জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সদস্যদের আক্রমণাত্মক আলোচনার সমালোচনা করে সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা ও জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, হাসপাতালের বেড থেকেই গত কয়েকদিনের আলোচনা খানিকটা ফলো করার চেষ্টা করেছি। আলোচনা শুনে মনে হয়েছে সরকারি দলের সদস্য যারা আছেন তারা বোধহয় আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আর আমরা জামায়াত-বিএনপির সংসদ সদস্য।

গতকাল জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় সংসদে সভাপতিত্ব করছিলেন স্পীকার মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।

আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, আমার কাছে একটা বিষয় মনে হচ্ছিল আজকের আলোচনা শুনে যে, আজকে যারা সরকারি দলের বেঞ্চে আছেন তারা বোধহয় আওয়ামী লীগ থেকে, আর আমরা এদিকে যারা আছি তারা বোধহয় জামায়াত-বিএনপির সংসদ সদস্য। কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল আমরা বিরোধী দলে ছিলাম, তখন আওয়ামী লীগ যে ভাষায়, যে ভঙ্গিতে, যে স্পিরিটে জামায়াত বিষয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে বক্তব্য এবং কনডেম করতো, ঠিক আজকে সরকারি দলের ওই সাইড থেকে একই ধরনের আচরণ আমরা লক্ষ্য করছি। দীর্ঘ সংগ্রাম, আন্দোলন, জীবনদানের কথা তো এখানে সকলেই বলছেন বারবার এবং এটাই সত্য ছিল যে অনেক জীবন, রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই অবস্থায় আমরা আসতে পেরেছি। এবং এই সংগ্রামে বিএনপি, জামায়াত, অন্যান্য দলগুলো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সমবেত সংগ্রামে আমরা একত্রিত ছিলাম। যেমন আজকে মাননীয় সেক্রেটারি জেনারেল আছেন বিএনপির, আমাদের দলীয় নেতা এবং আমরা জামায়াত উনার পেছনে ছিলাম। তারা সকলেই অনেক সময় গোপনে একই গাড়িতে চড়ে ঘুরে ঘুরে আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনের কর্মকৌশল ঠিক করেছেন এবং মুভমেন্ট করেছেন। কিন্তু আজকে এটা মনে হচ্ছে যে আমরা বোধহয় সবসময় এক পক্ষে ছিলাম এবং অপর পক্ষে আপনারা ছিলেন এবং অত্যন্ত উত্তপ্ত একটা সংসদীয় অবস্থা আমি এখানে দেখতে পাচ্ছি। আন্দোলন সংগ্রামের সময় এই যে ১৮ মাস ছিল ইন্টারিম গর্ভমেন্টের সময়, সে সময় বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতৃত্বদের সাথে আমার ব্যক্তিগতভাবে বা সরাসরি আলোচনা হয়েছে। আমরা সকলেই তখন বলেছি যে আমরা এই সংগ্রামের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের এই পতনের পর যে রাজনীতি হবে, যে সংস্কৃতি হবে, যে পার্লামেন্ট হবে, যে দেশশাসন হবে, আমরা সকলেই মিলে একটা সুশাসন দেওয়ার জন্য কাজ করবো। এ পর্যন্ত কিন্তু আমরা পুরোপুরি একমত ছিলাম। কিন্তু নির্বাচনের পরে, সরকার গঠনের পরে আমরা একটি ভিন্ন চিত্র দেখতে পাচ্ছি যেটা আমাকে হতাশ করবে, আমাদেরকে রিয়েলি একটা পর্যায়ে হতাশ করবে কারণ আমরা যেটা দেওয়ার কথা ছিল, যেটা আমরা দিতে পারব বা দিতে পারতাম সকলে মিলে আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে একটা ভালো পরিবেশেÑএরকম একটা হোস্টাইল এনভায়রনমেন্ট যদি তৈরি হয় তাহলে সেটা দেওয়া কিন্তু সহজ হবে না এবং একটা ফ্রাজাইল পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ যেটা এক্সপেক্ট করেÑ কোয়ালিটি চেঞ্জ ইন পলিটিক্স, কোয়ালিটি চেঞ্জ ইন দা পার্লামেন্ট এবং কোয়ালিটি চেঞ্জ ইন আওয়ার এটিটিউড অ্যান্ড মেন্টালিটিÑএটা অর্জন করতে হলে অনেক সদস্য সরকারি বেঞ্চ থেকেও বলেছেন ধৈর্য সহকারে আমাদের এগোতে হবে, আমি এটার সাথে একমত। কিন্তু কথাটা এই শুধু পার্লামেন্টে বক্তৃতা দিয়ে এটা অর্জন করা যাবে না, এজন্য সত্যিকার ভাবেই আমাদের মনের পরিবর্তন এবং আমাদের এটিটিউডের পরিবর্তন দরকার।

