সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। সোমবার দুবাইয়ের একটি আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। পরে বৃহস্পতিবার কারামুক্ত হন তিনি। গতকাল রোববার বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
জানা গেছে, শর্তসাপেক্ষে দেয়ার জামিনে উল্লেখ রয়েছে, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগ করতে পারবেন না। ফলে জামিনে মুক্তি পেলেও তার দেশত্যাগে বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত নথিপত্র এবং আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে আদালতে উভয়পক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বিচারক। তবে, এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দুবাই কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, দুবাইয়ের কারাগার থেকে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের মুক্তির খবর বাংলাদেশ পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, বেনজীর আহমেদের মুক্তি বা ছাড়া পাওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। পুলিশ সদর দফতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, বেনজীরের মুক্তির বিষয়ে দুবাই কর্তৃপক্ষ বা ইন্টারপোলের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পায়নি। এ কারণে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল দুটি সূত্র বলছে, বেনজীর আহমেদকে ছেড়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে, এমন সম্ভাবনা তারাও উড়িয়ে দিচ্ছে না। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করছে।
জামিন বাতিলে দুবাইয়ে ল ফার্ম নিয়োগ
এর আগে দুপুরে রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমির এক অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বেনজীর আহমেদের জামিন বাতিলে কাজ করার জন্য দুবাইয়ে বাংলাদেশ সরকার ল’ ফার্ম নিয়োগ করেছে। বেনজীর আহমেদ জামিনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি এখন শুনলাম স্টেজে বসে। সাথে সাথেই আমি হোম সেক্রেটারির সাথে কথা বলেছি। হোম সেক্রেটারি দুবাইয়ে আমাদের যে ইউএই অ্যাম্বাসেডার তার সাথে কথা বলেছেন। আমরা কয়েকদিন আগেই ল ফার্ম নিয়োগ করেছি, এই বিষয়টার জন্য শুধুমাত্র। তাকে ইন্সট্রাকশন দেয়া হয়েছে যেন বেইল ক্যানসেলেশনের জন্য সে পারসু করবে। বাংলাদেশে দুর্নীতির বেশ কয়েকটি মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আসলেই মুক্তি পেয়েছেন কি না, সাংবাদিকরা এমন প্রশ্নও করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। এই তথ্য সঠিক জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মি. আহমদ বলেন, জামিন বাতিলের জন্য উদ্যোগ নেয়া হবে। তিনি বলেন, আমি খবর পেয়েছি তাকে অন কন্ডিশনে এখানে তার ইউএই লিভ না করার শর্তে বেইল দিয়েছে। কী কী শর্ত সেটা আমি সার্টিফাইড কপিটা জোগাড় করতে বলেছি এবং আমাদের যে ল ফার্ম রয়েছে, তাদেরকে আমরা ইন্সট্রাকশন দিয়েছি যেন এই বেইল ক্যানসেলেশনের জন্য তারা পারসু করে। এখন বাংলাদেশ সরকার এখন কোন আইনি প্রক্রিয়া অবলম্বন করবে এমন আরেক প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার জামিন বাতিল করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের চেষ্টা আমরা করছি এবং আমরা আশা করছি, আমরা বেইল ক্যানসেল করতে পারব এবং দ্রুততম সময়ে তাকে ফেরত নিতে পারব।
তথ্য নেই দুদকের কাছেও
দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদের মুক্তি পাওয়ার খবরের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছেও আনুষ্ঠানিক তথ্য বা কাগজপত্র নেই। বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংস্থার মহাপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী এ তথ্য জানান। দুদকের মহাপরিচালক জয়নুল আবেদীন বলেন, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের মুক্তির বিষয়টি আমরা সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জেনেছি। তবে এ বিষয়ে দুদকের কাছে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য বা কাগজপত্র আসেনি। আইনগতভাবে আমাদের পক্ষ থেকে যা যা করার প্রয়োজন, দুদক তা করবে। বেনজীর আহমেদের মামলার বিষয়ে দুদকের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক দাবি করেন, তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়ায় দুদকের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ঘাটতি ছিল না।
বেনজীর আহমেদ দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার তথ্য গত ১৪ জুন প্রথম জাতীয় সংসদে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো এক ই-মেইলে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়, দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে আটক করা হয়। এরপর বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বেনজীরের প্রত্যার্পণ চায়। এজন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রস্তুত করা প্রায় ১৪৪ পৃষ্ঠার নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে কূটনৈতিক মাধ্যমে দুবাইয়ে পাঠানো হয়। সেখানে তার বিরুদ্ধে দেশে গ্রেফতারি পরোয়ানা, মামলার তথ্য ও প্রত্যার্পণের প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংযুক্ত করা হয়।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের সাবেক ও তৎকালীন সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তাঁদের মধ্যে বেনজীর আহমেদও ছিলেন। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে বেনজীর ও তার পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসে। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুদক। ওই সময় তিনি দেশ ছাড়েন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার আদেশ দেন আদালত। এর আগে ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর, তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জা এবং দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা করে দুদক। মামলাগুলোতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জার বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। বেনজীরের বড় মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং মেজ মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করেছে দুদক। আদালতের আদেশে বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ জমি, ফ্ল্যাট ও বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ক্রোক করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক হিসাব ও শেয়ার ব্যবসার বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়।