প্রত্যাশার চেয়েও বেশি প্রত্যাশা করতে গেলে আবারও বিপদ আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেন, অন্য কেউ যাতে মানুষের অতিরিক্ত প্রত্যাশার সুযোগ নিতে না পারে, সে বিষয়ে রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক কর্মী ও দলগুলোর সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা, ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ মোশারফ হোসেনের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘ফেনী আমার ফেনী’ আয়োজিত স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন।
শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য ও কাজের মধ্যে যেমন সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন, তেমনি মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গেও বাস্তবতার সমন্বয় থাকতে হবে। নির্বাচনের পর মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে এবং ৫ আগষ্টের পর রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের ধারণাও পরিবর্তিত হয়েছে। সেই ধারণা ধরে রাখার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের।
তিনি বলেন, সরকারে আসার ছয় মাসের মধ্যে সবার জন্য অনেক কিছু করে ফেলা হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিতে হয়। তবে ১৭ বছর ধরে মামলা, হামলা, অত্যাচার, নির্যাতন, গুম ও খুনের যে পরিস্থিতি ছিল, অন্তত সেখান থেকে তারা রেহাই পেয়েছেন।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক থাকা উচিত উল্লেখ করে এ্যানি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয়েছে। এখন দেশের মানুষের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। তারা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং সেই রাজনীতিই তাদের পথচলার ভিত্তি।
দৈনিক আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক ও বিএফইউজে’র সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে এবং বোরহান উদ্দিন ফয়াসাল ও আমির হোসেন জনির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত স্মরণ সভায় বিশেষ অথিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্সের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন, রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব সারওয়ার আলম, মরহুম মোশাররফ হোসেনের জ্যেষ্ঠ কন্যা ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকার পরিচালক ফারাহ আঞ্জুম বারী, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা মশিউর হরমান বিপ্লব, আবু তালেব, বিএনপি নেতা ইয়াকুব নবী, নুরুল আমিন ভূঁইয়া বাদশা, মোরশেদ আলম প্রিন্স, নাজমা সুলতানা ঝংকার প্রমুখ।
মুহাম্মদ মোশারফ হোসেনের স্মৃতিচারণ করে মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ফেনীর মানুষকে কিছু দেওয়া এবং তাদের পাশে থাকার তাগিদ থেকেই তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন। রাজনীতিতে এসে কোনো সুবিধা নেওয়ার চিন্তা তার ছিল না; বরং তিনি অনেক দিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে রাজনীতিতে এলেও ১৯৯০ সালের পর থেকেই তার সঙ্গে এ্যানির পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল।
বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, ফেনীবাসী মোশারফ হোসেনের শূন্যতা অনুভব করছেন। তিনি ছিলেন সবার অভিভাবক। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মামলা ও হুলিয়া নিয়ে ঢাকায় আশ্রয় নেওয়া বিএনপির নেতাকর্মীদের তিনি বটবৃক্ষের ছায়ার মতো আগলে রেখেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার অত্যন্ত বিশ্বস্ত মানুষ ছিলেন তিনি।
রাজনীতি ও মিডিয়ায় বড় অবদান ছিলো মোশারফ হোসেনে এই কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব সারোয়ার আলম বলেন, মোশারফ হোসেন ছিলেন মিডিয়ার আলোকবর্তিকা। তিনি অনেক জনপ্রিয় পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি বহু যোগ্য সাংবাদিক তৈরি করেছেন। সৎ জীবনযাপনের পাশাপাশি দেশে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছেন।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ব্যবসা, রাজনীতি ও ক্রীড়াক্ষেত্রে মোশারফ হোসেনের অবদান ছিল। ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় বাংলাদেশি স্পন্সর না পাওয়া গেলে তিনি এগিয়ে এসেছিলেন। ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন তাকে সব সময় ইতিবাচক মানুষ হিসেবে স্মরণ করেন।
মোশারফ হোসেনের বড় মেয়ে ফারাহ আঞ্জুম বারী বলেন, বাবা পোশাক রপ্তানিকারক সংগঠনের সভাপতি, জনশক্তি রপ্তানিকারক সংগঠন বায়রার সভাপতি, ইসলামী ব্যাংকের ফাউন্ডার স্পন্সর ডিরেক্টর এবং ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের স্পন্সর ডিরেক্টর ছিলেন। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল একজন ভালো মানুষ হিসেবে—এমন মন্তব্য করে মেয়ে সবার কাছে বাবার জন্য দোয়া চান।
আমার দেশ পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক ও বিএফইউজের সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ বলেন, মোশারফ হোসেন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হলেও মিডিয়ার প্রতি তার দরদ ও দায়বদ্ধতা এবং সাংবাদিকতা বিকাশে অবদান ছিল অসামান্য। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের তার এই অবদান জানা প্রয়োজন।
এম আবদুল্লাহ আরও বলেন, ১৯৯৫ সালে ঢাকায় ফেনী সাংবাদিক ফোরাম প্রতিষ্ঠায় মোশারফ হোসেনের বড় অবদান ছিল। তার উৎসাহ ও সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত এ সংগঠনটি পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগে সাংবাদিক ফোরাম গঠনে অনুপ্রেরণা জোগায়। ছোটখাটো আয়োজন করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ সম্ভব নয়; তার জীবন ও অবদান নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রকাশনা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মোশারফ হোসেনকে ভুলে গেলে নিজেদের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের তার অবদান জানতে হবে। ‘কনসেপ্ট’সহ বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে তিনি অনেক সাংবাদিককে গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছেন।
স্মরণসভায় এ ছাড়াও রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা মোশারফ হোসেনের রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসায়িক ও গণমাধ্যমে অবদানের পাশাপাশি তার সততা, বিনয়, মানবিকতা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথা স্মরণ করেন। শেষে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।