তিনি বলেন, আজকে অনেকে কথা বলেছেন টু-থার্ড মেজোরিটি উনারা পেয়েছেন, ইটস ওকে। নির্বাচনী অনেক কথা আছে কিন্তু তারপরেও আমাদের মহান নেতা আমীরে জামায়াত এই রেজাল্ট উইথ সাম রিজার্ভেশন, উইথ সাম ক্রিটিসিজম আমরা কিন্তু একসেপ্ট করে নিয়েছি। আমরা এখানে অন্যান্য যে ট্রাডিশনগুলো ছিলÑআগে কিছু হইলেই মানি না, আসবো না, গ-গোল হচ্ছেÑসেটা কিন্তু আমরা করিনি। আমরা করিনি এজন্যই যে নেশনের প্রতি আমাদের যে দায়বদ্ধতা আছে, এই জাতির প্রতি আমাদের যে কমিটমেন্ট আছে, সেই দায়বদ্ধতা এবং কমিটমেন্টকে পূরণ করতে হলে পারস্পরিক ঝগড়াঝাঁটিতে সময় ব্যয় করলে এটা হবে না। এবং সেটা না হয়ে পুরা সময়টাই যদি পুরা কনসেনট্রেশনটা যদি আমরা দেশগড়ার জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য, সুষ্ঠু রাজনীতির জন্য আমরা করি তাহলে সেটাই আমাদের অর্জনকে একটা রিমার্কেবল পর্যায়ে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

তিনি আরো বলেন, টু-থার্ড মেজোরিটি কখনোই খুব সুখকর রেজাল্ট দেয় নাই অনেক জায়গাতে এবং আজকের আলোচনার যে টোন সেটা টু-থার্ড মেজোরিটির টেম্পারামেন্টই আমার কাছে মনে হয়েছে। আমরা জানি আমাদের এই উপমহাদেশে ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে, বেনজির ভুট্টোর সময়ে, এই বাংলাদেশেও শেখ সাহেবের সময়ে, তারপর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে, ম্যাডাম খালেদা জিয়ার সময় টু-থার্ড মেজোরিটি অবস্থা আমরা দেখেছি এবং এটা একটা ভয়ংকর পরিণতি আমরা দেখি যদি সেটার লাগাম না ধরি। আপনারা জানেন টু-থার্ড মেজোরিটিতে ইন্দিরা গান্ধী শিজ আউটস্টেড, শেখ সাহেবের টু-থার্ড হি ওয়াজ কিল্ড, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে সেটাও কিল্ডÑএগুলো আমাদের আতঙ্কিত করে তোলে এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা চাই যে এ ধরনের কোনো অঘটন বাংলাদেশে যেন আর কখনো না হয়।

তিনি বলেন, এটা কেন হয়? এটা হয় এজন্য টু-থার্ড মেজোরিটি পাওয়ার পর যে ওভার কনফিডেন্স তৈরি হয়, যা ইচ্ছা আমরা তাই করতে পারি যে এরোগেন্সটা তৈরি হয়, সেই এরোগেন্সের কারণে এমন কিছু অ্যাক্টিভিটিজ আসে যেটা মানুষকে ক্ষুব্ধ করে এবং তার বিপরীতে একটা খারাপ এনভায়রনমেন্ট তৈরি হয়। আমি অনুরোধ করবো সরকারি দলকেÑতবে সরকারি দলের অনেক ভাইরা অনেক ভালো কথা বলেছেন উই ডু এগ্রি উইথ দ্যাটÑলেটেস্ট ফরগেট পাস্ট, কারণ অতীতকে যদি আমরা টানি তাহলে সকলের অতীতের ভেতরে ভালো দিক আছে এবং কালো স্পট আছে। যেমন খুব বেশি করি আজকে আমাদেরকে রাজাকার আলবদর বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এবং গতকাল আমি শুনেছি স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাকি তুই রাজাকার বলেছেন। পার্লামেন্টে 'তুই'টা আমার মনে হয় খুবই আনপার্লামেন্টারি অসংগত একটি শব্দ। আমি জানি না মাননীয় স্পিকার এটাকে এক্সপাঞ্জ করছেন কি না ওনার অবজারভেশনে। এবং সেজন্য সরকারি দলের প্রতি বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আছেন, ওনার বিগিনিংয়ের যে স্পিচটা ছিল সেটাকে আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। তবে একটি শব্দ বা অতি গোপন নাকি একটা উপহাসÑএগুলো টুকটাক কারো গসিপস নিয়ে যদি আমরা এক্সপোজ করতে চাই তাহলে আমাদের পারস্পরিক যে রেসপেক্ট এবং কনফিডেন্সটা সেটা কিন্তু আবার ঘাটতি হবে।

