সরদার আবদুর রহমান, রাজশাহী ব্যুরো
জাতীয় সংসদে কোনো সদস্যের দেয়া বক্তব্য বা তার কোনো শব্দ ‘অসংসদীয়’ মনে হলে তা সংসদের কার্যবিবরণী থেকে মুছে দেয়ার বা এক্সপাঞ্জ করার বিধান রয়েছে। সংসদের স্পিকার তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে এটি করার জন্য রেকর্ডিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে নির্দেশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু যে সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছে বা অবলুপ্ত হয়ে গেছে তার কোনো বিষয় যদি আপত্তিকর বা এক্সপাঞ্জ করার যোগ্য হয়ে থাকে তাহলে তার বিধান কি?
এই প্রশ্ন উঠেছে বিগত আওয়ামী সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন সংসদের কার্যবিবরণীতে এরকম বহু সংখ্যক অসত্য ও আপত্তিকর বিষয় লিপিবদ্ধ রয়ে গেছে- যেগুলো এক্সপাঞ্জ করা জরুরি। নচেৎ এগুলো ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে সংরক্ষিত থেকে যাবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকগণ। উল্লেখ করা যেতে পারে, সেই সব ‘মিথ্যাচার’ ও বিরোধী রাজনীতিকদের চরিত্র হনন ছিল একপ্রকার ডালভাতের মতো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদকে কেবল নিজেদের দলীয় অপরাজনীতির পক্ষে ব্যবহার করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা বিরোধী রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দের চরিত্র হনন করার প্লাটফর্ম হিসেবেও কাজে লাগিয়েছিল। সেই সব অপকীর্তির কার্যবিবরণী (চৎড়পরফরহমং) সংসদের রেকর্ডে থেকে গেছে। তদন্ত ও পর্যালোচনা করে সে সব বিষয় বাদ (ঊীঢ়ধহমব) দেয়া জরুরি বলে রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। দল হিসেবে আ’লীগ ও জোটের সদস্যরা তো বটেই, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে এমন অসত্য ও মনগড়া বক্তব্য দিয়ে সংসদের কার্যবিবরণীকে কলুষিত করে চলেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে তারা সংসদকে তথাকথিত ‘প্রাণবন্ত’ বলে আত্মতৃপ্তি লাভ করতেন। বিগত আওয়ামী নেতৃত্বাধীন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় রাজনীতি ও তার নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও অপবাদমূলক বক্তব্য সংসদে রক্ষিত কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি যা বলে
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের পরিচালনা কার্যপ্রণালী বিধি মোতাবেক স্পিকার মনে করলে স্বপ্রণোদিত হয়ে বা কোনো সদস্যের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে বক্তব্যটি কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেয়ার আদেশ দিতে পারেন। সে মোতাবেক অংসদীয় শব্দ যেমন- ব্যক্তিগত আক্রমণ, কদর্য বা অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করলে তা সাধারণত এক্সপাঞ্জ করা হয়। একবার এক্সপাঞ্জ হলে, সেটি সংসদের মূল রেকর্ড বা প্রকাশনা থেকে বাদ পড়ে যায়। যদিও বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করা যায়, তবুও সংসদে দেয়া বক্তব্যের জন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে বাইরে কোনো মামলা করা যায় না। কার্যপ্রণালী বিধিতে উল্লেখ করা হয়, স্পিকার যদি মনে করেন যে, বিতর্কে এমন সকল শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা অবমাননাকর বা অশোভন বা সংসদ-রীতি বিরোধী বা অমর্যাদাকর, তাহলে তিনি নিজ ক্ষমতাবলে অনুরূপ শব্দাবলীকে সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাতিল করতে পারবেন। এতে আরো বলা হয়, সংসদের মুদ্রিত বিতর্কে অনুরূপভাবে বাতিলকৃত সংসদের কার্যনির্বাহের অনুরূপ বাতিলকৃত অংশকে তারকাচিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত করা হবে এবং পাদটিকায় “সভাপতির আদেশক্রমে বাতিল করা হলো”- এই মন্তব্য সন্নিবেশিত হবে।
মিথ্যা বিবরণের নমুূনা
জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের মিথ্যা বিবরণের বেশ কিছু নমুূনা পাওয়া যায়। যেমন, ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় উত্তরের জেলা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গার মাস্টারপাড়ার নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলীতে নিহত হন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। এ ঘটনায় লিটনের বড় বোন ফাহমিদা কাকলী বুলবুল সুন্দরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাত পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামী দেখানো হয়। ঘটনার পর এ হত্যাকা-ের জন্য জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করা হয়। সে সময় জামায়াত-শিবিরের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। দেশজুড়ে চলে অপপ্রচারের বন্যা। এমনকি জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তৃতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ঘটনার জন্য ঢালাওভাবে জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। সেই বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরণীতে থেকে গেছে বলে অনুমিত হয়। এছাড়া একটি ভিডিও কনফারেন্সে শেখ হাসিনা সাবেক এমপি লিটন হত্যার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘সংসদ সদস্য লিটন সবসময় এলাকায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন। জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। এলাকার মানুষের শান্তি নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন।’
