স্টাফ রিপোর্টার

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুমের শিকার ২৪১ জন নেতাকর্মীর ন্যায়বিচার এবং এখনও নিখোঁজ সাত ছাত্রনেতার সন্ধানের দাবিতে সাংবাদিক সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।

গতকাল রোববার দুপুর ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ‘গুম ও নিপীড়নের খতিয়ান: ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ ও গুম প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কারের দাবি’ শীর্ষক এ সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম।

লিখিত বক্তব্যে নূরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ২০০৯ সালে পতিত স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে গুম বা ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-কে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। ডিবি, ডিজিএফআই, র‌্যাব ও সিটিটিসিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত বাহিনীকে ব্যবহার করে এসব ঘটনা ঘটানো হতো বলেও দাবি করেন তিনি।

গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ছাত্রশিবিরের ২৪১ জন নেতাকর্মী রয়েছেন। তার দাবি, এটি রাজনৈতিক পরিচয়ে গুমের শিকার মোট ভুক্তভোগীর ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশ।

নূরুল ইসলাম আরও দাবি করেন, গত দেড় দশকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর চালানো প্রকৃত গুমের ঘটনা সাত শতাধিক। তবে ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক বিপর্যয়ের কারণে অনেক ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবারের তথ্য এখনো হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, তৎকালীন নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মিথ্যা মামলায় ছাত্রশিবিরের ১৭ হাজার ৪৬৩ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলেও দাবি করেন তিনি।

সাংবাদিক সম্মেলনে গত দেড় দশকে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার কয়েকজন নেতাকর্মীর ঘটনা তুলে ধরেন ছাত্রশিবির সভাপতি। এ সময় জয়পুরহাটের সাবেক জেলা সভাপতি আবু জর গিফারী ও সেক্রেটারি ওমর আলীর পায়ে গুলী করে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার অভিযোগও তুলে ধরা হয়।

নিখোঁজ সাত ছাত্রনেতার সন্ধান দাবি

এখনো নিখোঁজ থাকা সাত ছাত্রনেতার বিষয়ে নূরুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক অর্থ সম্পাদক মো. ওয়ালীউল্লাহ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আল মুকাদ্দাস, আদাবর থানা সভাপতি হাফেজ জাকির হোসেন, বেনাপোল থানা সেক্রেটারি রেজওয়ান, বান্দরবানের জয়নাল হোসেন, ঝিনাইদহের মো. কামরুজ্জামান এবং কক্সবাজার থেকে গুম হওয়া শফিকুল ইসলামসহ সাতজনের কোনো সন্ধান রাষ্ট্র এখনো দিতে পারেনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা অবিলম্বে এই সাতজনের বিষয়ে রাষ্ট্রের কাছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এবং তাদের সন্ধান দাবি করছি।’

ছয় দফা দাবি

সাংবাদিক সম্মেলন থেকে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গুম কমিশনে দায়ের করা ছাত্রশিবিরের ২৪১ জন নেতাকর্মীর ঘটনাসহ সাত শতাধিক গুম এবং নিখোঁজ সাত ছাত্রনেতাসহ সব গুমের ঘটনা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত গুম ও হত্যাকা-ের পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও কমান্ডারদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের দাবি জানানো হয়।

এ ছাড়া নিখোঁজ ছাত্রনেতাদের অবস্থান ও পরিণতি সম্পর্কে রাষ্ট্রের স্পষ্ট ব্যাখ্যা, গুমের শিকার ও শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ, প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬সহ সংশ্লিষ্ট আইনগুলোতে স্বাধীন তদন্তের নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের বাইরে একটি স্বতন্ত্র তদন্ত সংস্থা গঠনের দাবি জানানো হয়।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে নিজস্ব তদন্ত দল দিয়ে স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ারও দাবি জানায় ছাত্রশিবির।

সাংবাদিক সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, দাওয়াহ সম্পাদক হাফেজ আবু মুসা, তথ্য ও মানবাধিকার সম্পাদক তানজির হোছাইন জুয়েল, ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক রেজাউল করিম শাকিল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, স্পোর্টস সম্পাদক মুশফিকুর রহমান এবং শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পাদক জাকির হোসাইন উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া গুমের শিকার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আল মুকাদ্দাসের বাবা মাওলানা আব্দুল হালিম, হাফেজ জাকির হোসেনের ভাই জিয়াউর রহমান, রেজওয়ান হোসেনের বড় ভাই রিপন হোসেন, গুম করে ক্রসফায়ারে নিহত মহিদুল ইসলামের ভাই শহিদুল ইসলাম, ছাত্রশিবিরের জয়পুরহাট জেলার সাবেক সভাপতি আবু জর গিফারীসহ গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের সদস্য ও ভুক্তভোগীরা উপস্থিত ছিলেন।