তিনি বলেন, মেজরিটি টু-থার্ডের ভিত্তিতে যদি আপনারা যেটাই আপনাদের ইচ্ছা হবে যা ইচ্ছা তা করতে থাকেন, তাহলে এ দেশ আবার পিছিয়ে যাবে এবং আমরা যে একটা সুস্থ রাজনীতি এবং সুস্থ পার্লামেন্ট চাই, সেটা অর্জন করা কিন্তু সহজ হবে না এবং ব্যাহত হবে। আমি খুব শর্টলি দুই একটা ভুল তথ্য যেটা আজকে অনেকেই দিয়েছেন, সে ব্যাপারে কথা বলতে চাচ্ছি। প্রথম কথা হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের বিরোধী ছিল বলে যে তথ্য আসছে, এটা একেবারেই অসত্য তথ্য। কারণ সৈয়দ আবুল আলা মওদুদীর মাধ্যমে প্রথম ‘টু নেশন থিওরি’র প্রবক্তা ছিলেন সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী। এবং তাঁর খুব স্ট্রং একটা বই লেখা ছিল, সেটাকে তৎকালীন মুসলিম লীগ পলিটিক্যালি হাজার লক্ষ কপি ছাপিয়ে সারা পাক-ভারত উপমহাদেশের মানুষের কাছে, মুসলিমদের কাছে পেশ করেছিলেন। এবং পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর পরই উনি কিন্তু পাকিস্তানে মাইগ্রেট করেছেন। উনি যে কথাটা বলেছিলেন, সেটা না বোঝার কারণে অনেকে বিভ্রান্তি তৈরি করছেন। উনি বলেছিলেন যে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য একটি স্বাধীন ভূখ- দরকার। উনি পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলছেন। তবে উনি বলেছিলেন, যে সমস্ত নেতৃত্বের মাধ্যমে এ আন্দোলন চলছে, এই নেতৃত্বের পক্ষে একটি ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা সম্ভব হবে কি নাÑএ ব্যাপারে উনি তার ডাউটের কথা উনি পেশ করেছিলেন। তো দুইটা তো টোটালি ডিফারেন্ট জিনিস। কিন্তু যারা এটাকে বাজেভাবে ইউজ করে কনডেম করতে চায়, তারাই এই সত্যটিকে অন্যভাবে তারা পেশ করতে চাচ্ছে। হি ওয়াজ টোটালি ইন ফেভার অফ পাকিস্তান।

তিনি আরো বলেন, একজন ভাই এখানে বললেন যে উনি ৪৭-এ বিশ্বাস করেন না। উনি যদি ৪৭-এ বিশ্বাস না করেন, তাহলে বাংলাদেশ কীভাবে হলো? কারণ বাংলাদেশ এবং ইস্ট পাকিস্তান, ওয়েস্ট পাকিস্তান মিলেই তো ৪৭-এর মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ। এবং সেখান থেকেই তো আবার আমরা স্বাধীনতা সংগ্রাম করে আমরা বাংলাদেশ করেছি। অবশ্য উনার এ চিন্তা উনার বক্তব্যের উনার চিন্তার সাথে একরকম। কারণ উনারা আসলে পাকিস্তানও চান নাই, বাংলাদেশও পরবর্তী পর্যায়ে তারা কীভাবে নিছেন জানি না, কারণ তারা এক ইন্ডিয়াতে ছিলেন। এরপরও যখন সংগ্রাম করছিল, উনারা কিন্তু আশ্রয় নিতে ইন্ডিয়াতে গিয়ে সংগ্রাম করেন নাই। তো উনি বলছেন যে হাসিনার কারাগারে উনি যেতে চান নাই এজন্য পালায় গেছেন। তো সেটা উনার ব্যাপার, আমি ক্রিটিসাইজ করতে চাই না। সুতরাং অরিজিনালি যারা ভারতপন্থী, অরিজিনালি যারা ভারতের অধীনস্থ একটি বাংলাদেশ দেখতে চায়, তাদের চিন্তার ভেতরে এ সমস্ত জিনিস আসতে পারে এবং সেই চিন্তার প্রতিফলন যে বক্তব্য যদি আসে, আমরা তো আশ্চর্য হওয়ার কিছু মনে করি না।