একজন শীর্ষ দায়িত্বশীল ব্যক্তির এরকম দায়িত্বহীন বক্তব্যে জাতি হতবাক হয়ে যায়। কেননা পরবর্তীকালে এ হত্যাকা- ঘটানোর জন্য আওয়ামী লীগেরই সহযোগী জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি ও দলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) আবদুল কাদের খানসহ তার কতিপয় নেতা জড়িত থাকা আদালতে প্রমাণিত হয়। আবদুল কাদের খানসহ সাত আসামীকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত অন্য আসামীরা হলেনÑ আবদুল কাদের খানের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. শামসুজ্জোহা, গাড়িচালক আবদুল হান্নান, গৃহকর্মী মেহেদী হাসান, শাহীন মিয়া ও আনোয়ারুল ইসলাম রানা এবং চন্দন কুমার সরকার। এর মধ্যে কাদের খানসহ ছয়জন আসামী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। অপরজন চন্দন কুমার সরকার ভারতে পলাতক অবস্থায় সেখানে গ্রেফতার হন।
এদিকে সংসদের বাইরে ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনার সময় মনজুরুল ইসলাম লিটন এমপিকে হত্যার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করায় এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের হত্যার ঘটনার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের কারো কোনো সম্পর্ক থাকার প্রশ্নই ওঠে না। জামায়াত-শিবিরের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার জন্যই প্রধানমন্ত্রী সংসদে ওই অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। এই প্রতিবাদ গণমাধ্যমে প্রচারিত হলেও এই বিবৃতি সংসদের কার্যবিবরণীতে কোনো স্থান পাওয়ার কথা নয়। ফলে একটি মিথ্যা ও একতরফা বক্তব্য সংসদের বিবরণীতে পাকাপোক্ত হয়ে থাকলো।
জিয়াকে নিয়ে বক্তব্য
বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে নিয়ে সংসদে আপত্তিকর বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের এমপিরা। ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সে সময়ের আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেছিলেন, “সংসদ ভবন নিয়ে লুই কানের যে নকশা, সেখানে কোথায় রয়েছে যে চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের লাশ দাফন করতে হবে? সেখানে লাশ আছে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেগম জিয়া তার স্বামী মনে করে কাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানান? তারই উচিত এ প্রশ্ন করা, ওনার স্বামীর লাশ সেখানে আছে কি-না? আপনারা দলের নেতা ভেবে কাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন? ওখানে কি কারো মৃতদেহ আছে? নাকি অন্য কারো মৃতদেহ আছে?’ এছাড়া পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সরকারি দলের এমপি শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের লাশ নেই, সেটা ৪০ বছর আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে শেখ সেলিম বলেন, ‘ওখানে যে বাক্সটা আছে, তা সরিয়ে লুই কানের নকশা বাস্তবায়ন করেন।’ জিয়াউর রহমানকে নিয়ে সংসদে সরকার দলীয় এমপিদের এসব বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি করেন বিএনপি’র এমপিরা। তবে এক্সপাঞ্জ করার দাবির প্রশ্নে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী কোনো মন্তব্য করেননি।
খালেদা জিয়াকে নিয়ে মন্তব্য
এর আগে ২০১৩ সালের ২০ জুন জাতীয় সংসদে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে খুবই বাজে, আপত্তিকর ও মানহানিকর বক্তব্য দেন সরকারদলীয় এমপি অপু উকিল। সেই বক্তব্যের অশালীন বিবরণ উদ্ধৃত করা কোনো ভদ্র মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে বলা যায় যে, সংসদে খালেদা জিয়ার নিজের জন্ম এবং তার সন্তানদের জন্ম নিয়ে সেসব বক্তব্য কোনোভাবেই সংসদীয় আচরণের মধ্যে পড়ে না।
অপু উকিলের এই বক্তব্যের সময় বিএনপি ও জামায়াতের এমপিরা তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং সমস্বরে ছিঃ ছিঃ ধ্বনি দেন। বিএনপির এমপিরা অপু উকিলের মাইক বন্ধ করে দেয়ার জন্য স্পিকারের কাছে দাবি জানান। অপু উকিল সংসদে তার বক্তব্য অব্যাহত রাখলে রাত ৮টা ৫৭ মিনিটে বিএনপি-জামায়াতের এমপিগণ ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের নেতৃত্বে ওয়াকআউট করেন। এ সময় ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন। অপু উকিলের বক্তব্যের সময় সরকারি দলের সাংসদরা টেবিল চাপড়ে উৎসাহ দেন।
সংশোধন কীভাবে
যদি সংসদের কার্যবিবরণীতে এমন কিছু থাকে তাহলে তার সংশোধনী কীভাবে সম্ভব? এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও আইন অনুষদের সাবেক ডিন প্রফেসর ড. মো. আবদুল হান্নান বলেন, “সংসদে এধরনের বিষয় অভূতপূর্ব। তবে সংসদের কার্যবিবরণীকে কোনো ধরনের অসত্য বর্ণনা থেকে পরিচ্ছন্ন রাখার স্বার্থে বর্তমান সংসদ নজির স্থাপন করতে পারে। সংসদে প্রস্তাব আকারে বিষয়টি উত্থাপন করে এবিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে।”
পূর্ববর্তী সংসদের কার্যবিবরণী থেকে ভুল, অসত্য ও ভিত্তিহীন বক্তব্য অপসারণ করা বর্তমান সংসদের পক্ষে করা সম্ভব কি-না এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গবেষক ও কলাম লেখক ড. তারেক ফজল বলেন, আগের কার্যবিবরণীতে ‘কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অশুদ্ধি’ চিহ্নিত করে সংসদের সংশ্লিষ্ট আলোচ্যসূচিতে তালিকাভুক্ত করে তা আলোচনায় এনে সংশোধনের প্রস্তাব করা যায়। এক্ষেত্রে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৯ম ১০ম অধ্যায় অনুসরণ করা যেতে পারে। এই বিধির ৩১৬ নং ক্রমিকে উল্লেখ আছে, “সংসদ এবং সংসদের কমিটিসমুহের কার্যাবলী সম্পর্কিত বিষয় হইতে কোন বিষয় উদ্ভুত হইলে এবং সে সম্পর্কে এই বিধিসমুহে নির্দিষ্ট কোন বিধান না থাকিলে সে ব্যাপারে স্পিকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবেন এবং স্পিকারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া গণ্য হইবে।”