বক্তব্যের শেষে নূরুল ইসলাম বলেন, গুম হওয়া সাত ছাত্রনেতার পরিবার এখনো তাদের প্রিয়জনের অপেক্ষায় রয়েছে। সাংবাদিকদের লেখনীর মাধ্যমে এসব পরিবারের দীর্ঘশ্বাস ও আর্তনাদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগর পূর্বের এ প্লাস সংবর্ধনা

শুধু মেধাবী হলেই হবে না, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিজীবনে সৎ ও নৈতিক হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম।

গতকাল রোববার রাজধানীর বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগর পূর্ব আয়োজিত ‘এ প্লাস সংবর্ধনা ২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, শিক্ষার্থীদের নিজেদের মেধা ও যোগ্যতাকে আগামী দিনে জাতির কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। শুধু মেধাবী হলেই হবে না; ব্যক্তিজীবনে সৎ হতে হবে। দেশপ্রেমকে বুকে ধারণ করে আগামী বাংলাদেশকে ইনসাফের বাংলাদেশে পরিণত করতে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা রাখতে হবে।

তিনি বলেন, জনতার গণভোটের গণরায় মেনে জুলাই সনদ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। গুমসংক্রান্ত নীতিমালা আইনে বাস্তবায়ন এবং গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, মেধাবী শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। জুলাই আন্দোলনে ছাত্রসমাজ বুকের তাজা রক্ত দিয়ে নতুন সম্ভাবনার বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছিল, তা এখনো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষ ও গুণগত মানসম্পন্ন মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক সাইদুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও ডাকসু ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আবদুল্লাহসহ ঢাকা মহানগর পূর্বের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

পরে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। বক্তারা শিক্ষার্থীদের মেধা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের সমন্বয়ে নিজেদের গড়ে তুলে ভবিষ্যতে দেশ ও সমাজের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

চ-১২ (চ) ৩০-০৮-২০২৬ ঐউ-৩৭

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় গরুর খামার ও তেলের ঘানি পরির্দশনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত

রংপুর অফিস

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় ‘প্যারাগন এগ্রো অ্যান্ড ডেইরি লিমিটেডে’র ডেইরি ফার্ম ও ঐতিহ্যবাহী তেলের ঘানি পরিদর্শন করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন।

গতকাল রোববার সকালে উপজেলার বেতগাড়ী ইউনিয়নের খাপরিখাল এলাকায় ‘প্যারাগন ডেইরি ফার্ম’ পরিদর্শন শেষে চন্দনের হাটে গিয়ে স্থানীয়ভাবে সরিষার তেল উৎপাদনের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি দেখেন তিনি।

জানা গেছে, গতকাল সকালে প্যারাগন ডেইরি ফার্মে পৌঁছান মার্কিন রাষ্ট্রদূত। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা উন্নত জাতের প্রায় ১ হাজার ২০০ গরুর পালন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন তিনি। গাভির পরিচর্যা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, দুধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উন্নত জাতের গরুর প্রজনন কার্যক্রম সম্পর্কে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এছাড়া খামারের বিভিন্ন কার্যক্রম ঘুরে দেখে ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘উন্নত জেনেটিক্স ও মানসম্মত পশুখাদ্য বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক ও রপ্তানিকারকদের জন্যও এসব কৃষিপণ্য নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি করছে।’

প্যারাগন ডেইরির কর্মকর্তারা জানান, গাভির দুধ উৎপাদন বাড়াতে উন্নত পুষ্টির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। খামারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা সয়াবিন ও ভুট্টাসহ উন্নতমানের পশুখাদ্য উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি আমেরিকান জেনেটিক্সের মাধ্যমে উন্নত জাতের গরু পালনের কার্যক্রমও চলছে।

প্যারাগন এগ্রো অ্যান্ড ডেইরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান ও এজিএম মেজবাহ উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা খামারের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে রাষ্ট্রদূতকে অবহিত করেন। এ সময় খামারের অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা, পশুখাদ্য, দুধ উৎপাদন এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। পরে খামারে উৎপাদিত দুধ পান করেন ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। এরপর বেতগাড়ী ইউনিয়নের চন্দনের হাটে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী তেলের ঘানি পরিদর্শন করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। ঘানিতে সরিষা থেকে তেল উৎপাদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি দেখে আগ্রহ প্রকাশ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন।

তেলের ঘানি দেখে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ঘানিভাঙা সরিষার তেল! সরিষার তেল তৈরির ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি এখনও সুন্দরভাবে টিকে আছে দেখে ভালো লাগল।’

রাষ্ট্রদূতের সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন তার স্ত্রী ডিযয়েন ডাও, মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা নিকোল ক্লারিসা বেসনার্ড, সৈয়দ ফাইজুস সালেহিন ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ফিরোজ আহমেদ।

এ সময় রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডাক্তার মোহাম্মদ আব্দুল হাই সরকার, রংপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান, গঙ্গাচড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সবুর এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। পরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত লালমনিরহাটের তিস্তা ব্যারাজ পরিদর্শন করেন ।