বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যকার আলোচনাকে শর্ত হিসেবে জুড়ে দেওয়াকে উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছে আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি (আইএফসি)। আগামী ১১ ডিসেম্বর এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) এক যৌথ বিবৃতিতে আইএফসি নেতারা বলেন, ভারতের এই অবস্থান ২০১১ সালের তিস্তা চুক্তির মতো আরেকটি ধোঁয়াশা তৈরির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সে সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনমনীয় অবস্থানের কারণে ভারতের পক্ষে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। অথচ ২০১১ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগেই ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে এই চুক্তির বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দু ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে গত ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আইএফসি জানায়, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বিহার রাজ্যকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, গঙ্গা চুক্তির নবায়নের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিহারের পানির চাহিদার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বিহার সরকারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এই আশ্বাস দেন।

এর আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারও নয়াদিল্লিকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, গঙ্গা চুক্তির আগে কলকাতা বন্দর, হুগলি ও ভাগীরথী নদীর পানির চাহিদা পূরণ করা উচিত। গত ৬ আগস্ট রাজ্যসভায় বিষয়টি উত্থাপন করেন বিহারের সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী সঞ্জয় ঝা। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিখিত জবাব দেন।

এদিকে, গত ২১ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল গণমাধ্যমকে জানান, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির আলোচনা বর্তমানে কারিগরি পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ পর্যায়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রায় অসম্ভব।

আইএফসি স্মরণ করিয়ে দেয়, ১৯৭৭ ও ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি রাজনৈতিক পর্যায়ে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের চুক্তিটি বাংলাদেশের তৎকালীন মন্ত্রী রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান ও ভারতের মন্ত্রী জগজীবন রামের মধ্যে এবং ১৯৯৬ সালের চুক্তিটি বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে আইএফসি জানায়, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের জন্য ভারত সরকারের কাছে পত্র পাঠানো হয়েছে। তবে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

আইএফসি নেতারা উল্লেখ করেন, গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র তিন মাস বাকি। অথচ আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার কিংবা রাজনৈতিক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই ভারতে বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করা হচ্ছে। এটি ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি আটকে যাওয়ার ঘটনাকেই মনে করিয়ে দেয়।

বিবৃতিতে তারা বলেন, গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে সাম্প্রতিক সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার চেয়েও আরও বেশি গুরুত্ব ও তৎপরতার সঙ্গে এ বিষয়ে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তারা বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত ও জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন আইএফসির প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহমদ, আইএফসি নিউইয়র্কের চেয়ারম্যান সৈয়দ টিপু সুলতান ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন খান এবং আইএফসি বাংলাদেশের সভাপতি মোস্তফা কামাল মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম আজাদ।