সরকার পতনের এক দফা দাবিতে ৩৫ জুলাই ( ৪ আগস্ট) দেশজুড়ে চলছিল অসহযোগ আন্দোলন। এর বিপরীতে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে মাঠে নামে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
সংঘর্ষে পুরো দেশ যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রাণ হারান শত শত মানুষ। চলমান আন্দোলনকে ‘জঙ্গি হামলা’ বলে আখ্যায়িত করে তৎকালীন সরকার। কিন্তু এতে আন্দোলনকারীরা পিছু হটেননি। বরং ঘোষণা আসে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির।
রক্তাক্ত জুলাইয়ের ৩৫তম দিন। গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে রাজধানী ঢাকা যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। এত প্রাণহানি ও রক্তপাত স্বাধীন বাংলাদেশ আগে দেখেনি। ততক্ষণে স্বৈরাচার পতনের শেষ অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে। আর শেষ মুহূর্তে মরণ কামড় দিতে দমন-পীড়ন আরও জোরদার করে সরকার ও পেটোয়া বাহিনী। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে দেখা যায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত অভিযানে ৪ আগস্ট নিহত হন শতাধিক মানুষ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে এবং তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। সেদিন প্রথমে ৬ আগস্ট ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ৫ আগস্টের জন্য রাখা হয় তুলনামূলক কম কর্মসূচি। তবে সমন্বয়করা পরে জানান, ৫ আগস্ট বড় কর্মসূচি না থাকায় সরকার ওই দিনই আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
এর আগের দিন, ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ থেকে সমন্বয়করা শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন এবং ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ডাক দেন। তবে ৪ আগস্ট সারা দেশে ব্যাপক সহিংসতা, প্রাণহানি এবং আন্দোলনের বিস্তৃতি বিবেচনায় নিয়ে রাতে কর্মসূচিটি এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার সহিংসতা চালিয়ে গেলে আন্দোলনকারীরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাবে। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতিটি এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং সরকার পতন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
এরপর ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন সমন্বয়করা। রাজনৈতিক দলগুলোও ততক্ষণে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানায়। সবার সম্মতিতে সিদ্ধান্ত হয়, ৬ আগস্ট নয়, ৫ আগস্টই পালিত হবে চূড়ান্ত কর্মসূচি ‘লং মার্চ টু ঢাকা’।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগাহ বলেন, ‘প্রথমে ৬ আগস্ট কর্মসূচি দেয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে আমাদের বক্তব্য ছিল, মানুষ এর মধ্যেই রাজপথে নেমে এসেছে। তখন কিছুটা সংশয় ছিল, এত দ্রুত মানুষকে আবার নামানো যাবে কি না। আমরা বলেছিলাম, সবাই সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামবে। এরপর সবাই আত্মবিশ্বাস পায় এবং ৫ আগস্ট কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়।’
ইতিহাসের সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, ‘৬ আগস্টের যে লং মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি ছিল, সেটি আমরা একদিন এগিয়ে এনেছি।’
৩৫ জুলাই সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারাও সশস্ত্র বাহিনীকে ছাত্র-জনতার মুখোমুখি না দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। পরশু নয়, আগামীকালই ‘লং মার্চ টু ঢাকা’। ৪ আগস্টের সেই একটি ঘোষণাই ৫ আগস্ট ঢাকার সব রাজপথকে নিয়ে যায় গণভবনের অভিমুখে। আর তারই পরিণতিতে পতন ঘটে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের।পতনের মধ্য দিয়ে টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে।