ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে আয়োজিত ‘ফেলানীকে উদ্দেশ্য করে খোলা চিঠি লিখন প্রতিযোগিতা-২০২৬’ এর পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেল ৫টায় ডাকসুর সভাকক্ষে এ পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার হিসেবে নগদ অর্থ ও সনদ তুলে দেন অতিথিবৃন্দ।

প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারীকে ৫ হাজার টাকা, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারীকে ৩ হাজার টাকা এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারীকে ২ হাজার টাকা নগদ পুরস্কার প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ১৩ জন বিজয়ীকে সনদপত্র ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুরে এজিএস মুহা: মহিউদ্দিন খান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ।

সুফিয়া কামাল হল সংসদের সাহিত্য সম্পাদক সানজিদা আক্তার শ্রেয়সী বলেন, ফেলানী আমাদের যুগেরই একজন হয়েও আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের এমন এক প্রতীক, যার আত্মত্যাগ আমাদের সার্বভৌমত্বের মর্যাদা রক্ষা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা যোগায়। তাই এই আত্মত্যাগকে ভুলে না গিয়ে, সীমান্ত হত্যার সঠিক বিচার ও দেশের স্বার্থরক্ষায় আমাদের জাতীয় সংগ্রামকে জিইয়ে রাখতে হবে। রাজনৈতিক হানাহানিতে সাধারণ মানুষকে জীবন দিতে হয়; এই হানাহানি যত কমিয়ে এনে রক্ত ঝরানো ও মানুষের ক্ষতি বন্ধ করা যায় সেদিকে আমাদের সোচ্চার থাকতে হবে।

শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের ভিপি আহসান হাবীব ইমরোজ বলেন, ফেলানীর আত্মত্যাগ আমাদের সার্বভৌমত্ব ও ন্যায্য অধিকার রক্ষার সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক। তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে সীমান্ত হত্যা ও যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মকে সোচ্চার হতে হবে।

স্বাগত বক্তব্যে মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ডাকসুর ভিপি জিএস এজিএসসহ আরও কিছু মানুষ সহযোগিতা না করলে আমাদের এই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান এবং স্মারকগ্রন্থটির আলোর মুখ দেখা অসম্ভব ছিল। অর্থনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক— যে যেভাবেই সহযোগিতা করে আমাদের পাশে ছিলেন, সবার প্রতি গভীর ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। শহীদ ফেলানী আমাদের হৃদয়ের কাঁটায় ঝুলে থাকা এক রক্তজবার নাম। ২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি ১১ বছরের এক অবুঝ শিশুকে হত্যা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। এটি কেবল একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড ছিল না; বরং দীর্ঘকাল ধরে এদেশের মানুষের ওপর যে ভারতীয় আধিপত্যবাদ, নিষ্পেষণ ও শোষণ চলছে, এটি ছিল সেই আধিপত্যবাদেরই এক নির্মম প্রতীক। নিজেদের আধিপত্য প্রদর্শন ও এই হত্যাকাণ্ডের বৈধতা প্রমাণের জন্যই তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটি শিশুর লাশ এভাবে ঝুলিয়ে রেখেছিল।

তিনি বলেন, গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে আমরা আশা করেছিলাম—সীমান্ত হত্যা, কূটনৈতিক সম্পর্ক, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, কিংবা অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান নেবে এবং বিগত ১৫-১৬ বছরের বৈষম্যমূলক চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তেমন কোনো চুক্তি বাতিল করা হয়নি কিংবা সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে কোনো বলিষ্ঠ প্রতিবাদও আমরা দেখতে পাইনি। ভারতের রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় গোপন চক্রান্তে ও গণহত্যার সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ডেল্টাগ্রামের প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট হয়ে, উচিৎ ছিলো এই গণহত্যার সহযোগীকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা। অথচ তাকে গ্রেফতার তো পরের বিষয় 'পারসোনা নন গ্রাটা' ঘোষণা করা দূরে থাক, রাষ্ট্র থেকে একটি সাধারণ প্রতিবাদ বিবৃতিও আমার চোখে পড়েনি।

মুসাদ্দিক আরও বলেন, তবে আশার কথা হলো, এদেশের সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা এখন নিজেদের অধিকার রক্ষায় সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ছেন। কিন্তু এই শোষণমূলক কাঠামোর তো কোনো পরিবর্তন হয়নি। সরকারের কাছে আমাদের দাবি—প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে হলেও ফেলানীসহ প্রতিটি সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের বিচার আদায় করতে হবে। ফেলানীদের মা-বাবার আকুতি আমরা শুনেছি; বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার বিচার চায়নি বলে বিচার হয়নি, কিন্তু বর্তমান সরকারও যদি নীরব থাকে, তবে মানুষ ধরে নেবে আপনারাও একই ফ্যাসিবাদী হাসিনার আচরণের পুনরাবৃত্তি করছেন।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবহেলার কারণে আজকের এই অনুষ্ঠানে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। আপনারা জানলে অবাক হবেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসুর এই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরকে একদমই নামমাত্র ও অপমানজনক বাজেট প্রস্তাব করেছিল। ১৯ এর ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি দফতর ১৫+১৫ অর্থাৎ মোট ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল। কিন্তু এই-বার আমার এই দফতরে ১/১.৫ লাখ টাকা দিতে চেয়েছিল। আমি সেই ভিক্ষামূলক বরাদ্দ প্রত্যাখ্যান করেছি এবং নিজেদের চেষ্টায় বেসরকারি অনুদান ও সহযোগীদের মাধ্যমে এই স্মারকগ্রন্থ প্রকাশসহ প্রায় ২০টির মতো প্রকাশনার কাজ সম্পন্ন করেছি।

তিনি আরও বলেন, তারা ভেবেছিল বরাদ্দ না দিয়ে আমাদের আটকে দেবে এবং ব্যর্থ প্রমাণ করবে, কিন্তু আমরা সেই চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরের সাতটি ডাকসুর সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক মোট কাজের তুলনা করলেও এবারের ডাকসুর প্রথম ছয় মাসের কাজ তাদের কাজের চেয়ে অনেক বেশি হবে। আমরা শিক্ষার্থীদের রায় আকাঙ্ক্ষার শতভাগ মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ডাকসু নির্বাচন যাতে নিয়মিত হয়, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সোচ্চার থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। যারা এই কাজের পেছনে পরিশ্রম ও সহযোগিতা করেছেন, সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাকসুরে এজিএস মুহা: মহিউদ্দিন খান বলেন, ফেলানী আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক। ফেলানী মূলত আমাদেরই প্রজন্মের একজন ছিলেন। ২০১১ সালে যখন এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে, তখন হয়তো আমরা অতটা সচেতন ছিলাম না। কিন্তু পরবর্তীতে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পর আমরা অনুধাবন করেছি, এই হত্যাকাণ্ড পুরো জাতিকে কতটা গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

তিনি বলেন, জাতি আলোড়িত হলেও তৎকালীন সরকারে যারা ছিলেন, তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেননি। গত ১৭ বছরে দেশের সার্বভৌমত্ব কীভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে এবং পররাষ্ট্রনীতি কতটা দুর্বল ছিল, তার নথিপত্র খুঁজলেই স্পষ্ট হয় যে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার কীভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে পররাষ্ট্রনীতিতে একটি কঠোর ও প্রশংসনীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। তবে সীমান্ত হত্যা নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর মতামত তৈরি হচ্ছে। সীমান্ত হত্যার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে যদি ফেলানীর ঘটনাকে এর বাইরে বা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে তার আত্মত্যাগকে খাটো করা হবে। এ দেশের নাগরিক হিসেবে মৃত্যুর পরও ফেলানীর সঠিক বিচার পাওয়ার পূর্ণ অধিকার ছিল। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের এই বিচার পাওয়ার ব্যাপারে কোনো সদিচ্ছাই ছিল না। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন ও রাজনৈতিক সরকারের কাছে আমরা পদক্ষেপ গ্রহণের যে আশা করেছিলাম, তা-ও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

মহিউদ্দিন খান বলেন, পররাষ্ট্রনীতিতে তিস্তার পানির ন্যায্য বণ্টন এবং কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব কুক্ষিগত না রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার ক্ষেত্র রয়েছে। অথচ সেসব মূল বিষয় রেখে সীমান্ত হত্যার সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা সমীচীন নয়। আমাদের মূল দায়িত্ব হলো—যাঁরা জীবন দিয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা আমাদের দিয়ে গেছেন, তাঁদের স্মরণ রাখা। ফেলানীর আত্মত্যাগ যেন আমরা ভুলে না যাই, আমাদের আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের ধারায় যাতে তাঁর স্মৃতির ধারাবাহিকতা থাকে—ডাকসু মূলত সেই কাজটাই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। যাঁরা কঠোর পরিশ্রম করে এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছেন তাঁদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি, বিজয়ী বন্ধুদের অভিনন্দন জানাচ্ছি এবং আজকের অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল অতিথিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আসফাকউল্লাহ আসিফের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য আনাস ইবনে মুনির, আফসানা আকতার, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের ভিপি আহসান হাবীব ইমরোজ, সুহাইল মাহদীন, ডাকসু ও হল সংসদের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।