হলের খাবারের মান নিয়ে সমালোচনা করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেওয়ার অপরাধে একজন সাধারণ আবাসিক শিক্ষার্থীকে নিজের রুমে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে প্রহার করার অভিযোগ উঠেছে হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুনের বিরুদ্ধে। এই ঘটনার পর ভিক্টিম শিক্ষার্থী এবং হল সংসদের প্রতিনিধিরা প্রভোস্ট ও জড়িত কর্মচারীদের বিচার চেয়ে সিসিটিভি ফুটেজ দেখার দাবি জানালে তাদের ওপর যৌথভাবে হামলা চালায় ছাত্রদলের শহীদুল্লাহ্ হল এবং ফজলুল হক হল শাখা। তাদের এই সন্ত্রাসী হামলায় ফজলুল হক হলের ভিপি খন্দকার মো. আবু নাঈম এবং জিএস ইমামুল হাসান, পাঠকক্ষ সম্পাদক মো. তায়েফ এছাড়াও মুজিব হল জিএস আহমেদ আল সাবাহ, শহিদুল্লাহ হলের সমাজসেবা সম্পাদক সাজু মিয়াসহ ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।

আজ সোমবার (১৭ আগস্ট) এক সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

লিখিত বক্তব্যে শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মহিউদ্দিন খান বলেন, রুমে ঢোকার পর ওই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জোরপূর্বক মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর প্রভোস্ট তার অনুগত স্টাফদের (ইলেকট্রিশিয়ান মারুফ, প্রধান সহকারি আরিফ হোসেনসহ আরও ৪-৫ জন) দিয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে টানা দেড় ঘণ্টা ওই শিক্ষার্থীর ওপর অবর্ণনীয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালান।

অভিযোগে বলা হয়, ছাত্রত্ব ও সিট বাতিলের হুমকি, সাইবার মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে প্রভোস্ট নিজের হাতে একটি মিথ্যা স্ক্রিপ্ট লিখে ওই শিক্ষার্থীকে দিয়ে জোরপূর্বক সিগনেচার করিয়ে নেন।

সেই জোরপূর্বক নেওয়া জবানবন্দিতে লেখানো হয় যে, ফজলুল হক হল সংসদের ভিপি, জিএস এবং এজিএসের প্ররোচনায় সে এই পোস্ট দিয়েছে। ভয়ের চোটে এবং ট্রমায় শিক্ষার্থী যখন কাঁদছিল, তখন তাকে এই ঘটনা বাইরে প্রকাশ না করার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি ইইই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী কেও একইভাবে শায়েস্তা করার দম্ভোক্তি করেন এই প্রভোস্ট। এটি কোনো শিক্ষকের আচরণ হতে পারে না, এটি একটি টর্চার সেলের জল্লাদের আচরণ।

এই ঘটনার পর ভিক্টিম শিক্ষার্থী এবং হল সংসদের প্রতিনিধিরা প্রভোস্ট ও জড়িত কর্মচারীদের বিচার চেয়ে সিসিটিভি ফুটেজ দেখার দাবি জানান। কিন্তু প্রশাসন টানা ৭ ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে রেখে কালক্ষেপণ করে। কখনো বলা হয় ভিডিও করা যাবে না, কখনো বলা হয় ১০-১২ জন দেখতে পারবে, এরপর কমিয়ে ৩-৪ জন এবং শেষে মাত্র ২ জন ভিক্টিম ও ভিপির কথা বলা হয়। শিক্ষার্থীরা প্রতিটি শর্ত মেনে নেওয়ার পরও, ঘটনাস্থলে উপস্থিত দুই প্রো-ভিসি উল্টো শিক্ষার্থীদের দোষারোপ করে ফুটেজ না দেখিয়েই চলে যেতে চান। যখন শিক্ষার্থীরা এর সুরাহা দাবি করে, তখনই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয় নব্য ফ্যাসিস্টদের রক্ষাকর্তা ছাত্রদল।

​এ সময় শহীদুল্লাহ্ হল ছাত্রদল এবং ফজলুল হক হল ছাত্রদল যৌথভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়। তাদের এই সন্ত্রাসী হামলায় ফজলুল হক হলের ভিপি খন্দকার মো. আবু নাঈম এবং জিএস ইমামুল হাসান, পাঠকক্ষ সম্পাদক মো. তায়েফ এছাড়াও মুজিব হল জিএস আহমেদ আল সাবাহ, শহিদুল্লাহ হলের সমাজসেবা সম্পাদক সাজু মিয়া মারাত্মকভাবে আহত হন। শ্বাসকষ্টসহ গুরুতর অবস্থায় ইমামুল হাসানসহ প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।

​মহিউদ্দিন খান বলেন, একটি ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রদলের উচিত ছিল ওই নির্যাতিত শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু তারা তা না করে, উল্টো একজন নিপীড়ক প্রভোস্টকে বাঁচাতে নিজেদের সহপাঠীদের ছাত্রলীগের মতো রক্তাক্ত করতে দ্বিধা করেনি। আমাদের আশঙ্কা করছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও একদলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় আছে বিএনপির নিয়োগকৃত প্রশাসন ও বিএনপির ছাত্রসংগঠন, ছাত্রদল।

তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতনের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্রদল নব্য ছাত্রলীগের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেশব্যাপী নজিরবিহীন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। এই আধিপত্য বিস্তারের পথে একমাত্র বাধা ইসলামী ছাত্রশিবির ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন শিক্ষার্থীরা তাই তাদের ওপর পরিকল্পিতভাবে একযোগে হামলা চালিয়ে ছাত্রদল সারাদেশের ক্যাম্পাসগুলোকে রক্তাক্ত করছে।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শাহবাগ থানায় হামলা বা শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্টের রুমে ঢুকেই তাণ্ডব চালিয়েছে ছাত্রদল যা বিএনপির প্রশাসন কোন বিচার করে নাই এছাড়াও সারা দেশে সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা আলিয়া, চট্টগ্রাম, ঢাকা পলিটেকনিক এবং তিতুমীর কলেজের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়েছে ছাত্রদল। এমনকি দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী কিংবা নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের মতো হাসপাতালেও ঢুকে চিকিৎসাধীন আহত শিক্ষার্থীদের ওপর তারা যে বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে ছাত্রদল । ছাত্রদলের এই পরিকল্পিত সন্ত্রাস শিক্ষাঙ্গনে নতুন ফ্যাসিজম কায়েমের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। আমরা সেইসব সুশীল সমাজ ও ন্যারেটিভ মেকারদের সতর্ক করে বলতে চাই, ছাত্রদলের একপাক্ষিক হামলাকে হামলাকে কোনোভাবেই 'শিবির-ছাত্রদল সংঘাত' বলে সরলীকরণ করার সুযোগ নেই।

শিবিরের দাবিসমূহ:

​১. প্রভোস্টের পদত্যাগ ও শাস্তি: একজন শিক্ষার্থীকে অবরুদ্ধ করে মানসিক নির্যাতনকারী এবং জোরপূর্বক মিথ্যা জবানবন্দি আদায়কারী এবং ছাত্রদলকে ডেকে এনে শিক্ষার্থীদের উপর সন্ত্রাসী কায়দায় হামলাকারী ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট ড. ইলিয়াস আল মামুনকে আজীবনের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

২. জড়িত কর্মচারীদের বহিষ্কার: শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলা এবং মোবাইল কেড়ে নেওয়ায় জড়িত স্টাফ মারুফ ও আরিফ হোসেনসহ অন্যদের চাকরিচ্যুত করতে হবে।

৩. হামলাকারী ছাত্রদল ক্যাডারদের বিচার: সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও এভিডেন্স দেখে, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী ছাত্রদলের চিহ্নিত ক্যাডারদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করতে হবে।

৪. নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিতকরণ: শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির মুখে কোনো ছাত্রসংগঠন যেন পেশিশক্তি ব্যবহার করে প্রশাসনের লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করতে না পারে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে তার লিখিত গ্যারান্টি দিতে হবে।

​অনেক রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে আমরা এই ক্যাম্পাসকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করেছি। কিন্তু সন্ত্রাসীদের শুধু সাইনবোর্ড বদল হবে, আর কাজ আগের মতোই থাকবে এটা আমরা মেনে নেব না। আমাদের আহত ভাইদের রক্ত এখনো শুকায়নি। আমরা আমাদের লড়াই অব্যাহত রাখবো। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির রাজপথ ছাড়বে না।