০-তে আছি। বিধি অনুযায়ী বিলের রিপোর্ট আমাদের গতকাল দেওয়া হয়েছে। মাননীয় সদস্য, বিল দেওয়া হয়েছে গত পরশু দিন এবং রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে গতকাল।
বিশেষ কাউকে সুবিধা দিতেই কি আইনের বয়সসীমা বাতিল
সংসদে পাস হওয়া সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং বীমা কর্পোরেশন আইনের সংশোধনী নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই কি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে নিয়োগের বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শেয়ার বাজারে ১৫ বছরে লুট হয়েছে ১ লাখ কোটি টাকা বিলের উপর আলোচনাকালে বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে গত ১৫ বছরে এক লক্ষ কোটি টাকার বেশি লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
তিনি বলেন, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ছিল, যা একটি বিশেষ গোষ্ঠী লুটে নিয়েছে।
এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
একই বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ২০১০ সালের শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। কোটি কোটি মানুষ তাদের পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছে। প্রস্তাবিত বিলে লুটপাটের শাস্তি মাত্র ৫ বছর জেল এবং ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা রাখায় তিনি আপত্তি জানান।