২০২৪ সালের ৫ আগস্ট—দেশজুড়ে তখন এক নতুন ভোরের অপেক্ষা। সেই সকালে রাজধানী গেণ্ডারিয়ার বাসা থেকে বের হওয়ার আগে পরম শ্রদ্ধায় ও আবেগে মাকে একটি চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিলেন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহরিয়ার খান আনাস। সেই চিঠিতে লুকিয়ে ছিল দেশপ্রেম আর বৈষম্যহীন এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেদিনই চাঁনখারপুলে পুলিশের বুলেটে শাহাদাত বরণ করেন আনাস।
‘জুলাই ৩৬ গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪’-এর দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে শহীদ আনাসের মাকে লেখা সেই ঐতিহাসিক শেষ চিঠিটি এবার চিরস্থায়ী রূপ পেল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শহীদ আনাস হলের স্মৃতিফলকে।
সোমবার (৩ আগস্ট) বেলা সোয়া এগারোটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ আনাসের চিঠিসংবলিত এই স্মৃতিফলক উন্মোচন করেন। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ফলক উন্মোচনকালে শহীদ আনাসের বাবা শাহরিয়ার খান পলাশ ক্ষোভ ও আবেগ চেপে রাখতে পারেননি। সন্তানের আদর্শের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই আনাস একজন নীতিবান সন্তান ছিল। পরিবার থেকে তাকে হাফেজ বানানোর ইচ্ছা থাকলেও পরবর্তীতে তার স্বপ্ন ছিল বুয়েটে প্রকৌশল পড়ার। কিন্তু ঘাতকের বুলেট তার সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে।
আন্দোলনে নামার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আনাসের বাবা বলেন, “শহীদ আনাসদের স্বপ্ন ছিল একটি ইনসাফভিত্তিক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, যা আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।” তবে ঘটনার দুই বছর পার হলেও বিচার প্রক্রিয়ার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় তীব্র হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের নামমাত্র সাজা দেওয়া হচ্ছে, আর যারা পালিয়ে গেছে তাদের নামকাওয়াস্তে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। আমরা রক্তপাতহীন, ফ্যাসিবাদের ছায়ামুক্ত এক বাংলাদেশ চাই এবং শহীদ ওসমান হাদী হত্যার দ্রুত বিচার চাই।”
অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, “দশম শ্রেণিতে পড়া আনাসের চিঠিটি পড়ে যে কেউ তার গভীর দেশপ্রেম উপলব্ধি করতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আগত প্রত্যেকেই এই চিঠি থেকে অনুপ্রাণিত হবে। বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যতদিন দায়িত্বে থাকবে, ততদিন ৩৬ জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে সকল কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পরিচালনা করা হবে।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী। এছাড়া শহীদ আনাসের নানা সাইদুর রহমান খান, ‘জুলাই ৩৬ গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪’ উদযাপন কমিটির আহবায়ক ও সদস্য-সচিব, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, হল প্রভোস্ট, প্রক্টরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
স্মৃতিফলক উন্মোচনের পরপরই বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসিতে ইবি স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘বুলেটের সামনে আমাদের আবু সাঈদ’, ‘পানি লাগবে পানি, পানি…’ এবং ‘জুলাই বিপ্লবে পুলিশের নৃশংসতা’ থিমে তিনটি বিভাগে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।