চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা সফরের অংশ হিসেবে রোববার দিনভর ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো পরিদর্শন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন, ত্রাণ ও অনুদান বিতরণ এবং আলেম-ওলামাদের সঙ্গে মতবিনিময়সহ একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি। এসব কর্মসূচিতে দেশের উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগমন : রোববার সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর দিনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্রিফিং : বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের প্রশাসনিক ভবনে যান। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত ব্রিফিং গ্রহণ করেন তিনি।
এ সময় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা, উৎপাদন ও পরিচালন কার্যক্রম, উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। পাশাপাশি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তাঁর সামনে তুলে ধরা হয়।
প্রধানমন্ত্রী জানতে পারেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি শতভাগ দেশীয় প্রকৌশলী ও জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এতে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি দেশীয় প্রকৌশলী ও কর্মীদের দক্ষতার প্রশংসা করেন এবং তাঁদের উৎসাহ দেন। পরে প্রকল্প এলাকায় একটি নিমগাছের চারা রোপণ করেন তিনি।
৭০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্দেশে রওনা : ব্রিফিং শেষে প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি প্রস্তাবিত ৭০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশে করেন।
এলপিজি, এলএনজি ও কয়লা টার্মিনাল এলাকা পরিদর্শন : এরপর প্রধানমন্ত্রী এলপিজি, এলএনজি ও কয়লা টার্মিনাল-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এবং প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেন তিনি এবং বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন।
পরে কয়লা জেটি পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি টার্মিনাল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থাপনা পর্যবেক্ষণ করেন। কয়লা পরিবহন ও খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় বন্দর অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে এসব অবকাঠামোর সমন্বিত কার্যক্রম সম্পর্কেও তাঁকে অবহিত করা হয়।
বাঁশখালীর উদ্দেশে যাত্রা : মাতারবাড়ি প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে দুপুর ১টা ৫ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে বাঁশখালীর যান প্রধানমন্ত্রী। মাতারবাড়ি পরিদর্শনের সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মাতারবাড়ি থেকে বাঁশখালী পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন কর্মসূচিতে অংশ নেন। ‘গৃহ হস্তান্তর, অনুদান ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ’ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে তিনি বাঁশখালীর বাহারছড়া গ্রামের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি পরিবারের জন্য নির্মিত নতুন বাড়ির চাবি হস্তান্তর করেন।
‘বিএনপির সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ’: বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যাহত রাখা এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি দেশবাসীকে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু মানুষ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের যেন কোনোভাবে বিশৃঙ্খলা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ না দেওয়া হয়। বিভ্রান্তকারীরা চলে গেলেও শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের জনগণ।
পরিবার, নারী ও কৃষকদের জন্য কর্মসূচি : প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ সরকারকে নির্বাচিত করেছে। তাই সরকারের মূল দায়িত্ব জনগণের পাশে থাকা। মা-বোনদের পাশে থাকা, সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তরুণ-যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাই সরকারের দায়িত্ব।
তিনি জানান, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে এবং চলতি মাসের ১৬ তারিখ থেকে মূল কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিক করিডোর করার পরিকল্পনা : প্রধানমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হচ্ছে। সকালে মাতারবাড়ি, মহেশখালী ও মীরসরাই অঞ্চল পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশাল সমুদ্র বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অঞ্চলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে বহু শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে এবং হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের সময়ে এই খাত হাতে গোনা কিছু ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ব্যবস্থাকে জনগণের স্বার্থে পুনর্গঠন করতে সময় প্রয়োজন। তিনি জানান, আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কেমন হবে, সে বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উপজেলা পর্যায়ের ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে।
চট্টগ্রামের দুই মন্ত্রণালয়ের প্রসঙ্গ : প্রধানমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম থেকে দুইজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে অর্থ ও স্বরাষ্ট্র-দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে চট্টগ্রামের উন্নয়ন কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
আলেম-ওলামাদের সঙ্গে মতবিনিময় : বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে বাঁশখালী থেকে ফটিকছড়ি উপজেলায় পৌঁছান তিনি। হেলিকপ্টারটি ফটিকছড়ির পেলাগাজী দিঘির মাঠে অবতরণ করে। সেখানে অপেক্ষমাণ সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে তাঁদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।
ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদরাসায় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সভাটির বিকেলে অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের আগে আলেম-ওলামাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাবুনগর মাদরাসায় এসে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী।
মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের সময় আলেম-ওলামাদের সহযোগিতায় দেশকে একটি বিপদ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। তবে দেশের সমস্যা এখনো শেষ হয়নি। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে পরিকল্পনাহীনভাবে কাজ করার কারণে বর্তমানে জনগণকে তার খেসারত দিতে হচ্ছে। চলমান গ্যাস সংকট আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে অনেকটা কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে যেভাবে সবাই একসঙ্গে কাজ করেছেন, দেশ গঠনের কাজেও সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশের চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট, সেতু ও কালভার্টসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আলেম-ওলামাদের সরকারের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁরা সরাসরি সরকারে না থাকলেও সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। দেশের মানুষকে সঠিক পথে পরিচালনা এবং দেশকে সঠিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়।
ফটিকছড়ির কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটের তিনি হাটহাজারীতে পৌঁছে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় যান। সেখানে তিনি মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফির কবর জিয়ারত করেন। কবর জিয়ারত শেষে প্রধানমন্ত্রী হাটহাজারী জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয়। এরপর হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে হাটহাজারীর সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণে সহায়তা হিসেবে এক লাখ টাকা করে অনুদান প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের পক্ষ থেকে এসব অনুদান দেওয়া হয়। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ১৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের হাতে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবেও সহায়তা তুলে দেওয়া হয়।
হাটহাজারীর কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। দিনব্যাপী চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন কর্মসূচি শেষে সবশেষে রাতে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকায় পৌছান।