বিষাদে পরিণত হলো ঈদ আনন্দ

ঈদের ছুটিতে বেড়েছে হামের রোগী

ঈদের পাঁচ দিনের ছুটিতে হাম ও উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৩০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল ৩১ মে রোববার দুই শিশু প্রাণ হারিয়েছে, আগের দিন ৩০ মে শনিবার ৮ জন, ২৯ মে শুক্রবার ১০ জন, ২৮ মে বৃহস্পতিবার ৫ জন এবং ২৭ মে বুধবার ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা এক হাজার ৩২৪ জন এবং গত ১৫ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা ৭০ হাজার ৯৩৬ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা ৫৩ জন, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা নয় হাজার ৪৯ জন। ১৫ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৬ হাজার ৮৮৬ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫২ হাজার ৮৪১ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৫ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে মোট ৪৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে কেউ মারা যায়নি এবং ১৫ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। হামের উপসর্গে আক্রান্ত দুই শিশু ঢাকা ও বরিশালে মারা গেছে।

এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৪৯৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৯০ শিশু। মোট ৫৮৫ শিশু মারা গেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার রোধে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তাঁরা।

এদিকে রাজধানীর ঢাকা শিশু হাসপাতালে বর্তমানে বিপুল সংখ্যক শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়ি–জাতীয় উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ বাড়ায় চিকিৎসা কার্যক্রমও বাড়তি চাপের মধ্যে চলছে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট ঘুরে দেখা গেছে, অন্য সময়ের তুলনায় রোগীর চাপ কিছুটা কমলেও জরুরি বিভাগ ও বিভিন্ন ওয়ার্ডে শিশু রোগী নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন স্বজনরা।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দেখা যায়, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও বিভিন্ন সংক্রমণজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা আসছেন চিকিৎসা নিতে। অনেকেই ঈদের ছুটি গ্রামে না গিয়ে সন্তানের চিকিৎসার জন্য ঢাকাতেই অবস্থান করেছেন। অভিভাবকরা জানানা, ঈদের আনন্দের মধ্যেও সন্তানের অসুস্থতা তাদের উদ্বেগে রেখেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো টিকা প্রদান এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এদিকে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঈদের ছুটির সময় রাজধানীর বাইরে থেকে আসা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মৃত্যুহার উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

এদিকে ঈদের ছুটির মধ্যে ডিএনসিসি হাসপাতালে বেড়েছে হামে আক্রান্ত রোগীর চাপ। যার অধিকাংশই ঢাকার বাইরে থেকে আসা। বৃহস্পতিবার (২৯ মে) ঈদের দ্বিতীয় দিনেও হামের জন্য বিশেষায়িত রাজধানীর মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালের করিডরে দেখা যায় রোগীর ভিড়। শুক্রবার (২৮ মে) ঈদের দিন সকাল থেকে এই ভিড় আরো বাড়তে থাকে।

ঈদের ছুটিতে বেড়েছে হামের রোগী

চিকিৎসকরা আশঙ্কা করেছিলেন, ঈদ মৌসুমে বাড়তে পারে হামের প্রকোপ। যাত্রাপথের জনসমাগমে সংক্রমণ আরও বাড়ার শঙ্কা করেন তারা। যার প্রভাব এরইমধ্যে দেখা যাচ্ছে হাসপাতালগুলোতে। হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে হাসপাতালেই ঈদ কাটাচ্ছেন বাবা-মায়েরা। বেশিরভাগ ঢাকার বাইরে থেকে আসা।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, রিলিজ নেয়া রোগীর তুলনায় নতুন রোগী ভর্তির পরিমাণই বেশি। অনেকের পরিবার ও আত্মীয় স্বজন হামে আক্রান্ত ছিলেন, সেখান থেকে সংক্রমিত হয়েছে বলে মনে করছেন স্বজনরা। নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নন্দিতা সাহা জানান, ঈদে রোগীর চাপ বেড়েছে। ভাইরাসটি ছোঁয়াচে হওয়ায় ঈদের এই সময়ে আশংকাজনক হারে বাড়তে পারে হাম সংক্রমণ।

তবে টিকার কার্যকারিতা শুরু হওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতায় সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।

ঈদের আনন্দে বিষাদ

গতকাল রোববার ছিল পবিত্র ঈদুল আযহার সরকারি ছুটির শেষ দিন। এদিন গ্রামের বাড়ি থেকে ছুটি কাটিয়ে ঢাকার ফেরার কতা ছিল বেসরকারী চাকরিজীবী আব্দুল করিমের। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার জন্য ২৬ মে রাত সাড়ে ১১টায় ইকোনো সার্ভিসের টিকিটও কেটেছিলেনও। কিন্তু ভাগ্য তাকে রেখে দিয়েছে শিশু হাসপাতালে। আব্দুল করিম বলেন, ‘আমার দুইটা মেয়ে, একটা ১০ বছর, আরেকটা ৭ বছরের। সকাল থেকে ছোট বাচ্চাটার জ্বর, বমি ও পাতলা পায়খানা হচ্ছিল। ভাবলাম, ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ নিয়ে যাই। সন্ধ্যার দিকে শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসছি। ডাক্তার বলল, ওর তো হাম হয়েছে বোধহয়। চিকিৎসার জন্য ভর্তি থাকতে হবে। বাচ্চার সুস্থতা তো আগে। সেই ২৬ তারিখ থেকে আজও এখানে। সারা দিনরাত কখনো রাস্তায়, কখনো ভেতরে বা করিডোরে, এভাবে সময় কাটাচ্ছি। মাটি হয়ে গেছে ঈদ। বেতন ও বোনাস মিলে ৩০ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। সেগুলোও এই কয়দিনে শেষ প্রায়।’

শুধু আব্দুল করিম নন, শিশু সন্তানকে ভর্তি করে এভাবে মাদুর পেতে শুয়ে-বসে বা দাঁড়িয়ে দিনরাত কাটিয়ে দিচ্ছেন অন্তত অর্ধশত মানুষ। এর বাইরেও নানা ধরনের রোগী তো আছেই। ঈদের আনন্দ মাটিচাপা দিয়ে শিশু হাসপাতালের এই কক্ষ থেকেই ওই কক্ষে দৌড়াচ্ছে মানুষ। রোদের তাপ, মানুষের চাপ আর চিকিৎসার হাহাকার। এক হৃদয়বিদারক চিত্র হাসপাতালে।

শিশু হাসপাতালে ১১৮ শিশু হাম আক্রান্ত বা হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৯৪১ জন হাম নিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছে। মারা গেছে ৩৫ জন।